বাংলাদেশ সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালার খসড়া প্রকাশ করেছে। এর নাম জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি ২০২৬–২০৩০। এটি প্রণয়ন করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।
এই নীতিতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার এআই হাব বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সরকারি সেবার আধুনিকায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকি মোকাবিলা ও সকল শ্রেণির মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই নীতি ভিশন ২০৪১, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি), ইউনেস্কোর এআই নৈতিক নির্দেশনা এবং ওইসিডি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে।
ভিশন
নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে একটি নৈতিক, নিরাপদ ও উদ্ভাবনী এআই পরিবেশ গড়ে তোলা হবে, যা ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে সহায়ক হবে এবং একই সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।
এই ভিশনের মাধ্যমে নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ঝুঁকি কমিয়ে আনা, মানবকেন্দ্রিক উদ্ভাবনে উৎসাহিত করা এবং দেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
মিশন
এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সমাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একীভূত করার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গড়ে তোলা; যেখানে নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা, ব্যক্তিগত ডেটার গোপনীয়তা রক্ষা করা, উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া এবং জনগণের আস্থা অর্জন করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি, দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে জাতীয় স্থিতিশীলতার ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা মানবাধিকার সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
লক্ষ্যসমূহ
স্বল্পমেয়াদ (২০২৬–২০২৭):
এই পর্যায়ে নৈতিকভাবে এআই ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হবে, পক্ষপাত ও ভুয়া তথ্যের মতো ঝুঁকি কমানো হবে, পাশাপাশি মৌলিক অবকাঠামো তৈরি ও মানবসম্পদ দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে।
মধ্যমেয়াদ (২০২৭–২০২৮):
এই সময়ে দেশীয় এআই উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হবে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে, কর্মজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদ (২০২৮–২০৩০):
এই ধাপে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় এআই নেতৃত্বে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এবং সব খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই প্রয়োগ করা হবে।
কৌশলগত স্তম্ভসমূহ
নিয়ন্ত্রক কাঠামো
নীতিমালায় ঝুঁকির শ্রেণিকরণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিষিদ্ধ, উচ্চ ঝুঁকির, সীমিত ঝুঁকির ও নিম্ন ঝুঁকির এআই আলাদা করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে সামাজিক স্কোরিং ও অননুমোদিত গণ-নজরদারির মতো কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে; এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ব্যবহৃত এআইকে উচ্চ ঝুঁকির এবং চ্যাটবটকে সীমিত ঝুঁকির ডিজিটাল বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, এবং সব ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমিক প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক থাকবে।
ডেটা শাসনব্যবস্থা
ডেটা সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে জাতীয় ডেটা গভর্ন্যান্স অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন, ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা অধ্যাদেশ কার্যকর, নিরাপদ ডেটা শেয়ারিং এবং দেশের ভেতরে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ বাধ্যতামূলক করা হবে।
অবকাঠামো উন্নয়ন
জাতীয় এআই কম্পিউট কৌশল, হাইব্রিড ক্লাউড ব্যবস্থা, গ্রিন এআই ব্যবহার এবং ৫জি ও ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো শক্তিশালী করা হবে।
সরকারি ক্রয় ও গণমাধ্যম নীতিমালা
ই-জিপি প্ল্যাটফর্মে নৈতিক এআই সনদ যুক্ত করা, কর প্রণোদনা প্রদান এবং ভুয়া তথ্য, ডিপফেক ও প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা দমনের জন্য আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
অধিকার সুরক্ষা ও জনসচেতনতা
এআই সিদ্ধান্তে মানব পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা হবে, পক্ষপাত নিরীক্ষা চালু থাকবে এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
সরকারি প্রশিক্ষণে এআই নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং নৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক সমন্বয়
জাতিসংঘ, ওইসিডি, ইউরোপীয় কাউন্সিল এবং আসিয়ান, সার্ক ও বিমসটেকের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে।
প্রধান উদ্যোগ
নীতিমালার আওতায় জাতীয় ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি গঠন করা হবে, যা এআই মান নির্ধারণ, তদারকি ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে।
রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স চালুর মাধ্যমে নিরাপদ পরিবেশে এআই পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করা হবে।
এআই ইনোভেশন ফান্ড গঠনের মাধ্যমে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে স্টার্টআপ ও গবেষকদের অনুদান দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় বাংলা ভাষা মডেল তৈরি করা হবে।
ন্যাশনাল রিসার্চ ডেটা এক্সচেঞ্জ চালু করে একটি নিরাপদ ডেটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।
