যুক্তরাষ্ট্রে আ.লীগের ৩ কোটির লবিস্ট, টিকল মাত্র ৩৭ দিন

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন— এই লবিং কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল।

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ২২: ১০
ছয় মাসে আওয়ামী লীগের খরচ হতো ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বেশি। স্ট্রিম গ্রাফিক

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তাদের পক্ষে নিউইয়র্কভিত্তিক ‘গ্লোবাল এআই করপোরেশন’ চুক্তি করে ‘ব্রাউনস্টেইন হায়াত ফারবার শ্রেক’– এর সঙ্গে। তবে মাত্র ৩৭ দিনের মাথায় চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ‘ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট (এফএআরএ)’ ইউনিটে জমা দেওয়া চুক্তি–সংক্রান্ত নথিতে বলা হয়েছে, গ্লোবাল এআই করপোরেশনের সিইও রিচার্ড রথেনবার্গ গত বছরের ২৫ আগস্ট চুক্তিতে সই করেন। ছয় মাস মেয়াদি চুক্তিতে ওয়াশিংটনের শীর্ষস্থানীয় লবিং প্রতিষ্ঠান ব্রাউনস্টেইনকে প্রাথমিকভাবে মাসে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা (৪৫ হাজার মার্কিন ডলার) দেওয়ার কথা। এই হিসাবে ছয় মাসে আওয়ামী লীগের খরচ হতো ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার (২ লাখ ৭০ হাজার ডলার) বেশি।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন— এই লবিং কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল বলে জানায় ব্রাউনস্টেইন।

নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে আওয়ামী লীগের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই লবিস্ট নিয়োগ দেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। গত ৩০ মার্চ জমা দেওয়া সাপ্লিমেন্টাল স্টেটমেন্টে ব্রাউনস্টেইন জানায়, গ্লোবাল এআই করপোরেশনের সঙ্গে তাদের চুক্তি ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর অবসান হয়েছে।

লবিং কার্যক্রম থেকে আওয়ামী লীগ লাভবান হবে বলে এফএআরএ ইউনিটে জমা দেওয়া নথিতে উল্লেখও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের এফএআরএর রেজিস্ট্রেশন ইউনিটে গত ৪ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া নিবন্ধন বিবরণীর প্রদর্শনী-বি (রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৫৮৭০)– তে বলা হয়, গ্লোবাল এআই করপোরেশন আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করবে, যাতে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন উপাত্ত সরবরাহ করা যায়।

এই লবিং কার্যক্রমের জন্য চার কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করে ব্রাউনস্টেইন। তাঁরা হলেন– পলিসি ডিরেক্টর সামান্থা কার্ল-ইয়োডার, এডওয়ার্ড রয়েস, সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার লরেন ডিকম্যান ও থমাস এন. ওটকা। তাদের কাজের বিবরণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও নির্বাচন ইস্যুতে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরির কথা বলা হয়েছিল। তবে ১ অক্টোবর লবিং কার্যক্রম থেকে এই চারজনকে সরিয়ে নেয় ব্রাউনস্টেইন।

আর্থিক লেনদেনের হিসাবে দেখা যায়, সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের ফি (জিআর ফি) হিসেবে ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গ্লোবাল এআই করপোরেশনের কাছ থেকে ৭ হাজার ৫০০ ডলার পেয়েছিল ব্রাউনস্টেইন। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে লবিংয়ের পেছনে কোনো অর্থ ব্যয় বা খরচের হিসাব দেখানো হয়নি। এর কারণ হিসেবে নথিতে কেবল দুটি শব্দ লেখা হয়েছে– ‘ক্লায়েন্ট টারমিনেটেড’।

তবে কেন এই চুক্তি বাতিল হলো, সে ব্যাপারে জানতে পারেনি স্ট্রিম। এই প্রতিবেদক বিষয়টি নিয়ে গত ৪ মে গ্লোবাল এআই করপোরেশন এবং ব্রাউনস্টেইন হায়াত ফারবার শ্রেক, এলএলপিকে ই-মেইল করলেও, তারা জবাব দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের কাছে ব্রাউনস্টেইনের প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান নরম্যান ব্রাউনস্টেইনের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। লবিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রাউনস্টেইন ২০২১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আয়ের দিকে শীর্ষ অবস্থান করছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই ওয়াশিংটনে লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছিলেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তাঁর মালিকানাধীন ‘ওয়াজেদ ইনকরপোরেটেড’-এর মাধ্যমে ‘স্ট্রাইক গ্লোবাল ডিপ্লোমেসি’ নামে লবিং ফার্মকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই লবিং কার্যক্রমের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক তথ্যপ্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এই ব্যাপারে অবগত নই।’ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘এই ধরনের কোনো উদ্যোগের কথা আমার জানা নেই। দলের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে পরামর্শ বা মতামত দেওয়ার জন্য বিদেশে অবস্থানরত দলের কোনো শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ত এটি করে থাকতে পারেন। সাধারণ ধারণা পাওয়ার পর চুক্তিটি বাতিল করাই স্বাভাবিক।’

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই ওয়াশিংটনে লবিস্ট নিয়োগ দিয়েছিলেন তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর সজীব ওয়াজেদের মালিকানাধীন ‘ওয়াজেদ ইনকরপোরেটেড’-এর মাধ্যমে ‘স্ট্রাইক গ্লোবাল ডিপ্লোমেসি’ নামে লবিং ফার্মকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ক্রিশ্চিয়ান বোর্জ এবং রবার্ট স্ট্রাইকের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ক্রিশ্চিয়ান বোর্জ ও রবার্ট স্ট্রাইক ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।

সজীব ওয়াজেদের চুক্তির উদ্দেশ্যে বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে মার্কিন সরকারের নির্বাহী ও আইন প্রণয়নকারী শাখাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক দমন-পীড়ন ও হত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়াই বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ক্ষমতা গ্রহণের পর দলটি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আদেশ বহাল রেখেছে।

সম্পর্কিত