স্ট্রিম প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার পর বাংলাদেশে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা ও মজুদের প্রবণতা বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় শুক্রবার (৬ মার্চ) জ্বালানি তেল বিক্রিতে দৈনিক সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, জনমনে উদ্বেগ কমানো এবং দেশজুড়ে মজুদ স্থিতিশীল রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কিছু ভোক্তা ও ডিলার অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ করতে শুরু করেন। এতে বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলা চালায়। এর ফলে ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। হামলার পর কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
অন্যদিকে ইরানের ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো রাস তানুরায় তাদের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার বন্ধ করে দেয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করে পূরণ করতে হয়। অপরিশোধিত তেল পুরোপুরি আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে। আর পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। চলমান যুদ্ধ এসব জ্বালানি আমদানির ধারাবাহিকতা নিয়েই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আসে কোন কোন দেশ থেকে, দেশে মজুদ কত, আর বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আমদানি করা জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে অপরিশোধিত তেল হিসেবে। এই তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধন করা হয়। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ আসে আগে থেকেই পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য হিসেবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফার্নেস অয়েল।
অপরিশোধিত তেলের পুরোটা আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রধান উৎস দুটি দেশ—সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টন ‘আরাবিয়ান লাইট’ ক্রুড বাংলাদেশে আসে। এ ছাড়া আমিরাতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি অ্যাডনকের মাধ্যমেও তেল আমদানি করা হয়। এসব তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়েই যেতে হয়।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। সরকার-টু-সরকার চুক্তি এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এই তেল কেনা হয়। প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। সাম্প্রতিক সময়ে বিপিসি যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তেল কিনেছে, তার মধ্যে রয়েছে পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক (চীন), ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান (মালয়েশিয়া), পিটিটি (থাইল্যান্ড), ওকিউ ট্রেডিং (ওমান) এবং এনওসি (ইউএই)।
বিপিসি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার টন লো-সালফার ডিজেল, ১ লাখ ৮৫ হাজার টন জেট এ–১ জ্বালানি, ১ লাখ টন ৯৫ অকটেন পেট্রোল, ১ লাখ ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং ৩০ হাজার টন লো-সালফার মেরিন ফুয়েল থাকবে।
এই জ্বালানি তেল আসবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি থেকে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এনওসি, ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি। এই অংশের আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৮২ মিলিয়ন ডলার।
এর বাইরে ২০২৬ সালে ভারত থেকে অতিরিক্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টন লো-সালফার ডিজেল আমদানি করা হবে। এটি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে আসবে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে করা ১৫ বছর মেয়াদি সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতায় এই সরবরাহ হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলার।
২০২৬ সালের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে পুরো বছরের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মোট আমদানি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে ঘোষিত ১৩ লাখ ৮০ হাজার টনের পরিকল্পনা শুধু বছরের প্রথমার্ধের জন্য। বছরের দ্বিতীয়ার্ধের পরিকল্পনা সাধারণত পরে চূড়ান্ত করা হয়।
অপরদিকে ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেল আমদানির অনুমোদিত পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ টন আসবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাডনক থেকে এবং প্রায় ৮ লাখ টন আসবে সৌদি আরামকোর কাছ থেকে।
বিপিসি জানিয়েছে, মার্চের শুরুতে সৌদি আরামকোর রাস তানুরা থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসার কথা ছিল। কিন্তু রিফাইনারি বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে তেল আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাস তানুরা থেকে বাংলাদেশে তেল আনতে হলে জাহাজগুলোকে প্রথমে পারস্য উপসাগর থেকে বের হয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। বর্তমানে ওই অঞ্চলে সামরিক নজরদারি ও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু থাকায় সমুদ্রপথে চলাচল নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জাহাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পেরোতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তবে গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ইরান জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের জন্য বন্ধ থাকবে। সে হিসেবে বাংলাদেশসহ অন্য দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা নাও পড়তে পারে।
