আউটলুকের বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বে ভারতের কপালে ভাঁজ কেন

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ২০: ২৫
বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বে ভারতের কপালে কেন ভাঁজ। স্ট্রিম গ্রাফিক

চীনে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে গতকাল ২৬ জুন দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের মধ্য দিয়ে এই সফরের সমাপ্তি ঘটে। এই সফরে চীনা কোম্পানি ও মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে এক ডজনেরও বেশি চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ-চীনের এই বন্ধুত্ব ভারতের জন্য ফের প্রশ্ন সামনে এনেছে—ঢাকা-বেইজিংয়ের ঠিক কতটা কাছাকাছি যেতে চায় এবং ভারতের নিজস্ব আঙিনায় এই সম্পর্কের অর্থ কী দাঁড়াবে?

নয়াদিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে শীতলতা

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে। এ সময় ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার এবং ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে হামলার জেরে কনস্যুলার কার্যক্রম বা ভিসা সেবা সীমিত করে ভারত।

এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যতই চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

২০১৫ সালের একটি চুক্তির আওতায় মোংলা বন্দরের পাশের ১১০ একর জমি ভারতীয় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান হিরানন্দানি গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইভিটা কনস্ট্রাকশনসকে বরাদ্দ দিয়েছিল বাংলাদেশ।
কিন্তু চুক্তির সময়সীমা অনুসারে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরুতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার সেই বরাদ্দ বাতিল করে। গত ২৫ জুন একই জমির জন্য চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি সই করে বাংলাদেশ।

চীন থেকে বাংলাদেশের অর্জন

মালয়েশিয়া থেকে শুরু হওয়া এই সফরের প্রধান আকর্ষণ ছিল তারেক রহমান ও চিন পিংয়ের বৈঠক। এই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দুটি চুক্তি এবং ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল, তিস্তার নদী ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা, বৈদ্যুতিক যান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ২২০ মিলিয়ন ডলারের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এই সফরে ড্রোন প্রযুক্তিসহ ২৪টি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পথও সুগম হয়েছে।

এছাড়া, বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ব্রিফিং অনুযায়ী, চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেজিং এবং সেচ ব্যবস্থাসহ 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' নিয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা করেছেন।

ভারত কেন চিন্তিত?

ভারতের অস্বস্তির মূল কারণ বাণিজ্যের পরিসংখ্যান নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থান। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্য দিয়ে যাবে, যা সরাসরি শিলিগুড়ি করিডোরের গায়ে অবস্থিত। এই সরু করিডোরই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এই এলাকায় চীনের যেকোনো ধরনের উপস্থিতি ভারতের জন্য বিপৎসংকেত।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের এই স্থাপনা ভারতের করিডোর থেকে মাত্র ১৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আধুনিকায়নের উদ্দেশে এই স্থাপনায় ইতিমধ্যে চীনা কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন বলে খবর রয়েছে। ফলে ভারতের এই দুশ্চিন্তা আর কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে নেই।

ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরে মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারত মহাসাগরে চীনের বৃহত্তর বন্দর বিনিয়োগের প্যাটার্ন বা ছকের অংশ হিসেবে দেখেছেন। পাকিস্তানের গোয়াদর এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরও এই ছকের অন্তর্ভুক্ত।

ফেয়ার অবজারভারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সমালোচকরা চীনের এই কৌশলকে 'স্ট্রিং অব পার্লস' বা মুক্তার মালা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ভারতের ভূমিকা

নয়াদিল্লি দুটি আলাদা পথে কাজ করছে। কঠোর নিরাপত্তার দিক থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া সুনির্দিষ্ট। 'স্বরাজ্য' সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত আসামের ধুবড়ির কাছে লাচিত বরফুকান সামরিক স্টেশনসহ পশ্চিমবঙ্গে চোপড়া এবং বিহারের কিষাণগঞ্জে ফরোয়ার্ড ঘাঁটি নির্মাণ করেছে।

পাশাপাশি ওই অঞ্চলে রাফাল যুদ্ধবিমান, ব্রহ্মোস মিসাইল এবং টি-৯০ ট্যাংক মোতায়েন করেছে তারা। অন্যদিকে কূটনৈতিক দিক থেকে, বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা খোলা রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত।

চলতি সপ্তাহেই নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঘোষণা করেছেন, প্রায় দুই বছরের বিরতির পর ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য স্বাভাবিক পর্যটক ভিসা আবেদন ফের শুরু করবে ভারত।
এর আগে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা যোগাযোগ পুনরায় চালু করার পাশাপাশি 'বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন'-এর মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে যেখানে যতটুকু সুযোগ পাচ্ছে, সব দিক থেকেই নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত (হেজিং) করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ যেকোনো একপক্ষকে নির্দিষ্টভাবে বেছে নেবে, এমন কিছু অবশ্য ভারত আশা করে না।

Ad 300x250

সম্পর্কিত