জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরান-আরব সংঘাত: মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে নতুন শিয়া-সুন্নি যুদ্ধের সূচনা?

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ২০: ০৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের ‘ছায়াযুদ্ধ’ সীমা অতিক্রম করে সরাসরি ও বহুমুখী প্রলয়ংকরী সংঘাতের রূপ নিয়েছে। এর একদিকে ইসরায়েল ও আমেরিকার সাঁড়াশি অভিযান, আর অন্যদিকে ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার মরিয়া লড়াই—এই দুই চরমপন্থার চাপে পড়ে পুরো অঞ্চলের মানচিত্র আজ এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। তবে এবারের যুদ্ধের সবচেয়ে উদ্বেগজনক মোড় হলো সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি এই রণক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়া। তেহরানের সাম্প্রতিক নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আরব বিশ্বকে এক কঠিন সামরিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কুর্দি বিদ্রোহীদের সশস্ত্র করার ‘নতুন চাল’ এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ জাতিগত ফাটল তৈরির চেষ্টা মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধেরই নীল নকশা। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আরব দেশগুলোর সম্ভাব্য পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ কেবল সীমানা রক্ষার লড়াই নয়, ইসরায়েল এবং আমেরিকার প্ররোচনায় একে ‘শিয়া-সুন্নি’ সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। রাজনৈতিক আধিপত্যের এই লড়াইকে যখনই ধর্মীয় বিভাজনের মোড়ক দেয়া হয়, তখন তা কেবল সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আদর্শিক স্থিতিশীলতাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

ইরানের রণকৌশল: ‘সার্বভৌমত্ব বনাম সামরিক বাধ্যবাধকতা’

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উদ্দেশ্যে ইরানের হুঁশিয়ারি মূলত একটি ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধমূলক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোকে মার্কিন সামরিক অংশীদার হতে নিরুৎসাহিত করে নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে চায়। এই নীতির ফলে আরব দেশগুলো দ্বিমুখী চাপে পড়েছে—একদিকে মিত্র হিসেবে মার্কিন ঘাঁটি রক্ষার বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভৌগোলিক সীমানা বা প্রতিবেশীর সার্বভৌমত্বের চেয়ে ‘আক্রমণের উৎসস্থল নির্মূল’ করাই প্রধান সামরিক অগ্রাধিকার।

আরব ভূখণ্ডে হামলার নেপথ্য কারণ

ইরান মূলত একটি শক্তিশালী ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করতে চায় যে, তাদের ভূমি ব্যবহার করে কোনো হামলা হলে তা নিরুত্তাপ থাকবে না। দুবাই, আবুধাবি বা কাতারের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে তেহরান এই কঠোর বার্তা দিচ্ছে যে, মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে প্রশ্রয় দিলে চড়া মূল্য দিতে হবে।

এছাড়া মার্কিন সেনারা যখন ঘাঁটি ছেড়ে বেসামরিক হোটেলে আশ্রয় নিচ্ছে, তখন সেখানে হামলা চালিয়ে ইরান তাদের গভীর গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার নাজুকতাকেই প্রকাশ করছে। এই কৌশলটি হলো আরব দেশগুলোকে এত বেশি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা, যাতে তারা নিজ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহারে বাধা দিতে বাধ্য হয়।

গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রদর্শনী

মার্কিন সেনারা যখন নিরাপত্তার খাতিরে সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে সাধারণ পর্যটন কেন্দ্র বা হোটেলগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইরানের নিখুঁত হামলাগুলো তেহরানের গভীর গোয়েন্দা সক্ষমতার এক শক্তিশালী প্রদর্শনী। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে ইরানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্দরমহল পর্যন্ত অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে বিস্তৃত।

এই হামলাগুলো মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি বার্তা দিচ্ছে যে তারা যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, ইরানের নজরদারি ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী প্রযুক্তির আওতা থেকে তারা মুক্ত নয়। মূলত শত্রুসেনার গতিবিধির প্রতি মুহূর্তের খবর রাখার এই সক্ষমতা আরব দেশগুলোর জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে এক চরম অস্বস্তিকর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক অস্ত্র

দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপে একটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে মার্কিন হামলার জবাব দিতে গিয়ে ইরান গত রোববার বাহরাইনের একটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বর্তমানে তেল ও গ্যাস স্থাপনার পাশাপাশি জীবনরক্ষাকারী ডিস্যালিনেশন বা পানি শোধনাগার প্ল্যান্টগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক যুদ্ধের সূচনা করেছে। মরু-প্রধান আরব দেশগুলোর জন্য পানি ও জ্বালানি হলো অস্তিত্ব রক্ষার মূল চাবিকাঠি, যা ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে তেহরান মূলত পুরো অঞ্চলের জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দেয়ার ছক এঁকেছে। এই কৌশলের মাধ্যমে তারা একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মহাপ্রলয় নামানোর সংকেত দিচ্ছে, অন্যদিকে আরব সরকারগুলোর ওপর অভ্যন্তরীণ জনরোষ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চাপ সৃষ্টি করছে। মূলত জীবনযাত্রার মৌলিক কাঠামোর ওপর এই আঘাত ইরানের এমন এক মরণকামড়, যা আরব দেশগুলোকে যেকোনো মূল্যে যুদ্ধ বন্ধের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিতে বাধ্য করতে পারে।

লেবানন ফ্রন্ট ও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ

পেজার বিস্ফোরণ এবং হাসান নাসরাল্লাহর আকস্মিক মৃত্যুর পর হেজবুল্লাহর সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়ার যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, দক্ষিণ লেবাননের রণাঙ্গন তা নাটকীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি অত্যাধুনিক ‘মার্কাভা’ ট্যাংকের ওপর নিখুঁত অ্যান্টি-ট্যাংক মিসাইল হামলা এবং দুর্ভেদ্য ‘কিল জোন’ তৈরির মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, গেরিলা যুদ্ধে তাদের সক্ষমতা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। তবে এই সামরিক প্রতিরোধের সমান্তরালে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় ধরনের মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে; যেখানে হেজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের মিত্র শিয়া ‘আমাল মুভমেন্ট’ পর্যন্ত এখন ইরানের আঞ্চলিক স্বার্থের পরিবর্তে লেবাননের নিজস্ব সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করাকে বড় করে দেখছে। লেবানন সরকার কর্তৃক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর সামরিক বিধিনিষেধ আরোপের আলোচনা মূলত একটি বৃহত্তর আরবীয় মানসিকতার প্রতিফলন, যা ইঙ্গিত দেয় যে আরব বিশ্ব আর ইরানের ছায়াযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকে বলি দিতে ইচ্ছুক নয়। মূলত হেজবুল্লাহর এই মরণপণ প্রতিরোধ যেমন ইসরায়েলকে ভাবাচ্ছে, তেমনি আরব মিত্রদের দূরত্ব তেহরানের ‘প্রক্সি’ নেটওয়ার্কের জন্য এক চরম অস্তিত্ব সংকটের সংকেত দিচ্ছে। এই বিভাজন লেবাননকে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ইরান-নির্ভরতা বনাম স্বাধীন সার্বভৌমত্বের দ্বন্দ্ব এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর ধৈর্যের বাঁধ: যৌথ সামরিক জোটের পথে?

দীর্ঘদিন কূটনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটলেও, ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বেসামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলোকে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে। ‘সব সীমারেখা অতিক্রম হয়ে গেছে’—কাতারের এই কঠোর হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দেয় যে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC) এখন আত্মরক্ষার তাগিদে ইসরায়েল বা আমেরিকার প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজস্ব একটি শক্তিশালী যৌথ সামরিক জোট গঠনের কথা ভাবছে। সার্বভৌমত্বের ওপর এই নগ্ন আঘাত কেবল রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং আরব দেশগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে একটি সমন্বিত সামরিক ফ্রন্ট খোলার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন

আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়া এবং এর ফলে সাধারণ নাগরিকদের প্রাণহানি আরব দেশগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। পর্যটন ও বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ হিসেবে পরিচিত এই ভূখণ্ডগুলোতে এমন নিরাপত্তাহীনতা দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই হামলার ফলে কেবল জানমালের ক্ষতি হয়নি, বরং আরব দেশগুলোর দীর্ঘদিনের স্থিতিশীল ভাবমূর্তি বিশ্ববাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। আরব সরকারগুলো এখন আর কেবল কূটনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় কঠোর সামরিক ও প্রতিরক্ষামূলক বিকল্প বেছে নেয়ার পথে হাঁটছে।

