পিয়াস মজিদের সাক্ষাৎকার
পিয়াস মজিদ একজন কবি ও লেখক। তিনি ১৯৮৪ সালের ২১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ২০১২ সালে এইচএসবিসি-কালি ও কলম পুরস্কার, ২০১৬ সালে কলকাতার আদম লিটল ম্যাগাজিন প্রদত্ত তরুণ কবি সম্মাননা, একই বছর সিটি-আনন্দ আলো পুরস্কার ও শ্রীপুর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার এবং ২০১৭ সালে কলকাতার দাঁড়াবার জায়গা সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-য় কবি প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে তাঁর ‘তারাঝরা অনাথ আকাশে’ ও গ্রন্থিক প্রকাশন থেকে ’০১ পেগ বুকোস্কি এবং আরও ০৭টি’। নিজের প্রকাশিত বই ও কবিতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে শেয়ার করেন তিনি। পিয়াস মজিদের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হুমায়ূন শফিক।
হুমায়ূন শফিক

স্ট্রিম: একজন কবি যখন একটি পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন, তখন তার ভেতর একটি নির্দিষ্ট দর্শন বা যাপনচিত্র কাজ করে। এই বইটির ভ্রূণ তৈরি হওয়া থেকে শুরু করে মলাটবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত আপনার মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণটা কেমন ছিল?
পিয়াস মজিদ: এবারের বইমেলায় আমার দুটি মৌলিক নতুন কবিতাগ্রন্থ এসেছে। কবি প্রকাশনী থেকে টানাগদ্যকবিতার বই 'তারাঝরা অনাথ আকাশে' আর গ্রন্থিক প্রকাশন থেকে আটটি দীর্ঘকবিতার বই '০১ পেগ বুকোস্কি এবং আরও ০৭টি'। বই দুটোর খসড়ার সঙ্গে আমার যাপন অনেকদিনের। দীর্ঘ পাণ্ডুলিপি কাটাকুটিতে হ্রস্ব হয়েছে কিন্তু মৌল মর্ম ভ্রুণাবস্থা থেকে আত্মপ্রকাশ অব্দি একই আছে৷ আমি মনে করি বই দুটি আমার ইতিপূর্বেকার বইগুলো দ্বারা তৈরি কবি-ইমেজারি চুরমার করবে। বইদুটোর সঙ্গে ভ্রমণ আমার নিজের কাছেই বেশ কৌতুহলোদ্দীপক৷ বারবার মনে হয়েছে, কারা এইসব ছাইপাশ কবিতার লেখক: জনাব পিয়াস, শ্রীযুক্ত মাল্যবান নাকি মিস্টার মার্সো?
স্ট্রিম: রাইনার মারিয়া রিলকে বলেছেন, 'কবিতা কেবল আবেগ নয়, কবিতা হলো অভিজ্ঞতা'। আপনার ক্ষেত্রে একটি কবিতা লেখার প্রক্রিয়াটি কেমন? এটি কি স্বতঃস্ফূর্ত কোনো বোধের বিস্ফোরণ, নাকি দীর্ঘ ভাষিক ও কাঠামোগত কারুকার্যের ফসল?
পিয়াস মজিদ: দুটোই৷ আমার মনে হয় স্বতঃস্ফূর্ত বোধের পেছনে ভাষিক ও কাঠামোগত কারুকার্য তো ক্রিয়াশীল থাকেই প্রতিটি কবিমানুষের অবচেতনে। আবেগের সঙ্গে মিশ্রিত যেমন অভিজ্ঞতা। আমার ক্ষেত্রে যা হয়: কিছু কবিতা হঠাৎ আসে অটোমেটিক রাইটিংয়ের মতো আর কিছু কবিতা সচেতন নির্মাণ তবে সে নির্মাণ যদি নির্মাণকলার দাগ ছাপিয়ে সৃষ্টির তাথৈ ঝরনার জলে স্নান না করায় আমার পাঠক মনকে, তাহলে আমার নিজের কাছেই সেসব 'বানানো কবিতা' বলে মনে হতে থাকে এবং আমি সেগুলো খারিজের খাতায় তুলে রাখি।
স্ট্রিম: সমকালীন বিশ্বকবিতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আপনি বাংলা ভাষার কবিতার স্বকীয়তাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন? আমরা কোথায় পিছিয়ে বা কোথায় এগিয়ে আছি বলে মনে করেন?