সরকারি সেবা, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় খাতভিত্তিকভাবে এআই প্রয়োগ করা হবে।
হেল্পলাইন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ও নৈতিক এআই নীতিমালা প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু থাকবে।
শাসন কাঠামো
এই নীতিমালায় একটি শক্তিশালী শাসন কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে এআই ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও বাস্তবায়ন পরিচালিত হবে।
জাতীয় ডিজিটাল গভর্ন্যান্স ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি নীতি সমন্বয়, নির্দেশিকা জারি, অ্যালগরিদমিক প্রভাব মূল্যায়ন তদারকি এবং এআই সিস্টেমকে সনদ প্রদানের দায়িত্ব পালন করবে।
স্বাধীন তদারকি কমিটি সংসদীয় আইনের মাধ্যমে গঠিত হবে, যেখানে নীতিবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা থাকবেন, এবং তারা নিয়মিত নিরীক্ষা পরিচালনা, চলমান প্রকল্প তদারকি ও প্রতিবছর “স্টেট অব এআই” প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রভাব বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে।
আইসিটি বিভাগের অধীনে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন সেল থাকবে, যা পাইলট প্রকল্প, রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স এবং জাতীয় ভাষা মডেলের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে।
আইন মন্ত্রণালয় ২০২৮ সালের মধ্যে এআই দায়বদ্ধতা আইন প্রণয়ন করবে, যা বিদ্যমান অধ্যাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
সমন্বিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কাঠামোর মাধ্যমে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি রোধ করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও অংশীজনদের যুক্ত করা হবে।
কীভাবে হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ায় এআই হাব
নীতিমালার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার এআই কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য দেশীয় অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিপিইউ, ডেটা সেন্টার ও ৫জি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে, যাতে দেশীয় এআই উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হয়। এ লক্ষ্যে যা যা করা হবে :
স্টার্টআপ খাতে রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স, কর প্রণোদনা ও তহবিল সহায়তার মাধ্যমে উদ্ভাবন ও রপ্তানি বাড়ানো হবে।
সার্ক, বিমসটেক ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় ও সম্পদ ভাগাভাগি করা হবে।
বাংলা ভাষানির্ভর এআই মডেল তৈরি করে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাজার প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হবে।
কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির উদাহরণ তৈরি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় এআই অন্তর্ভুক্ত, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা হবে।
নৈতিক বিবেচনা কী
নীতিমালায় মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা, মানবকেন্দ্রিক নকশা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও তদারকিকে মূল নীতি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনে ডিপফেক ব্যবহারের মতো ক্ষতিকর প্রয়োগ ও অনুমতি ছাড়া ডেটা ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকবে, বিশেষ করে শিশুদের তথ্য ব্যবহারে কঠোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
সম্মতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে, মডেলে সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে এবং এআই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার থাকবে।
ভুক্তভোগীদের জন্য প্রতিকার ব্যবস্থা থাকবে এবং গোপনীয়তা, বৈষম্যহীনতা ও স্বাধীনতার ওপর প্রভাব অ্যালগরিদমিক প্রভাব মূল্যায়নের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
ঝুঁকি মোকাবিলা করা হবে কীভাবে
নীতিমালায় বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করে একটি বিস্তৃত ঝুঁকি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
মানবাধিকারে হস্তক্ষেপ রোধে নিষেধাজ্ঞা ও নিরীক্ষা থাকবে, সিস্টেম ব্যর্থতা ও সাইবার হুমকি মোকাবিলায় রেড-টিমিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু থাকবে, ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নকশা গ্রহণ করা হবে এবং জনসচেতনতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে জনগণের অনাস্থা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ঝুঁকি শ্রেণিবিন্যাস, নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ, অবৈধ ডেটা মুছে ফেলা এবং পুরোনো সিস্টেম বাতিলের বিধান কার্যকর থাকবে।
বাস্তবায়ন কৌশল কী
নীতিটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, যেখানে প্রথমে নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা, পরবর্তী সময়ে অবকাঠামো ও উদ্ভাবন এবং শেষ ধাপে নেতৃত্ব অর্জনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ তহবিল, গবেষণায় কর ছাড় এবং সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার প্রদানের মাধ্যমে এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে এবং নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
২০২৮ সালে মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা, মূল্যায়ন এবং ২০৩০ সালে নীতির মেয়াদ শেষে প্রয়োজন অনুযায়ী নবায়নের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০২৮ সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ এআই আইন প্রণয়ন করা হবে, যেখানে অংশীজন ও জনসাধারণের মতামত অন্তর্ভুক্ত থাকবে।