রামমন্দিরে চুরির তদন্ত নিয়ে বিজেপি-আরএসএসে অস্বস্তি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ১৬: ২৬
ভারতের অযোধ্যায় রাম মন্দির। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের অযোধ্যার রামমন্দিরে দানের অর্থ ও সম্পদ চুরির ঘটনা তদন্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। তবে এ নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রভাবশালী অংশের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

কারণ, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টে’ আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের শীর্ষ নেতাদের আধিপত্য রয়েছে। তাঁদের অনেককেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনুমোদন দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। খবর দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না— এমন ঘোষণা দিয়ে যোগী আদিত্যনাথ নিজেকে আপসহীন হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। আর সংঘ–বিজেপি ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য, এই অবস্থান সংগঠনের ভেতরে এমন বার্তা দিচ্ছে, প্রভাবশালী নেতারাও তদন্তের বাইরে নন।

দিল্লির এক জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা বলেন, অনুদান কেলেঙ্কারিকে সামনে এনে যোগী আদিত্যনাথ নিজেকে স্বচ্ছ ও কঠোর হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতে নিজেকে মোদির সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।

এদিকে, রাজ্য সরকারের চাপের মুখে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এবং জ্যেষ্ঠ ট্রাস্টি অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন। তবে সূত্রের দাবি, শুরুতে তাঁরা পদত্যাগে রাজি ছিলেন না। পরে দেওরিয়ায় মুখ্যমন্ত্রীর কড়া সতর্কবার্তার পর অবস্থান বদলান। তিনি বলেছিলেন, যারা জনগণের বিশ্বাস নিয়ে খেলবে, তাদের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।

মন্দিরের ট্রাস্ট প্রথমে এফআইআর করার বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারের চাপে সিদ্ধান্ত বদল করে বলেও জানিয়েছে ভেতরের একটি সূত্র।

ট্রাস্টে দুর্নীতির অভিযোগ প্রথম দিকে যারা তুলেছিলেন, তাঁদের একজন আম আদমি পার্টির সাংসদ সঞ্জয় সিং। তাঁর অভিযোগ যেভাবে গ্রহণ করা হয়েছে তাতে আদিত্যনাথের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

কারণ, এর আগে সঞ্জয় সিং অযোধ্যায় জমি কেনাবেচায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে রাই ও মিশ্রের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি করেছিলেন। তবে ওই সময় তিনি প্রশাসনের বিরূপ আচরণের মুখে পড়েন।তাঁর দিল্লির বাসভবনে বিজেপি কর্মীদের হামলার অভিযোগও ওঠে। অথচ গত সপ্তাহে সঞ্জয় সিংকে প্রমাণ জমা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এসআইটি।

সঞ্জয় সিং বলেন, আমি জমি কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পর্কিত নথি জমা দিয়েছি, যাতে চম্পত রাই, অনিল কুমার মিশ্র, সাবেক বিজেপি মেয়র ঋষিকেশ উপাধ্যায় এবং তার ভাতিজা দীপ নারায়ণ জড়িত।

তিনি অভিযোগ করেন, মন্দিরের অনুদান চুরির ঘটনায় চম্পত রাই সহায়তা করেছেন।

যেভাবে সামনে রাম মন্দিরে চুরির ঘটনা

রাম মন্দিরের দানবাক্স থেকে ভক্তদের দেওয়া টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী চুরির চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারির বিষয়টি সামনে আসে চলতি মাসের শুরুতে। ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি টাকা চুরির এই ঘটনা জানার পর ভারতজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দলের প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে মন্দিরের ৮ কর্মীকে গ্রেপ্তার করে।

তদন্তে জানা গেছে, মন্দিরের ভেতরেই একটি সুসংগঠিত চক্র গত এপ্রিল মাস থেকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই চুরি করছিল। গর্ভগৃহ থেকে দানবাক্সগুলো যখন গণনা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হতো, তখন সিসিটিভি ক্যামেরার নজর আড়াল করে ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিল এবং সোনা-রুপার সামগ্রী সরিয়ে ফেলা হত। এরপর সেই টাকা প্রথমে গণনা কক্ষের বাথরুমে লুকিয়ে রাখা হতো এবং পরে সুযোগ বুঝে বাইরে পাচার করা হতো।

মে মাসের শেষ দিকে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ব্যাংক হিসাবে বড় অংকের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় প্রথম ট্রাস্টের সন্দেহ হয়। এরপর ৪ জুন ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ নজরদারিতে চুরির বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে। পুলিশের অভিযানে প্রাথমিকভাবেই এক অভিযুক্তের বাড়ি থেকে ৫৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে জানা গেছে, গত ২৭ এপ্রিল থেকে ৫ জুনের মধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরায় অন্তত ৭০ বার এই চুরির দৃশ্য রেকর্ড হয়।