পিয়াস মজিদ: এটা খুবই আপেক্ষিক। বিশ্বকবিতা কথাটি বহুলচর্চিত কিন্তু সমস্যাজনক৷ দুনিয়ার এত এত ভাষায় কবিতাচর্চা হচ্ছে। কিন্তু আমরা কিন্তু ঘুরেফিরে চেনাপরিচিত কয়েকটি ভাষার কবিতার সঙ্গেই তুলনামূলক আলোচনা করে বিশ্বসাহিত্য বিষয়ক বোধের ঢেঁকুর তুলি। আর একটা সমস্যা আছে। ধরেন: এখনও আমরা অনুবাদে পড়ছি- রুমির কবিতা, গালিবের কবিতা, রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা, অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা কিংবা আন্না আখমাতোভার কবিতা৷
সেইসব কবিদের নিজ ভাষায় ঠিক ২০২৬ সালে কারা কবিতা লিখছে, কেমন লিখছে- তা নিয়ে আমরা ততোটা ভাবিত বা ওয়াকিবহাল বলে মনে করি না। ফলে এই তুলনা অপূর্ণাঙ্গ। একদেড়শো বছর আগেকার বিশ্বকবিতার সমান্তরালে আমরা বাংলা কবিতাকে প্রায়শই তুলনা করি এবং সিদ্ধান্তে আসি। তবে আমি জাস্ট জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে উদাহরণ হিসেবে নিলেই বলতে পারি, এত সূক্ষ্ম মানব- অনুভব নিয়ে বাংলা কবিতা ডিল করেছে যা সময়নির্বিশেষে পৃথিবীজুড়েই বিরল।
স্ট্রিম: আপনি যখন উপমা বা মেটাফোর নির্মাণ করেন, তখন চারপাশের চেনা জগৎ ও প্রকৃতি থেকে উপাদান নেন, নাকি অবচেতনের কোনো পরাবাস্তব জগৎ থেকে শব্দগুলো তুলে আনেন?
পিয়াস মজিদ: একসময় অবচেতনকে রাজাধিরাজ ভাবতাম। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে চারপাশের চেনা জগতই আমার কাছে অধিকতর মূল্যবান ঠেকছে। বাড়ির কাছে আরশিনগর, পড়শি সেথাতেই বসত করে।
স্ট্রিম: আধুনিক কবিতায় প্রতিনিয়ত ছন্দ বা ব্যাকরণ ভাঙার প্রবণতা দেখা যায়। পূর্বসূরিদের নির্মিত পথ বা ছন্দের ব্যাকরণকে আপনি কীভাবে দেখেন? ভাঙার জন্য কি আগে গড়াটা বা ব্যাকরণ জানাটা জরুরি বলে মনে করেন?
পিয়াস মজিদ: আমি নিজে ছন্দে লিখি না৷ ছন্দে লেখা বহু বহু কবিতা আমার খুবই প্রিয়৷ ছন্দ জানা বা ছন্দে লেখা নিশ্চয়ই উচিত কিন্তু ঔচিত্যবোধ দিয়ে আমি কবিতা লিখতে জানি না। আমি মনে করি, কবিতা একটা লাগামছাড়া ঘোড়া। ছন্দ বা ব্যকরণ কবিতায় প্রকৃত বলবার কথালে কতল করে, ফর্মে ফেলে তরতাজা অনুভবের উদ্ভাসনকে সীমার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়৷
স্ট্রিম: আপনি কি মনে করেন, একজন কবি যা লেখেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি দুটি শব্দের বা লাইনের মাঝে কী না-লিখে ছেড়ে দিচ্ছেন?
পিয়াস মজিদ: নিশ্চয়ই। সমালোচকেরা বলে থাকেন, আমি কবিতায় নিরুচ্চারের সাধনা করি। আমি এটাকে ভালোভাবেই নিতে চাই। শব্দ যেখানে সীমা হারায়, সেখানেই কবিতা তার অসীমের গান গায়৷ সংকেতই তো কবিতা, নৈঃশব্দ্যই তো নির্ঝর। বহু বাংলা কবিতায় এত কথা থাকে, আমার তো মনে হয় সেইসব কবি কবিতা না লিখে কলাম লিখলেই ভালো করতেন৷ আপনি খেয়াল করবেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ 'চাঁদের অমাবস্যা'র ভূমিকায় বলেছিলেন যে তোমরা আমার কাছে সংবাদপত্রের মতো সরাসরি কিছু চাও কিন্তু সাহিত্যের কাজ আর একটু গভীর।
স্ট্রিম: আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি যা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চরম পুঁজিবাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের মনোযোগের পরিসর কমে যাচ্ছে। এই অস্থির পৃথিবীতে কবিতার কাজ কী? কবিতা কি এখনো মানুষের আত্মিক মুক্তির কোনো পথ দেখাতে পারে?
পিয়াস মজিদ: মজার প্রশ্ন করেছেন৷ সেদিন এক বন্ধু বলল। চ্যাটজিপিটিকে সে প্রশ্ন করল 'পিয়াস মজিদের মতো কবিতা লিখে দেখাও তো।' সত্যি সত্যি সে এমন কিছু হাজির করল সামনে৷ তো এই যে নির্বিশেষ করে দেয়া, স্বাতন্ত্র্যলুপ্তি, ছাঁচে ফেলে সব গড় করে ফেলা- তা পুঁজিবাদের নানা প্রকাশের একটা। কবিতার কাজ কিন্তু ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। ধরেন, আমি কবিতায় ট্রাম্প বা নেতানিহায়ুকে হাজার হাজার গালাগাল দিয়ে তাদের মারতেও পারব না, কবিতাকেও বাঁচাতে পারব না। কিন্তু কবিতা আত্মিকভাবে আপনাকে এমন জায়গায় উন্নীত করতে পারে যে আপনার দ্বারাই পৃথিবীকে মুক্ত করার কোনও রাস্তা হয়তো আবিষ্কৃত হবে। কবিতাকে আমি তাই বলি রুহের ফটোগ্রাফি।
স্ট্রিম: একজন কবির কি দায়বদ্ধতা আছে তার সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের প্রতি? আপনার কবিতায় সমকালের এই ক্ষোভ বা সংকটগুলো কীভাবে অনূদিত হয়— সরাসরি স্লোগান হিসেবে, নাকি সূক্ষ্ম কোনো ইশারায়?
পিয়াস মজিদ: দায় তো অবশ্যই আছে৷ তবে দায়বদ্ধতার প্রকাশ এক একজন সৃজনশীল মানুষের এক এক রকম৷ কবিতায় আমি ইশারাভাষারই মানুষ মনে হয় তবে আমার মতো কবিও 'এইসব মকারি' কিংবা 'পবিত্র রসাতল' কবিতা লিখেছে যেখানে বলতে চাওয়া হয়েছে:
‘ইহা মিথ্যা যে আমরা সবাই সত্য বলেছিলাম।
ইহা সত্য যে আমরা সবাই মিথ্যা বলেছিলাম।’
স্ট্রিম: আপনার কি মনে হয় বাংলা কবিতার মান বৈশ্বিক পর্যায়ের হওয়া সত্ত্বেও, শুধু মানসম্মত অনুবাদের অভাবেই আমরা লাতিন আমেরিকান বা ইউরোপীয় কবিতার মতো বিশ্বব্যাপী পঠিত হচ্ছি না?
পিয়াস মজিদ: নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। আমি বেশ অনেক বছর আগে ভারতের জয়পুরে একটা লিটারারি কনফারেন্সে গেছিলাম৷ সেখানে বিশ্বের কয়েকটা দেশের কবি এসেছিল৷ তো একজন নারীকবির সঙ্গে পরিচয় হলো, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে কিন্তু আমার মনে হলো আমার দেশের পঞ্চাশ-ষাটের দশকের প্রথমপর্বে তার ওই মানের কবিতা লেখা হয়েছে ঢের। আমি তো বলব, যথাযোগ্য অনুবাদের অভাবে কবিতাসহ আমাদের সাহিত্যের অমৃত স্বাদ থেকে বিশ্বপাঠক বঞ্চিত হচ্ছে।
স্ট্রিম: এই সোশ্যাল মিডিয়া ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগের যুগে আপনি নিজের ভেতর একাকীত্ব বা নিজস্ব স্পেস কীভাবে বাঁচিয়ে রাখেন?
