leadT1ad

সিএনএনের বিশ্লেষণ

চুক্তিতে ইরানের কাছ থেকে বড় ছাড় আদায়ে কতটা সক্ষম ট্রাম্প

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রাথমিক এই চুক্তিতে ইরানের কাছ থেকে কতটা ছাড় আদায় করতে পারবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে প্রথমেই কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হচ্ছে না। দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করবে দুই দেশ। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ হলেও পরবর্তী ধাপগুলো হবে আরও কঠিন।

অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে হরমুজ প্রণালিতে খুলে দেওয়া এবং এর আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের মতো তুলনামূলক সহজ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কঠিন বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা ও একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের কথাও রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ইরান বেশ কিছু বড় ধরনের ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানি গণমাধ্যম সম্ভাব্য চুক্তির ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। শুক্রবার ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো এমন একটি সম্ভাব্য চুক্তির তথ্য প্রকাশ করে, যেখানে তেহরানের অবস্থান সুবিধাজনক বলে মনে করা হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, তাঁদের সঙ্গে সৎ বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।

সবচেয়ে বড় ইস্যু পারমাণবিক কর্মসূচি

সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অংশ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।

ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে, ইরান তাঁর পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিতে সম্মত হয়েছে। তবে বাস্তবে এটি কীভাবে কার্যকর হবে এবং ভবিষ্যতে তা কীভাবে যাচাই করা হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নতুন একটি ‘পরিদর্শন ব্যবস্থা’র কথা উল্লেখ করলেও এর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে, ইরান কি পুরো পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করবে, নাকি শুধু নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দেবে। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পারমাণবিক স্থাপনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি নেই।

তবে মূল বিষয় হচ্ছে, ইরান চুক্তি মেনে চলছে কিনা, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে আরও একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তাঁকে দেখাতে হবে, এই চুক্তি কীভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়কার পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে ভালো। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে সেই চুক্তিকে দুর্বল বলে সমালোচনা করে আসছেন।

একই সঙ্গে রিপাবলিকান পার্টির অনেক ইরানবিরোধী নেতা মনে করেন, তেহরানকে কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা যায় না। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যও সেই সংশয়কে আরও জোরালো করেছে।

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে জটিলতা

ইরানের হাতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ইরানকে এসব ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর তা মাটির অনেক গভীরে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের দখলে নিতে পারবে না। তিনি এমনও বলেছেন, হয়তো যুক্তরাষ্ট্র শুধু সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে নজরদারির ব্যবস্থা করবে।

এ ছাড়া ইউরেনিয়ামকে কম সমৃদ্ধ করার একটি বিকল্প নিয়েও আলোচনা হচ্ছে, যেন তা আর অস্ত্র তৈরির উপযোগী না থেকে জ্বালানি হিসেবে ইরানের কাছেই থাকে।

শুক্রবার এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির আওতায় ইউরেনিয়াম ধ্বংস করে পরে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

অবরুদ্ধ সম্পদ নিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি

ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করার প্রশ্নে ট্রাম্পের অতীতের অবস্থান তাঁর জন্য বিব্রতকর হতে পারে।

২০১৬ সালে তিনি ও তাঁর রিপাবলিকান সহযোগীরা ওবামা প্রশাসনের ইরানের সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে ৪০ কোটি ডলার নগদ অর্থ ছাড় নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন।

বর্তমানে ইরান প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে। এপ্রিল মাসে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় এলে ট্রাম্প বলেছিলেন, কোনোভাবেই অর্থ হাতবদল হবে না।

তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রশাসন ‘নগদ অর্থ দেওয়া’ এবং ‘অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা’—এই দুই বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করার চেষ্টা করছে।

হরমুজ প্রণালি ও নতুন বাস্তবতা

আলোচনায় হরমুজ প্রণালি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে।

যুদ্ধের ফলে ইরান দেখিয়েছে, তারা চাইলে কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

প্রশ্ন হলো, চুক্তিতে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতে ইরানের এমন সক্ষমতা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়েও কোনো ব্যবস্থা থাকবে কি না।

যদি এই প্রশ্নের উত্তর না থাকে এবং চুক্তির বাকি অংশ ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তির মতো হয়, তাহলে সমালোচকদের জন্য এটিকে আরও দুর্বল চুক্তি হিসেবে তুলে ধরা সহজ হবে।

প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধের প্রশ্ন

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছিল, তাদের অন্যতম লক্ষ্য হলো ইরানকে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন থেকে বিরত রাখা।

দুই মাস আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান তাঁর সব দাবি মেনে নিয়েছে এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করতেও সম্মত হয়েছে।

তবে পরবর্তীতে বিষয়টি আলোচনা থেকে অনেকটা হারিয়ে যায়।

শুক্রবার এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ইরান সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ কী এবং এটি কীভাবে যাচাই করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত