জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

শত বছরের ঐতিহ্য: রুহ আফজা এখনও কেন জনপ্রিয়

আপনি কি জানেন এই রুহ আফজা প্রথম তৈরি করা হয়েছিল প্রচন্ড গরমে রোগীদের সতেজ রাখার সিরাপ হিসেবে? প্রথমবার যে মানুষেরা রুহ আফজার স্বাদ নিয়েছিলেন, তাঁরা জানতেন না ওই শরবতে ঠিক কী কী ছিল। তবু এর স্বাদ আর সুবাস মানুষের মনে জায়গা করে নেয় খুব দ্রুত।

রুহ আফজা। এআই জেনারেটেড ছবি

রমজান মাস শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই বাংলাদেশের দোকানগুলোতে দেখা যায় লাল রঙের বোতলে ভরা ‘রুহ আফজা’। আজকের দিনে বাজারে অসংখ্য পানীয় পাওয়া যায়। তবু শত প্রতিযোগিতার মাঝেও রুহ আফজা তার জায়গা ধরে রেখেছে।

১৯০৬-০৭ সালে হামদর্দ-এর প্রতিষ্ঠাতা হাকিম আবদুল মজিদ তৈরি করেছিলেন এই প্রাণ শীতলকারী পানীয়। পুরোনো দিল্লীর ছোট এক অন্ধকার গলিতে তৈরি করা এই লালরঙা শরবত এখন পাওয়া যায় ৩৭টি দেশে।

কিন্তু আপনি কি জানেন এই রুহ আফজা প্রথম তৈরি করা হয়েছিল প্রচন্ড গরমে রোগীদের সতেজ রাখার সিরাপ হিসেবে? প্রথমবার যে মানুষেরা রুহ আফজার স্বাদ নিয়েছিলেন, তাঁরা জানতেন না ওই শরবতে ঠিক কী কী ছিল। তবু এর স্বাদ আর সুবাস মানুষের মনে জায়গা করে নেয় খুব দ্রুত। অল্প সময়েই দিল্লির বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এর জনপ্রিয়তা।

রুহ আফজার ইতিহাস

ফার্সি ভাষায় ‘রুহ’ শব্দের অর্থ ‘আত্মা’ এবং ‘আফজা’ শব্দের অর্থ ‘যা বর্ধিত করে’ বা ‘সজীব করে’। অর্থাৎ রুহ আফজার শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায় ‘আত্মার প্রশান্তি’। শোনা যায়, হাকিম আব্দুল মজিদ এই নামটি নিয়েছিলেন ‘মাসনভি গুলজার-ই-নাসিম’ নামক পুরোনো বইয়ের একটি চরিত্রের নাম থেকে। পান করার পর মানুষের শরীর ও মন জুড়িয়ে যায় বলেই হয়তো এর এমন নাম রেখেছিলেন হাকীম আব্দুল মাজীদ।

হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ, তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বেগম। সংগৃহীত ছবি
হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ, তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বেগম। সংগৃহীত ছবি

দিল্লির লাল কুয়ান বাজারের একটি ভবনে হাকিম আবদুল মাজীদের দাওয়াখানা ছিল। গ্রীষ্মের এক প্রচণ্ড গরম দিনে তিনি ভাবলেন, রোগীদের জন্য এমন একটি শরবত তৈরি করা যায় কি না, যা সুস্বাদু হবে এবং শরীরকে সতেজ করবে। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় রুহ আফজা।

শুরুতে এটি ‘হামদর্দ দাওয়াখানা’র রোগীদের দেওয়া হতো। পরে ধীরে ধীরে লাল কুয়ান বাজারেও এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। সেই থেকেই রুহ আফজার সঙ্গে হামদর্দ নামটি জড়িয়ে যায়

হাকিম মারা যাওয়ার পর ব্যবসার দায়িত্ব নেন তাঁর স্ত্রী রাবিয়া বেগম। কয়েক বছর পরে দায়িত্ব পান বড় ছেলে আবদুল হামিদ। ভারতে হামদর্দের বিকাশ মূলত তাঁর হাত ধরেই। এদিকে ছোট ছেলে মুহাম্মদ সাঈদ পাকিস্তানে চলে গেলে রুহ আফজার ইতিহাসেও একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পাকিস্তানে গিয়ে তিনি রুহ আফজা তৈরি করা শুরু করেন। তবে সেখানে উপাদানে সামান্য পরিবর্তন আসে।

১৯০৬-০৭ সালে হামদর্দ-এর প্রতিষ্ঠাতা হাকিম আবদুল মজিদ তৈরি করেছিলেন এই প্রাণ শীতলকারী পানীয়। পুরোনো দিল্লীর ছোট এক অন্ধকার গলিতে তৈরি করা এই লালরঙা শরবত এখন পাওয়া যায় ৩৭টি দেশে।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর হামদর্দ পাকিস্তান তখন হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ হিসেবে কাজ শুরু করে। এরপর ইউসূফ হারুণ ভুইঁয়া বাংলাদেশের হামদর্দে যোগ দেন এবং রূহ আফজা প্রস্তুত ও বিক্রি শুরু করেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার, রুহ আফজার রেসিপিটি কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছে এবং প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় আজও সংরক্ষিত রয়েছে।