পিয়াস মজিদ: এই যুগে বিশুদ্ধ নির্বাসন সম্ভব না আসলে। জনতার মধ্যেই নির্জনতা খুঁজে নিতে হয়৷ কবিতা তো একার সাধনাতেই আমরা লিখি, ফেসবুকে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে বসে আমরা হয়তো কবিতাবাজি করি কিন্তু কবিতাটা কিন্তু একাকী মানুষের গহন থেকে উৎসারিত। "বিদ্রোহী'র মতো হুল্লোড়ময় কবিতাও তো নজরুল নিজের গভীর জলে ডুব দিয়েই লিখেছেন। আমার ক্ষেত্রে যা হয়, ভোরের নিরালা সৌন্দর্য থেকে লোকাল বাসের জটলাতে বসেও লিখতে পারি যদি লেখাটা নাছোড় তাগাদা দিতে থাকে।
স্ট্রিম: পাঠক যখন আপনার কোনো কবিতাকে আপনার মূল চিন্তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো অর্থে পাঠ করেন, তখন আপনার কেমন লাগে? আপনার কাছে একজন 'আদর্শ পাঠক' কে?
পিয়াস মজিদ: টেক্সটের মৃত্যু তো একটা অনিবার্য সত্য। প্রায়শই এমন হয়। কবিতার ভুল রিডিংয়ের জন্য আমাদের পাঠ্যপুস্তকে কবিতার অদ্ভুত ব্যাখ্যাবিশ্লেষণও অনেকটা দায়ী। আবার আমি এটা ভাবি, কবিতা লেখার পর তা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে কবি নিজেও ঠিকঠাক বলতে পারবেন কবিতাটার পেছনকার মূল চিন্তা কী ছিল? আজকাল আমার মনে হয় কবিতা লেখা হয়ে গেলে ওই কবিতার কবি ও আর ওই কবিতার পাঠক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন। আদর্শ পাঠক বলে সে-ই যার কাছে একটা কবিতা এক এক পাঠে এক একভাবে ধরা দিতে সক্ষম হয়।
স্ট্রিম: যাঁরা এই সময়ে এসে কবিতা লিখতে চাইছেন বা সিরিয়াসলি কবিতায় মগ্ন হতে চান, তাঁদের অনেকেই দ্রুত জনপ্রিয় হতে চান। একজন পরিণত কবি হিসেবে এই তরুণদের জন্য আপনার পরামর্শ বা সতর্কতা কী হবে?
পিয়াস মজিদ: পরিণত আমরা কেউই না, প্রতিনিয়ত শিখি কবিতার কাছ থেকে। একটাই কথা বলব, অনেক বছর কবিতা লিখে চলার অধিকারে, ফটোকার্ড বা রিলসের প্রলোভনে প্রবচনকে কবিতা ঠাওরানো থেকে দূরে থাকা ভালো। আপনার কবিতা থেকে নিশ্চয়ই প্রবচনমূলক বাক্য বের করে আনতে পারবে যে কেউ কিন্তু শুধু প্রচারে থাকার সম্মোহনে লাগসই লাইন লিখে বাজিমাত করার যে সমকালীন প্রবণতা, তার সঙ্গে কবিতার যোগ সামান্যই। আর নিজে ভালো পাঠক হওয়াটা জরুরি৷ তাহলে বুঝতে পারা যাবে কবি হিসেবে নিজের অবস্থান, এ জন্য অন্যের মতামতের দরকার হবে না।

স্ট্রিম: একজন কবি যখন একটি পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন, তখন তার ভেতর একটি নির্দিষ্ট দর্শন বা যাপনচিত্র কাজ করে। এই বইটির ভ্রূণ তৈরি হওয়া থেকে শুরু করে মলাটবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত আপনার মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণটা কেমন ছিল?