যৌথ সামরিক জোট

সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমন্বয়ে একটি সম্ভাব্য যৌথ সামরিক জোট গঠন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত বাঁক বদল। ইরানের সরাসরি হুমকির মুখে নিজেদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড রক্ষায় এই দেশগুলো এখন ইসরায়েল বা আমেরিকার ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা বলয় তৈরিতে মনযোগী হচ্ছে। এই জোট বাস্তবায়িত হলে তা কেবল তেহরানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সুন্নি ব্লকের জন্ম দেবে না, বরং কয়েক দশকের মধ্যে এটি হবে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সামরিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ। এই সম্মিলিত শক্তির উত্থান ইরানের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের পথে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দেয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ নতুন ও জটিল সমীকরণে নিয়ে যাবে।

আমেরিকার ‘কুর্দি কার্ড’ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পরিকল্পনা

ইসরায়েল ও আমেরিকা অনুধাবন করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদি বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানো গেলেও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা তেহরানকে সম্পূর্ণ কাবু করা অসম্ভব। তাই পেন্টাগন ও সিআইএ এখন ইরানের অভ্যন্তরীণ জাতিগত ও গোষ্ঠীগত ফাটলগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে দেশটিকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করার কৌশল নিয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার মাধ্যমে ইরানের ভেতরে একটি প্রচ্ছন্ন গৃহযুদ্ধ বা অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।

কুর্দি বিদ্রোহীদের ব্যবহার

ওয়াশিংটন বর্তমানে কৌশলগতভাবে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিদ্রোহী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন: KDPI) অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তেহরানের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ‘প্রক্সি’ ফ্রন্ট গড়ে তুলছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ইরানের শক্তিশালী নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীকে (আইআরজিসি) সীমান্ত সংঘর্ষে ব্যস্ত রাখা, যাতে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সময় রাজধানী তেহরানের নিরাপত্তা বলয় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সীমান্তের এই অস্থিরতা ইরানকে এক কঠিন সামরিক উভয়সংকটে ফেলছে, যেখানে তাদের একই সাথে বাইরের আগ্রাসন ও ভেতরের সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কুর্দিদের এই সশস্ত্র উত্থানকে ব্যবহার করে ইরানকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং সামরিকভাবে বিভক্ত করে দেওয়াই সিআইএ-র এই নতুন রণকৌশলের মূল ভিত্তি।

গণ-অভ্যুত্থানের উসকানি

কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে সশস্ত্র তৎপরতা বৃদ্ধি করার মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সাধারণ জনগণের মধ্যে বিরাজমান অসন্তোষকে একটি দেশব্যাপী ‘গণ-অভ্যুত্থানে’ রূপান্তর করা। সীমান্তবর্তী সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলাকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রধান শহরগুলোতে সরকারবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া এবং শাসকগোষ্ঠীকে ভেতর থেকে নাস্তানাবুদ করাই ওয়াশিংটনের এই কৌশলের প্রধান উদ্দেশ্য। সিআইএ-র এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, সশস্ত্র বিদ্রোহ ও নিরস্ত্র গণ-অভ্যুত্থানের সমন্বয়ে এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা হবে, যেখানে তেহরানের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। মূলত এটি কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং ইরানের শাসনব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে করে দিতে জাতিগত বিভাজনকে চূড়ান্ত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এক সুগভীর রাজনৈতিক চাল।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব: শিয়া-সুন্নি যুদ্ধের শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী সংঘাত যদি শেষ পর্যন্ত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা কেবল ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সুন্নি প্রধান আরব দেশগুলো এবং শিয়া প্রধান ইরান সরাসরি সম্মুখ সমরে লিপ্ত হলে তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক নজিরবিহীন ও চরম সাম্প্রদায়িক বিভক্তি উসকে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে ইসরায়েল বা মার্কিনী প্ররোচনায় এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে যখনই ‘ধর্মীয় যুদ্ধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, তখন এটি কয়েক দশকের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে কয়েক প্রজন্মব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার সূচনা করতে পারে। সেরকম কিছু হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের কৌশলগত বিজয়