বাংলাদেশ সরাসরি ইরান থেকে অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে না। ফলে বর্তমান সংকটের মূল কারণ ইরান থেকে তেল কেনা নয়। বরং ঝুঁকি তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এ তথ্য জানান বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে যে জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে, তার মধ্যে ডিজেল প্রায় ১৪ দিনের, অকটেন ২৮ দিনের, পেট্রোল ১৫ দিনের, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপিসি ইতিমধ্যে সাতটি জ্বালানিবাহী জাহাজের জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার কাজ শেষ করেছে বলেও জানান তিনি।
বিপিসির মজুদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমান তেলের মজুদ ব্যবহারের হারের ওপর নির্ভর করে ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছেছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ থেকে ইতিমধ্যে তেল খালাস শুরু হয়েছে।
তবে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও তীব্র হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের ঝুঁকি অনেক বেশি। দেশের মোট জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। অন্যদিকে বিশ্বেরও প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক বাজারে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যে প্রতি ব্যারেল ৯২ দশমিক ৬৯ ডলারে উঠেছে এবং তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেছেন, দেশের মোট জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বন্দর থেকে আমদানি করা হয়, যেগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহে এখনই কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই। তবে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।
সরকার, বিপিসি এবং বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান মজুদ কয়েক সপ্তাহের জন্য সুরক্ষা দিতে পারে। তবে একটি অনিশ্চিত অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা এখন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। আপাতত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সম্ভাব্য তেল সংকটের আশঙ্কা আর কল্পনাপ্রসূত নয়।
সরবরাহের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার পর বাংলাদেশে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা ও মজুদের প্রবণতা বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় শুক্রবার (৬ মার্চ) জ্বালানি তেল বিক্রিতে দৈনিক সীমা নির্ধারণ করেছে সরকার।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, জনমনে উদ্বেগ কমানো এবং দেশজুড়ে মজুদ স্থিতিশীল রাখতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কিছু ভোক্তা ও ডিলার অতিরিক্ত তেল কিনে মজুদ করতে শুরু করেন। এতে বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলা চালায়। এর ফলে ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। হামলার পর কাতার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
অন্যদিকে ইরানের ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো রাস তানুরায় তাদের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার বন্ধ করে দেয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করে পূরণ করতে হয়। অপরিশোধিত তেল পুরোপুরি আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে। আর পরিশোধিত জ্বালানি তেল বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। চলমান যুদ্ধ এসব জ্বালানি আমদানির ধারাবাহিকতা নিয়েই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আসে কোন কোন দেশ থেকে, দেশে মজুদ কত, আর বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আমদানি করা জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে অপরিশোধিত তেল হিসেবে। এই তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পরিশোধন করা হয়। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ আসে আগে থেকেই পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য হিসেবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ফার্নেস অয়েল।
অপরিশোধিত তেলের পুরোটা আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রধান উৎস দুটি দেশ—সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টন ‘আরাবিয়ান লাইট’ ক্রুড বাংলাদেশে আসে। এ ছাড়া আমিরাতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি অ্যাডনকের মাধ্যমেও তেল আমদানি করা হয়। এসব তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়েই যেতে হয়।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়। সরকার-টু-সরকার চুক্তি এবং উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এই তেল কেনা হয়। প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। সাম্প্রতিক সময়ে বিপিসি যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তেল কিনেছে, তার মধ্যে রয়েছে পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক (চীন), ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান (মালয়েশিয়া), পিটিটি (থাইল্যান্ড), ওকিউ ট্রেডিং (ওমান) এবং এনওসি (ইউএই)।
বিপিসি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৯০ হাজার টন লো-সালফার ডিজেল, ১ লাখ ৮৫ হাজার টন জেট এ–১ জ্বালানি, ১ লাখ টন ৯৫ অকটেন পেট্রোল, ১ লাখ ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং ৩০ হাজার টন লো-সালফার মেরিন ফুয়েল থাকবে।
এই জ্বালানি তেল আসবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি থেকে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এনওসি, ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং, মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি। এই অংশের আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৮২ মিলিয়ন ডলার।