পিয়াস মজিদ: এবারের বইমেলায় আমার দুটি মৌলিক নতুন কবিতাগ্রন্থ এসেছে। কবি প্রকাশনী থেকে টানাগদ্যকবিতার বই 'তারাঝরা অনাথ আকাশে' আর গ্রন্থিক প্রকাশন থেকে আটটি দীর্ঘকবিতার বই '০১ পেগ বুকোস্কি এবং আরও ০৭টি'। বই দুটোর খসড়ার সঙ্গে আমার যাপন অনেকদিনের। দীর্ঘ পাণ্ডুলিপি কাটাকুটিতে হ্রস্ব হয়েছে কিন্তু মৌল মর্ম ভ্রুণাবস্থা থেকে আত্মপ্রকাশ অব্দি একই আছে৷ আমি মনে করি বই দুটি আমার ইতিপূর্বেকার বইগুলো দ্বারা তৈরি কবি-ইমেজারি চুরমার করবে। বইদুটোর সঙ্গে ভ্রমণ আমার নিজের কাছেই বেশ কৌতুহলোদ্দীপক৷ বারবার মনে হয়েছে, কারা এইসব ছাইপাশ কবিতার লেখক: জনাব পিয়াস, শ্রীযুক্ত মাল্যবান নাকি মিস্টার মার্সো?
স্ট্রিম: রাইনার মারিয়া রিলকে বলেছেন, 'কবিতা কেবল আবেগ নয়, কবিতা হলো অভিজ্ঞতা'। আপনার ক্ষেত্রে একটি কবিতা লেখার প্রক্রিয়াটি কেমন? এটি কি স্বতঃস্ফূর্ত কোনো বোধের বিস্ফোরণ, নাকি দীর্ঘ ভাষিক ও কাঠামোগত কারুকার্যের ফসল?
পিয়াস মজিদ: দুটোই৷ আমার মনে হয় স্বতঃস্ফূর্ত বোধের পেছনে ভাষিক ও কাঠামোগত কারুকার্য তো ক্রিয়াশীল থাকেই প্রতিটি কবিমানুষের অবচেতনে। আবেগের সঙ্গে মিশ্রিত যেমন অভিজ্ঞতা। আমার ক্ষেত্রে যা হয়: কিছু কবিতা হঠাৎ আসে অটোমেটিক রাইটিংয়ের মতো আর কিছু কবিতা সচেতন নির্মাণ তবে সে নির্মাণ যদি নির্মাণকলার দাগ ছাপিয়ে সৃষ্টির তাথৈ ঝরনার জলে স্নান না করায় আমার পাঠক মনকে, তাহলে আমার নিজের কাছেই সেসব 'বানানো কবিতা' বলে মনে হতে থাকে এবং আমি সেগুলো খারিজের খাতায় তুলে রাখি।
স্ট্রিম: সমকালীন বিশ্বকবিতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আপনি বাংলা ভাষার কবিতার স্বকীয়তাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন? আমরা কোথায় পিছিয়ে বা কোথায় এগিয়ে আছি বলে মনে করেন?
পিয়াস মজিদ: এটা খুবই আপেক্ষিক। বিশ্বকবিতা কথাটি বহুলচর্চিত কিন্তু সমস্যাজনক৷ দুনিয়ার এত এত ভাষায় কবিতাচর্চা হচ্ছে। কিন্তু আমরা কিন্তু ঘুরেফিরে চেনাপরিচিত কয়েকটি ভাষার কবিতার সঙ্গেই তুলনামূলক আলোচনা করে বিশ্বসাহিত্য বিষয়ক বোধের ঢেঁকুর তুলি। আর একটা সমস্যা আছে। ধরেন: এখনও আমরা অনুবাদে পড়ছি- রুমির কবিতা, গালিবের কবিতা, রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা, অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতা কিংবা আন্না আখমাতোভার কবিতা৷
সেইসব কবিদের নিজ ভাষায় ঠিক ২০২৬ সালে কারা কবিতা লিখছে, কেমন লিখছে- তা নিয়ে আমরা ততোটা ভাবিত বা ওয়াকিবহাল বলে মনে করি না। ফলে এই তুলনা অপূর্ণাঙ্গ। একদেড়শো বছর আগেকার বিশ্বকবিতার সমান্তরালে আমরা বাংলা কবিতাকে প্রায়শই তুলনা করি এবং সিদ্ধান্তে আসি। তবে আমি জাস্ট জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে উদাহরণ হিসেবে নিলেই বলতে পারি, এত সূক্ষ্ম মানব- অনুভব নিয়ে বাংলা কবিতা ডিল করেছে যা সময়নির্বিশেষে পৃথিবীজুড়েই বিরল।
স্ট্রিম: আপনি যখন উপমা বা মেটাফোর নির্মাণ করেন, তখন চারপাশের চেনা জগৎ ও প্রকৃতি থেকে উপাদান নেন, নাকি অবচেতনের কোনো পরাবাস্তব জগৎ থেকে শব্দগুলো তুলে আনেন?