সাধারণ সংঘ কর্মী নন রাই ও মিশ্র

চুরির ঘটনা সামনে আসার পর ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টে’ সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এবং জ্যেষ্ঠ ট্রাস্টি অনিল মিশ্র পদত্যাগ করেছেন।

সূত্র জানিয়েছে, ২৩ জুন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া এসআইটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আটজনের অধিকাংশকে রাই ও মিশ্র নিয়োগ করেছিলেন।

এতে আরও বলা হয়েছে বলে জানা গেছে, অনুদান নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ কয়েক মাস ধরে উপেক্ষিত ছিল। বিষয়টি রাজনৈতিক মাত্রা পাওয়ার পরই কেবল ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

রাই বা মিশ্র কেউই সাধারণ সংঘ কর্মীও নন। আরএসএসের প্রবীণ নেতা রাই রামমন্দির আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। বর্তমানে তিনি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক সহসভাপতি।

মিশ্রও সংঘ পরিবারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মাধ্যমে রামমূর্তি প্রতিষ্ঠার আগে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ঊষা প্রধান যজমানের দায়িত্ব পালন করেন এবং কয়েক দিন ধরে বিস্তৃত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।

অনুষ্ঠানে মোদি ও আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের সঙ্গে ওই দম্পতিকেও দেখা যায়। আদিত্যনাথের ঘনিষ্ঠরা তাঁর অবস্থানের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, আগামী বছরের শুরুতে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে।

গোরখপুরের এক বিজেপি নেতা বলেন, ভগবান রাম ও সনাতন ধর্মের প্রতি যোগীর অঙ্গীকার প্রশ্নাতীত। এত বড় চুরির ঘটনায় তিনি নরম অবস্থান নিতে পারেন না।

তিনি বলেন, এই তদন্ত শিথিল করার পরামর্শ কোনো জ্যেষ্ঠ বিজেপি বা আরএসএস নেতা প্রকাশ্যে দিতে পারবেন না, কারণ এই ঘটনা বৃহত্তর সংঘ পরিবারের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

আদিত্যনাথের দৃঢ় অবস্থান রামমন্দির ট্রাস্ট থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতিফলনও হতে পারে।

বর্তমানে তিনি যে গোরক্ষনাথ মঠের প্রধান, সেই মঠ ১৯৪৯ সাল থেকে রাম জন্মভূমি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ওই বছরই কথিতভাবে বাবরি মসজিদের ভেতরে রামের মূর্তি স্থাপন করা হয়। কিন্তু ২০২০ সালে ট্রাস্ট গঠনের সময় গোরক্ষনাথ মঠের কেউই সেখানে স্থান পাননি বলে ওই সূত্র জানায়।

তিনি বলেন, গোরক্ষনাথ মঠের ঐতিহাসিক অবদান থাকা সত্ত্বেও ট্রাস্টের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগই কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে হয়েছে।

রাই ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক হলেও, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রধান সচিব নৃপেন্দ্র মিশ্রকে মন্দির নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়। ওই সূত্রের দাবি, এই দুই নিয়োগের কোনো ক্ষেত্রেই যোগীর সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাইয়ের ঘনিষ্ঠতা এবং ট্রাস্টে তাঁর প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই মুখ্যমন্ত্রীকে বিরক্ত করে আসছে।

মিশ্র প্রথমে চুরির অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, মন্দির নির্মাণ শেষ হওয়ায় তাঁর দায়িত্বও শেষ। পরে অবশ্য তিনি অবস্থান বদলে লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলেন।

শুরুতে তিনি রাইয়ের ব্যক্তিগত সততার পক্ষে কথা বললেও পরে ধীরে ধীরে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। তিনি মন্দিরের দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য পূর্ণকালীন সিইও বা প্রশাসক নিয়োগের পক্ষে মত দেন।

সূত্রের মতে, এসআইটির প্রাথমিক প্রতিবেদন আসার আগেই আদিত্যনাথ রাইকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন। ১৯ জুন রামমন্দির সফরের সময় তিনি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, রাই যেন তার সঙ্গে না থাকেন— যা আগের সফরগুলোর তুলনায় ভিন্ন ছিল।

এই চুরির ঘটনা আরএসএসের ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলেছে। সংগঠনটি নিজেকে জাতি গঠন ও জনসেবায় নিবেদিত একটি নিঃস্বার্থ সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে। তবে এ পর্যন্ত আরএসএস নেতৃত্ব এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব।

এই বিতর্ক কর্ণাটকের মন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খাড়গের পুরনো অভিযোগ আবার সামনে এনেছে। তিনি বলেছিলেন, আরএসএস তাদের সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে কর-ছাড়প্রাপ্ত অনুদান নিয়ে একটি বৃহৎ অর্থপাচার চক্র পরিচালনা করে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত