leadT1ad

ডিজিটাল এজিং: স্ক্রিনের আলোতে অল্প বয়সেই ত্বকের বার্ধক্য

বয়স বাড়লে ত্বকে ভাঁজ পড়বে, এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যদি সেই ভাঁজ বিশ কিংবা ত্রিশের কোঠাতেই চোখে পড়তে শুরু করে, তখন তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জানলে অবাক হবেন যে নিত্যদিন ব্যবহার করা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে বের হওয়া নীল আলো বা ব্লু-লাইটের প্রভাবে ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যেতে পারে।

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮: ১৮
ডিজিটাল এজিং: স্ক্রিনের আলোতে অল্প বয়সেই ত্বকের বার্ধক্য। এআই নির্মিত ছবি

বয়স বাড়লে ত্বকে ভাঁজ পড়বে, এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যদি সেই ভাঁজ বিশ কিংবা ত্রিশের কোঠাতেই চোখে পড়তে শুরু করে, তখন তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা সাধারণত এই অকাল বার্ধক্যের জন্য রোদ, অতিবেগুনি রশ্মি বা দূষণকেই দায়ী করি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, ত্বকের ক্ষতির একটি কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের ঘরের ভেতরেই। আর সেটি প্রায় সারাক্ষণই থাকে আমাদের হাতের মুঠোয়।

জানলে অবাক হবেন যে নিত্যদিন ব্যবহার করা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে বের হওয়া নীল আলো বা ব্লু-লাইটের প্রভাবে ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অকাল বার্ধক্যকে বলা হচ্ছে ‘ডিজিটাল এজিং’।

ব্লু-লাইট কীভাবে ত্বকের ক্ষতি করে

সূর্যের আলোতে যেমন ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থাকে, ঠিক তেমনি মোবাইল, ল্যাপটপ বা ট্যাবের স্ক্রিন থেকেও বের হয় এক ধরনের শক্তিশালী কৃত্রিম আলো। এই আলোকে বলা হয় এনার্জি ভিজিবল লাইট বা ব্লু-লাইট।

জার্নাল অব ইনভেস্টিগেটিভ ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে এই নীল আলো ত্বকের ভেতরে তুলনামূলকভাবে গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সূর্যের ইউভি রশ্মি সাধারণত ত্বকের ওপরের স্তরে বা এপিডার্মিসে ক্ষতি করে। কিন্তু ডিভাইসের নীল আলো ত্বকের দ্বিতীয় স্তর বা ডার্মিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

নিত্যদিন ব্যবহার করা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে বের হওয়া নীল আলো বা ব্লু-লাইটের প্রভাবে ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যেতে পারে। সংগৃহীত ছবি
নিত্যদিন ব্যবহার করা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা ট্যাবের স্ক্রিন থেকে বের হওয়া নীল আলো বা ব্লু-লাইটের প্রভাবে ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যেতে পারে। সংগৃহীত ছবি

এই ডার্মিস স্তরেই থাকে কোলাজেন ও ইলাস্টিন। এই দুটি উপাদানই ত্বককে টানটান ও সজীব রাখে। তাই দীর্ঘ সময় বা বারবার নীল আলোর এক্সপোজার হলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাধ্যমে কোলাজেন ক্ষয়ের প্রক্রিয়া বাড়তে পারে। ফলে সময়ের সঙ্গে ত্বকে ঢিলাভাব, সূক্ষ্ম রেখা বা বলিরেখা বেশি চোখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এ বিষয়ে স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড ইউনিলিভারের একটি গবেষণা ও পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ সময় একটানা কম্পিউটার বা ডিজিটাল স্ক্রিনের সামনে বসে কাজ করলে ত্বকে অক্সিডেটিভ চাপ ও ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে তুলনামূলকভাবে দেখানো হয়েছে, কয়েক দিন ধরে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের আলোতে থাকার ফলে যে পরিমাণ ত্বক-চাপ তৈরি হয়, তা দুপুরের কড়া রোদে অল্প সময় দাঁড়িয়ে থাকার প্রভাবের কাছাকাছি হতে পারে।

শুনতে এই সময় খুব বেশি মনে না হলেও, যারা বছরের পর বছর অফিসে বা ঘরে বসে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি ধীরে ধীরে জমতে জমতে দীর্ঘমেয়াদি ত্বকজনিত সমস্যার রূপ নিতে পারে।