পিয়াস মজিদ: একসময় অবচেতনকে রাজাধিরাজ ভাবতাম। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে চারপাশের চেনা জগতই আমার কাছে অধিকতর মূল্যবান ঠেকছে। বাড়ির কাছে আরশিনগর, পড়শি সেথাতেই বসত করে।
স্ট্রিম: আধুনিক কবিতায় প্রতিনিয়ত ছন্দ বা ব্যাকরণ ভাঙার প্রবণতা দেখা যায়। পূর্বসূরিদের নির্মিত পথ বা ছন্দের ব্যাকরণকে আপনি কীভাবে দেখেন? ভাঙার জন্য কি আগে গড়াটা বা ব্যাকরণ জানাটা জরুরি বলে মনে করেন?
পিয়াস মজিদ: আমি নিজে ছন্দে লিখি না৷ ছন্দে লেখা বহু বহু কবিতা আমার খুবই প্রিয়৷ ছন্দ জানা বা ছন্দে লেখা নিশ্চয়ই উচিত কিন্তু ঔচিত্যবোধ দিয়ে আমি কবিতা লিখতে জানি না। আমি মনে করি, কবিতা একটা লাগামছাড়া ঘোড়া। ছন্দ বা ব্যকরণ কবিতায় প্রকৃত বলবার কথালে কতল করে, ফর্মে ফেলে তরতাজা অনুভবের উদ্ভাসনকে সীমার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়৷
স্ট্রিম: আপনি কি মনে করেন, একজন কবি যা লেখেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি দুটি শব্দের বা লাইনের মাঝে কী না-লিখে ছেড়ে দিচ্ছেন?
পিয়াস মজিদ: নিশ্চয়ই। সমালোচকেরা বলে থাকেন, আমি কবিতায় নিরুচ্চারের সাধনা করি। আমি এটাকে ভালোভাবেই নিতে চাই। শব্দ যেখানে সীমা হারায়, সেখানেই কবিতা তার অসীমের গান গায়৷ সংকেতই তো কবিতা, নৈঃশব্দ্যই তো নির্ঝর। বহু বাংলা কবিতায় এত কথা থাকে, আমার তো মনে হয় সেইসব কবি কবিতা না লিখে কলাম লিখলেই ভালো করতেন৷ আপনি খেয়াল করবেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ 'চাঁদের অমাবস্যা'র ভূমিকায় বলেছিলেন যে তোমরা আমার কাছে সংবাদপত্রের মতো সরাসরি কিছু চাও কিন্তু সাহিত্যের কাজ আর একটু গভীর।
স্ট্রিম: আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি যা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চরম পুঁজিবাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের মনোযোগের পরিসর কমে যাচ্ছে। এই অস্থির পৃথিবীতে কবিতার কাজ কী? কবিতা কি এখনো মানুষের আত্মিক মুক্তির কোনো পথ দেখাতে পারে?
