বিশ্বজুড়ে যখন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা চরমে, তখন সুইজারল্যান্ডের দাভোসে চলছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৫৬তম বার্ষিক সম্মেলন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘এ স্পিরিট অব ডায়ালগ’ বা ‘সংলাপের চেতনা’। তবে এই শিরোনামের সঙ্গে বাস্তবতার যোজন যোজন দূরত্ব দেখছেন বিশ্লেষকরা। সমালোচকদের মতে, সংলাপের বদলে এবারের দাভোস হয়ে উঠেছে ‘সংঘাত’ আর ‘ক্ষমতার প্রদর্শনী’র উত্তপ্ত মঞ্চ। তাই সংগতই প্রশ্ন উঠেছে—দাভোস কি এখন শুধুই ফাঁকা বুলি?
আয়োজকরা ২০০ সেশনে সহযোগিতা, প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির কথা বলছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এবারের শিরোনামকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। মার্কিন থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দাভোসের কথিত ‘সংলাপ’ এখন মূলত একপাক্ষিক আল্টিমেটাম বা হুঁশিয়ারিতে রূপ নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যেই তাঁর ন্যাটো মিত্রদের ভূখণ্ড কেনার জন্য অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেন, তখন ‘সংলাপের চেতনা’ অসার মনে হয়। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্কের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের হুমকিকে ইউরোপীয় নেতারা দেখছেন ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে।
দাভোসের মূল আকর্ষণ সাধারণত বিশ্বায়ন ও মুক্তবাণিজ্য। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতি এবং তাঁর ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি সম্মেলনের মূল সুরকেই নষ্ট করে দিয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্কের অনুপস্থিতি ও ইউরোপীয় নেতাদের অস্বস্তি প্রমাণ করে, পশ্চিমা জোট বা ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে। এই বিভক্তি ‘সংলাপের চেতনা’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সম্মেলনের জৌলুসও এবার অনেকটা ম্লান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতো এশীয় পরাশক্তির শীর্ষ নেতারা এবার দাভোসে নেই। রাশিয়া ও ইরানের প্রতিনিধিরাও ভূ-রাজনৈতিক কারণে অনুপস্থিত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দাভোস প্রকৃত অর্থে ‘গ্লোবাল’ না হয়ে ক্রমশ ‘পশ্চিমা এলিটদের ক্লাব’-এ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে সম্মেলনের ‘বাস্তবতা-বিবর্জিত’ চরিত্র নিয়ে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা অক্সফামের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ধনীদের সম্পদ বাড়লেও সাধারণ মানুষের বৈষম্য প্রকট হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান-এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, দাভোসে যখন প্রাইভেট জেটের মেলা বসে এবং সিইও-রা এআই দিয়ে মুনাফা বাড়ানোর ছক কষেন, তখন বাইরে সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে পিষ্ট হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে মুনাফার হাতিয়ার ভাবলেও শ্রমিক নেতারা একে দেখছেন জীবিকার হুমকি হিসেবে। নীতিনির্ধারকরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বললেও কার্যকর পদক্ষেপের চেয়ে কথার ফুলঝুরিই বেশি শোনা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এবারের দাভোস সম্মেলনকে ‘বাস্তবতা-বিবর্জিত’ এক অনুষ্ঠান মনে করছেন অনেকে। সংলাপের চেতনা ছাপিয়ে বিভক্তি আর স্বার্থের দ্বন্দ্বে দাভোস এখন কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।