কালো দাগ ও মেছতার কারণও হতে পারে স্ক্রিন

শুধু ভাঁজ বা বয়সের ছাপ নয়, স্ক্রিনের নীল আলো ত্বকের রংও নষ্ট করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লু-লাইট ত্বকের কোষের ভেতরে ক্ষতিকর এক ধরনের উপাদান তৈরি করে, যাকে বলা হয় ‘রিঅ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস’। সহজভাবে বললে, এগুলো ত্বকের ভেতরে এক ধরনের চাপ বা ক্ষয় সৃষ্টি করে, যার ফলে সুস্থ কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।

এই কারণে ত্বকের স্বাভাবিকভাবে নিজেকে সারিয়ে তোলার ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে মুখ নিস্তেজ দেখায় এবং দাগ সহজে বসে যায়।

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কসমেটিক সায়েন্স-এর এক গবেষণা বলছে, নীল আলো ত্বকের মেলানিন উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে মুখে কালো ছোপ, মেছতা বা পিগমেন্টেশনের সমস্যা দেখা দেয়।

জার্নাল অব ইনভেস্টিগেটিভ ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে এই নীল আলো ত্বকের ভেতরে তুলনামূলকভাবে গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সূর্যের ইউভি রশ্মি সাধারণত ত্বকের ওপরের স্তরে বা এপিডার্মিসে ক্ষতি করে। কিন্তু ডিভাইসের নীল আলো ত্বকের দ্বিতীয় স্তর বা ডার্মিস পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এ কারণেই অনেক সময় আমরা অবাক হয়ে যাই যে রোদে না যাওয়া সত্ত্বেও কেন আমাদের মুখে মেছতা বা কালো দাগ পড়ছে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে রাতের অন্ধকারে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার করার অভ্যাস।

‘টেক নেক’ আর চোখের চারপাশের ভাঁজ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল এজিং কেবল আলোর ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের শারীরিক ভঙ্গির কারণেও ত্বকে বয়সের ছাপ ফেলছে। ঘাড় নিচু করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করার ফলে গলার চামড়ায় ভাঁজ পড়ে, যাকে চিকিৎসকরা নাম দিয়েছেন ‘টেক নেক’।

ডা. এস্টেল রডরিগেজ নামের একজন মার্কিন বিশেষজ্ঞের মতে, একসময় এই ধরনের ভাঁজ সাধারণত বয়সী নারীদের গলায় দেখা যেত। কিন্তু এখন স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে বিশ–পঁচিশ বছরের তরুণীদের গলাতেও এই ভাঁজ স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া চোখের চারপাশের চামড়া খুব পাতলা হওয়ায় স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে চোখের নিচে কালি পড়ে এবং দ্রুত কুঁচকে যায়, যাকে বলা হয় ‘ক্রোজ ফিট’।

প্রতিকার ও বিজ্ঞানীদের পরামর্শ

ডিজিটাল এজিং পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও, কিছু অভ্যাস বদলালে এর ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়। গবেষক ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা এজন্য কয়েকটি বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ দিয়েছেন।

যতটা সম্ভব স্ক্রিনটাইম কমিয়ে আনা জরুরি। অকারণে ফোন স্ক্রল করা বা দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা ত্বকের জন্য ক্ষতিকর।

চিকিৎসকরা এখন ঘরের ভেতরেও সানস্ক্রিন ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব মিনারেল সানস্ক্রিনে জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড থাকে, সেগুলো নীল আলো প্রতিফলিত করতে সাহায্য করে।

এর পাশাপাশি ফোন বা ল্যাপটপে নাইট মোড বা ব্লু-লাইট ফিল্টার চালু রাখা উচিত। কাজের ফাঁকে প্রতি ২০ মিনিট পরপর স্ক্রিন থেকে চোখ ও মুখ সরিয়ে নেওয়াও ত্বক আর চোখের জন্য ভালো।

এছাড়া খাদ্যাভ্যাসেও সচেতন হতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিদিনের খাবারে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেমন ভিটামিন-সি যুক্ত ফল, আর বিভিন্ন রঙের শাকসবজি। এসব খাবার ত্বকের ভেতরে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর চাপ বা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।

প্রযুক্তি আমাদের জীবন নিঃসন্দেহে সহজ করেছে। কিন্তু সেই সুবিধার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি নিজের ত্বকের যত্ন না নেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতিটাও নীরবে জমতে থাকে। তাই সময় এসেছে স্ক্রিনের আলোর ব্যাপারে একটু বেশি সতর্ক হওয়ার।

Ad 300x250

সম্পর্কিত