পিয়াস মজিদ: মজার প্রশ্ন করেছেন৷ সেদিন এক বন্ধু বলল। চ্যাটজিপিটিকে সে প্রশ্ন করল 'পিয়াস মজিদের মতো কবিতা লিখে দেখাও তো।' সত্যি সত্যি সে এমন কিছু হাজির করল সামনে৷ তো এই যে নির্বিশেষ করে দেয়া, স্বাতন্ত্র্যলুপ্তি, ছাঁচে ফেলে সব গড় করে ফেলা- তা পুঁজিবাদের নানা প্রকাশের একটা। কবিতার কাজ কিন্তু ঠিক এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। ধরেন, আমি কবিতায় ট্রাম্প বা নেতানিহায়ুকে হাজার হাজার গালাগাল দিয়ে তাদের মারতেও পারব না, কবিতাকেও বাঁচাতে পারব না। কিন্তু কবিতা আত্মিকভাবে আপনাকে এমন জায়গায় উন্নীত করতে পারে যে আপনার দ্বারাই পৃথিবীকে মুক্ত করার কোনও রাস্তা হয়তো আবিষ্কৃত হবে। কবিতাকে আমি তাই বলি রুহের ফটোগ্রাফি।
স্ট্রিম: একজন কবির কি দায়বদ্ধতা আছে তার সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের প্রতি? আপনার কবিতায় সমকালের এই ক্ষোভ বা সংকটগুলো কীভাবে অনূদিত হয়— সরাসরি স্লোগান হিসেবে, নাকি সূক্ষ্ম কোনো ইশারায়?
পিয়াস মজিদ: দায় তো অবশ্যই আছে৷ তবে দায়বদ্ধতার প্রকাশ এক একজন সৃজনশীল মানুষের এক এক রকম৷ কবিতায় আমি ইশারাভাষারই মানুষ মনে হয় তবে আমার মতো কবিও 'এইসব মকারি' কিংবা 'পবিত্র রসাতল' কবিতা লিখেছে যেখানে বলতে চাওয়া হয়েছে:
‘ইহা মিথ্যা যে আমরা সবাই সত্য বলেছিলাম।
ইহা সত্য যে আমরা সবাই মিথ্যা বলেছিলাম।’
স্ট্রিম: আপনার কি মনে হয় বাংলা কবিতার মান বৈশ্বিক পর্যায়ের হওয়া সত্ত্বেও, শুধু মানসম্মত অনুবাদের অভাবেই আমরা লাতিন আমেরিকান বা ইউরোপীয় কবিতার মতো বিশ্বব্যাপী পঠিত হচ্ছি না?
পিয়াস মজিদ: নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। আমি বেশ অনেক বছর আগে ভারতের জয়পুরে একটা লিটারারি কনফারেন্সে গেছিলাম৷ সেখানে বিশ্বের কয়েকটা দেশের কবি এসেছিল৷ তো একজন নারীকবির সঙ্গে পরিচয় হলো, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে কিন্তু আমার মনে হলো আমার দেশের পঞ্চাশ-ষাটের দশকের প্রথমপর্বে তার ওই মানের কবিতা লেখা হয়েছে ঢের। আমি তো বলব, যথাযোগ্য অনুবাদের অভাবে কবিতাসহ আমাদের সাহিত্যের অমৃত স্বাদ থেকে বিশ্বপাঠক বঞ্চিত হচ্ছে।
স্ট্রিম: এই সোশ্যাল মিডিয়া ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগের যুগে আপনি নিজের ভেতর একাকীত্ব বা নিজস্ব স্পেস কীভাবে বাঁচিয়ে রাখেন?
পিয়াস মজিদ: এই যুগে বিশুদ্ধ নির্বাসন সম্ভব না আসলে। জনতার মধ্যেই নির্জনতা খুঁজে নিতে হয়৷ কবিতা তো একার সাধনাতেই আমরা লিখি, ফেসবুকে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে বসে আমরা হয়তো কবিতাবাজি করি কিন্তু কবিতাটা কিন্তু একাকী মানুষের গহন থেকে উৎসারিত। "বিদ্রোহী'র মতো হুল্লোড়ময় কবিতাও তো নজরুল নিজের গভীর জলে ডুব দিয়েই লিখেছেন। আমার ক্ষেত্রে যা হয়, ভোরের নিরালা সৌন্দর্য থেকে লোকাল বাসের জটলাতে বসেও লিখতে পারি যদি লেখাটা নাছোড় তাগাদা দিতে থাকে।
স্ট্রিম: পাঠক যখন আপনার কোনো কবিতাকে আপনার মূল চিন্তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো অর্থে পাঠ করেন, তখন আপনার কেমন লাগে? আপনার কাছে একজন 'আদর্শ পাঠক' কে?
পিয়াস মজিদ: টেক্সটের মৃত্যু তো একটা অনিবার্য সত্য। প্রায়শই এমন হয়। কবিতার ভুল রিডিংয়ের জন্য আমাদের পাঠ্যপুস্তকে কবিতার অদ্ভুত ব্যাখ্যাবিশ্লেষণও অনেকটা দায়ী। আবার আমি এটা ভাবি, কবিতা লেখার পর তা থেকে দূরে দাঁড়িয়ে কবি নিজেও ঠিকঠাক বলতে পারবেন কবিতাটার পেছনকার মূল চিন্তা কী ছিল? আজকাল আমার মনে হয় কবিতা লেখা হয়ে গেলে ওই কবিতার কবি ও আর ওই কবিতার পাঠক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন। আদর্শ পাঠক বলে সে-ই যার কাছে একটা কবিতা এক এক পাঠে এক একভাবে ধরা দিতে সক্ষম হয়।
স্ট্রিম: যাঁরা এই সময়ে এসে কবিতা লিখতে চাইছেন বা সিরিয়াসলি কবিতায় মগ্ন হতে চান, তাঁদের অনেকেই দ্রুত জনপ্রিয় হতে চান। একজন পরিণত কবি হিসেবে এই তরুণদের জন্য আপনার পরামর্শ বা সতর্কতা কী হবে?
পিয়াস মজিদ: পরিণত আমরা কেউই না, প্রতিনিয়ত শিখি কবিতার কাছ থেকে। একটাই কথা বলব, অনেক বছর কবিতা লিখে চলার অধিকারে, ফটোকার্ড বা রিলসের প্রলোভনে প্রবচনকে কবিতা ঠাওরানো থেকে দূরে থাকা ভালো। আপনার কবিতা থেকে নিশ্চয়ই প্রবচনমূলক বাক্য বের করে আনতে পারবে যে কেউ কিন্তু শুধু প্রচারে থাকার সম্মোহনে লাগসই লাইন লিখে বাজিমাত করার যে সমকালীন প্রবণতা, তার সঙ্গে কবিতার যোগ সামান্যই। আর নিজে ভালো পাঠক হওয়াটা জরুরি৷ তাহলে বুঝতে পারা যাবে কবি হিসেবে নিজের অবস্থান, এ জন্য অন্যের মতামতের দরকার হবে না।

কোথাও কি সত্যিই এসিড বৃষ্টি হচ্ছে না? আমাদের বিবেকের ওপর যে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ছে, সেগুলো কি অ্যাসিডের চেয়েও বেশি দাহ্য নয়? গানের সেই মরা রাজহাঁসটি আসলে আমরাই, যারা ডানা হারিয়ে আদিম রক্তের জলোচ্ছ্বাসে নিজেদের অজান্তেই ভেসে যাচ্ছি।
৫ ঘণ্টা আগে
ভূ-পর্যটক তারেক অণুর ধারাবাহিক ভ্রমণ-কাহিনি ‘আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ’-এর অষ্টম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ। প্রতি বুধবার চোখ রাখুন বাংলা স্ট্রিমের ফিচার পাতায়।
৮ ঘণ্টা আগে
সাধারণভাবে আমরা সবাই জানি, ক্যামেরা নিরাপদ রাখতে একটি ভালো ক্যামেরা ব্যাগ বা কেস ব্যবহার করা উচিত। এতে ক্যামেরা ধুলো, আঘাত বা আঁচড় থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু শুধু ব্যাগে রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অনেক সময় এমন কিছু ছোট ছোট বিষয় থাকে, যেগুলো আমরা গুরুত্ব দিই না, অথচ সেগুলোই ক্যামেরার বড় ক
১০ ঘণ্টা আগে
আপনি কি জানেন এই রুহ আফজা প্রথম তৈরি করা হয়েছিল প্রচন্ড গরমে রোগীদের সতেজ রাখার সিরাপ হিসেবে? প্রথমবার যে মানুষেরা রুহ আফজার স্বাদ নিয়েছিলেন, তাঁরা জানতেন না ওই শরবতে ঠিক কী কী ছিল। তবু এর স্বাদ আর সুবাস মানুষের মনে জায়গা করে নেয় খুব দ্রুত।
১ দিন আগে