মধ্যপ্রাচ্যের এই ঘনীভূত সংকট যদি শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ শিয়া-সুন্নি যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা হবে ইসরায়েল ও আমেরিকার জন্য কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয়। মুসলিম বিশ্ব যখন নিজেদের মধ্যে ভাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে লিপ্ত থাকবে, তখন ইসরায়েলের ওপর থেকে আঞ্চলিক সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ অনেকটাই প্রশমিত হয়ে যাবে। এই পরিকল্পিত বিভাজন কেবল আরব দেশগুলোর সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করবে না, বরং ফিলিস্তিন ও লেবানন ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের একক কণ্ঠস্বরকেও স্তব্ধ করে দেবে। নিজের শত্রুদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত রাখা এবং সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগে নিজের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখাই হলো এই পশ্চিমা ও ইসরায়েলি প্রক্সিকৌশলের মূল ভিত্তি। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র এমন এক মেরুকরণে বিভক্ত হবে, যেখানে ইসরায়েল কোনো বড় সামরিক ক্ষয়-ক্ষতি ছাড়াই অঞ্চলের প্রধান শক্তিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

তুরস্ক ও পাকিস্তানের উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কুর্দি বিদ্রোহীদের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত করার বিষয়টি আঙ্কারাকে চরম ক্ষুব্ধ করবে, কারণ তুরস্ক একে তাদের নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী হুমকি ও কুর্দিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা ও জাতিগত অস্থিরতা সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানের অশান্ত বালুচিস্তান প্রদেশেও সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদকে নতুন করে উসকে দেয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি করছে। তেহরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে বালুচ যোদ্ধাদের আন্তঃসীমান্ত তৎপরতা ইসলামাবাদকে এক কঠিন সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে, যা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ধূলিসাৎ করতে পারে। এই পরিকল্পিত বিদ্রোহ কেবল ইরানকে দুর্বল করবে না, বরং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে এক বহুমুখী সংঘাতের আবর্তে টেনে আনবে। এরফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের লেলিহান শিখা সমগ্র দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়াকে এক অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত করবে।

মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনৈতিক আধিপত্যের এই উন্মত্ত লড়াইকে ‘শিয়া-সুন্নি’ ধর্মীয় সংঘাতের মোড়ক দেয়া হলে কয়েক দশকের তিল তিল করে গড়া উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা মুহূর্তেই ছাই হয়ে যাবে। ইরান যদি তার অস্তিত্ব রক্ষায় গালফ দেশগুলোর জীবনরেখা তথা পানি ও তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার মরণকামড় দেয়, তবে আরব বিশ্ব বাধ্য হয়েই ইসরায়েল-আমেরিকা অক্ষের সাথে মিলে এক চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী যুদ্ধে লিপ্ত হবে।

এই সর্বাত্মক যুদ্ধে দিনশেষে কোনো পক্ষই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে না; রণক্ষেত্রজুড়ে পড়ে থাকবে কেবল সভ্যতা ও অর্থনীতির বিশাল এক ধ্বংসস্তূপ। সিআইএ-র ‘কুর্দি কার্ড’ কিংবা তেহরানের ‘ডিটারেন্স’ কৌশল—সবই এই অঞ্চলকে এক অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকুণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা নেভানোর সক্ষমতা কারো নেই। যদি চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা অলৌকিকভাবে সফল না হয়, তবে এই ২০২৬ সালটি ইতিহাসের পাতায় মধ্যপ্রাচ্যের চূড়ান্ত পতনের বছর হিসেবে চিরস্থায়ীভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বর্তমানের এই নীরবতা মূলত এক মহাপ্রলয়ের পূর্বাভাস, যেখানে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার আগুনে পুড়বে আরব ও পারস্যের গৌরবময় ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত এই কৃত্রিম সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ কেবল বহিঃশক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকেই চরিতার্থ করবে, বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্য হারাবে তার সার্বভৌমত্ব এবং আগামী কয়েক প্রজন্মের নিরাপত্তা।

সম্পর্কিত