জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

ইরান থেকে কী শিক্ষা নিলেন কিম, পরমাণু অস্ত্রই কি টিকে থাকার একমাত্র পথ?

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কিম জং-উন উত্তর কোরিয়ার একটি অজ্ঞাত স্থানে ডেস্ট্রয়ার চো হিওনে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ পরিদর্শন করছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

গত সপ্তাহে একটি নৌ-বিধ্বংসী জাহাজ (ডেস্ট্রয়ার) থেকে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। এরপর দেশটির নেতা কিম জং উন যে মন্তব্য করেছেন, তা একইসঙ্গে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। কিম বলেছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা প্রমাণ করে, যুদ্ধজাহাজগুলোকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার কাজ ‘সন্তোষজনকভাবে’ এগোচ্ছে।

তবে উত্তর কোরিয়ার এই পরীক্ষা এবং কিমের উচ্ছ্বসিত মন্তব্য শুধু ৫ হাজার টনের ডেস্ট্রয়ার ‘চো হিয়ন’-এর ডেকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এর বার্তা আরও সুদূরপ্রসারী। কিম যখন পরমাণু অস্ত্রের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলছিলেন, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালাচ্ছিল। হামলার পেছনে যুক্তি হিসেব ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘ইরান আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরমাণু শক্তিধর দেশে পরিণত হবে।’ যদিও তাঁর এই দাবির পেছনে কোনো প্রমাণ নেই।

ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের দীর্ঘদিনের খামেনি শাসনও হুমকির মুখে পড়েছে। এমন বাস্তবতা উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডার গড়ে তোলার দিকে আরও মনযোগী করে তুলেছে। ১৯৪৮ সালে কিম জং উনের দাদা উত্তর কোরিয়া শাসন করতে শুরু করেন, যা এখনো বংশ পরম্পরায় চলছে। এই রাজবংশের কাছে পরমাণু কর্মসূচি তাই শুধু সামরিক শক্তি নয়, বরং টিকে থাকার বা ‘রেজিম সরভাইভালের’ একমাত্র পথ।

দাউজিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা সং সেওং-জং বলেন, ‘কিম নিশ্চয়ই ভাবছেন, পরমাণু অস্ত্র নেই বলেই ইরান আজ এভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।’

জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাপ রয়েছে উত্তর কোরিয়ার ওপর। তা সত্ত্বেও কি জং উন গত কয়েক বছরে তাদের পরমাণু কর্মসূচি বেগবান করেছেন। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ং ইতিমধ্যে প্রায় ৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করেছে এবং আরও ৪০টি তৈরির মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তাদের হাতে রয়েছে।

এখন একটি বিষয় নিশ্চিত, কিম জং উন পরমাণু শক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে জোট গড়ে তুলছেন, যাতে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আর এর মাধ্যমেই তিনি সম্ভবত ইরাক, লিবিয়া এবং বর্তমানে ভেনেজুয়েলা বা ইরানের শাসকদের মতো করুণ পরিণতি এড়াতে পেরেছেন।

ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা ওয়াশিংটনের ‘আধিপত্যবাদী ও গুন্ডাসূলভ’ আচরণের নিন্দা জানিয়েছে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, তারা সরাসরি ট্রাম্পের নাম উচ্চারণ করেনি। এর অর্থ হলো, আলোচনার পথ এখনো খোলা রয়েছে। তবে শর্ত একটাই—ওয়াশিংটনকে মেনে নিতে হবে যে উত্তর কোরিয়া একটি ‘বৈধ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র’।

গত মাসে নিজ দলের কংগ্রেসে কিম বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর কোরিয়ার বর্তমান অবস্থানকে (পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে) সম্মান করে সংঘাতের নীতি পরিহার করে, তবে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে কোনো বাধা নেই।’

তবে বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত সিডনি সাইলার মনে করেন, ট্রাম্পের সামরিক শক্তি ব্যবহারের এই প্রবণতা কিমকে আরও ভীত ও সতর্ক করে তুলবে। ফলে তিনি তড়িঘড়ি করে কোনো চুক্তিতে আসতে চাইবেন না। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, কিম তাঁর শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথিত ব্যক্তিগত সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারেন।

চলতি মাসের শেষে ট্রাম্প চীন সফরে যাবেন। ওই সময়ে কিমের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। কিম জানেন, যদি সেই বৈঠক হয়, তবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দরকষাকষি করবেন। কারণ ইরানের নেতারা এখন চড়া মূল্য দিয়ে যা উপলব্ধি করছে তা হলো, নিরাপত্তার সত্যিকার পথ শধু পরমাণু অস্ত্র অর্জনের ‘আকাঙ্ক্ষা’ নয়, বরং তা ‘অধিকার’।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী মাকতাবার পান্থ

সম্পর্কিত