এর বাইরে ২০২৬ সালে ভারত থেকে অতিরিক্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টন লো-সালফার ডিজেল আমদানি করা হবে। এটি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে আসবে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে করা ১৫ বছর মেয়াদি সরকার-টু-সরকার চুক্তির আওতায় এই সরবরাহ হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১১৯ মিলিয়ন ডলার।
২০২৬ সালের জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে পুরো বছরের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মোট আমদানি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে ঘোষিত ১৩ লাখ ৮০ হাজার টনের পরিকল্পনা শুধু বছরের প্রথমার্ধের জন্য। বছরের দ্বিতীয়ার্ধের পরিকল্পনা সাধারণত পরে চূড়ান্ত করা হয়।
অপরদিকে ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেল আমদানির অনুমোদিত পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ৭ লাখ টন আসবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাডনক থেকে এবং প্রায় ৮ লাখ টন আসবে সৌদি আরামকোর কাছ থেকে।
বিপিসি জানিয়েছে, মার্চের শুরুতে সৌদি আরামকোর রাস তানুরা থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসার কথা ছিল। কিন্তু রিফাইনারি বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে তেল আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাস তানুরা থেকে বাংলাদেশে তেল আনতে হলে জাহাজগুলোকে প্রথমে পারস্য উপসাগর থেকে বের হয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়। বর্তমানে ওই অঞ্চলে সামরিক নজরদারি ও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু থাকায় সমুদ্রপথে চলাচল নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জাহাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পেরোতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
তবে গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ইরান জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের জন্য বন্ধ থাকবে। সে হিসেবে বাংলাদেশসহ অন্য দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা নাও পড়তে পারে।
বাংলাদেশ সরাসরি ইরান থেকে অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে না। ফলে বর্তমান সংকটের মূল কারণ ইরান থেকে তেল কেনা নয়। বরং ঝুঁকি তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এ তথ্য জানান বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে যে জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে, তার মধ্যে ডিজেল প্রায় ১৪ দিনের, অকটেন ২৮ দিনের, পেট্রোল ১৫ দিনের, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিপিসি ইতিমধ্যে সাতটি জ্বালানিবাহী জাহাজের জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার কাজ শেষ করেছে বলেও জানান তিনি।
বিপিসির মজুদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমান তেলের মজুদ ব্যবহারের হারের ওপর নির্ভর করে ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছেছে। এর মধ্যে একটি জাহাজ থেকে ইতিমধ্যে তেল খালাস শুরু হয়েছে।
তবে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও তীব্র হলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের ঝুঁকি অনেক বেশি। দেশের মোট জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। অন্যদিকে বিশ্বেরও প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক বাজারে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যে প্রতি ব্যারেল ৯২ দশমিক ৬৯ ডলারে উঠেছে এবং তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে এবং বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেছেন, দেশের মোট জ্বালানি তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বন্দর থেকে আমদানি করা হয়, যেগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাই সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহে এখনই কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই। তবে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।
সরকার, বিপিসি এবং বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান মজুদ কয়েক সপ্তাহের জন্য সুরক্ষা দিতে পারে। তবে একটি অনিশ্চিত অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশকে ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কীভাবে এগোয়, তা এখন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। আপাতত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সম্ভাব্য তেল সংকটের আশঙ্কা আর কল্পনাপ্রসূত নয়।
সরবরাহের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং দেশীয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

গত রোববার দুবাইয়ে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের একটি ডেটা সেন্টারে আগুন লাগে। ধারণা করা হচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভূপাতিত একটি ইরানি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ সেখানে আঘাত করেছিল। যুদ্ধের কারণে কোনো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা সম্ভবত ইতিহাসে এ
৫ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সর্বশেষ উত্তেজনার অংশ হিসেবেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার বা কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পথে হাঁটছে ইরান। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই জাহাজ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে বাজারগুলো প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে।
১ দিন আগে
নেপালের রাজনীতিতে গত কয়েক মাসে যে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, তা শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়া গণআন্দোলন সেই পরিবর্তনের সূচনা করে।
১ দিন আগে
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে তাকালে সাধারণ মানুষের মনে আজ গভীর প্রশ্ন জাগছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি তবে চলছে?
২ দিন আগে