রুহ আফজা যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল দেশে দেশে

পাকিস্তানে প্রথমে করাচির আরামবাগ এলাকায় একাই রুহ আফজা তৈরি করতেন হাকিম সাঈদ। পরে এর চাহিদা বেড়ে গেলে তিনি সেখানে কারখানা স্থাপন করেন। শুধু তাই নয় রুহ আফজার প্রচারণার কাজও তিনিই সামলেছেন, নিজেই লিখতেন তাঁর বিজ্ঞাপনের কপি। রুহ আফজাকে অভিহিত করতেন ‘মাশরুবে মাশরিক’ বা প্রাচ্যের গ্রীষ্মকালীন পানীয় হিসেবে।

পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও নারীদের পত্রিকাগুলোয়ও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে এই শরবতের বিজ্ঞাপন। দাবি করা হয়, রুহ আফজা গ্রীষ্মকালের তপ্ত গরমে তৃষ্ণা মেটানো ও অবসাদ দূর করার মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। এমন প্রচারণা কাজে দিতে সময় লাগল না বেশি। ক্রমেই বাড়িতে বাড়িতে রুহ আফজা রাখতে শুরু করলেন ক্রেতারা। বিজ্ঞাপনে দেখা যেতে থাকল রুহ আফজার গ্লাস হাতে বরপক্ষকে অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছে। মূলত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই মানুষকে উৎসাহিত করা হয় বন্ধু ও আত্মীয়দের রুহ আফজা দিয়ে আপ্যায়ন করতে।

ছোটদের ম্যাগাজিনে রুহ আফজা নিয়ে বিজ্ঞাপন ও গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। বিশেষ করে হামদর্দের নিজস্ব ম্যাগাজিন ‘নওনেহাল’ নিয়মিত এসব গল্প তুলে ধরত মানুষের কাছে। এভাবে হাকিম সাঈদ পুরো একটি প্রজন্মের মনে রুহ আফজাকে স্মৃতিমাখা আবেগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

পুরোনো দিনের বিজ্ঞাপনে রুহ আফজা। বিবিসি থেকে নেওয়া ছবি
পুরোনো দিনের বিজ্ঞাপনে রুহ আফজা। বিবিসি থেকে নেওয়া ছবি

রুহ আফজার জনপ্রিয়তা এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে পাকিস্তানে একে অনেকেই ‘ডি ফ্যাক্টো জাতীয় পানীয়’ বলে উল্লেখ করেন। খেলাধুলার টুর্নামেন্টে বিরতির সময় খেলোয়াড়দের সামনে রুহ আফজা দেওয়া হতো।

ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক বহু সময়েই তিক্ত ছিল। কিন্তু রুহ আফজা দুই দেশের মানুষের মাঝে একটি সাধারণ স্মৃতির বন্ধন তৈরি করে রেখেছে। পাকিস্তানে ইফতার ও ঈদের টেবিলে এখনও রুহ আফজার গ্লাস দেখা যায়।

শত পানীয়ের ভিড়ে রুহ আফজা কেন এখনও টিকে আছে

আজও দক্ষিণ এশিয়ার বহু পরিবারের কাছে রুহ আফজা রমজান, গরমের দুপুর, অতিথি আপ্যায়ন আর শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের নাম। সময়ের সঙ্গে এর ব্যবহারও বদলেছে। এখন শুধু শরবত হিসেবেই নয়, দুধ, লাচ্ছি, জুস, আইসক্রিম বা নানা ডেজার্টেও ব্যবহার করা হয় রুহ আফজা। তবু এর সবচেয়ে পরিচিত রূপটি রয়ে গেছে এক গ্লাস ঠান্ডা পানিতে মিশিয়ে পরিবেশিত সেই লাল শরবত, যা ইফতারের টেবিলে দেখলেই অনেকের মনে আলাদা এক অনুভূতি জাগে।

বাজারে নতুন নতুন পানীয় এলেও রুহ আফজার জনপ্রিয়তা কমে যায়নি পুরোপুরি। এর পেছনে শুধু স্বাদ নয়, কাজ করেছে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, পারিবারিক অভ্যাস এবং সাংস্কৃতিক উপস্থিতি। উপমহাদেশের ইতিহাস, পারিবারিক রীতি আর ধর্মীয় অনুষঙ্গ—সব মিলিয়ে রুহ আফজা এক ধরনের সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

সেই কারণেই পুরোনো দিল্লির এক ছোট দাওয়াখানায় রোগীদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি হওয়া একটি সিরাপ আজও কোটি মানুষের কাছে গরম ও রমজানের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। তাই এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়েও রুহ আফজা যৌথ স্মৃতি, স্বাদ ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক।

সম্পর্কিত