হিজবুল্লাহর আপত্তি সত্ত্বেও ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি, শান্তি কতদূর

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি সই, শান্তি কি আসবে। প্রতীকী ছবি

চার দিনের ম্যারাথন আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়েছে। শনিবার (২৭ জুন) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর উপস্থিতিতে এই চুক্তিতে সই করেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্সেলর ড্যানিয়েল হোলার, ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার এবং লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ।

গত ২ মার্চ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করেছে। ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ৪ হাজার ১৯২ জনেরও বেশি লেবাননির প্রাণহানি ঘটেছে।

চুক্তির শর্তাবলি

প্রকাশ করা চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করার সাপেক্ষে লেবাননের সেনাবাহিনী পুরো দেশের ওপর কর্তৃত্ব পাবে। তবে চুক্তিতে লেবাননের ভূমি থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহারের কোনো শর্ত রাখা হয়নি। এর পরিবর্তে, ইসরায়েল ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করবে এবং প্রাথমিকভাবে দুটি ‘পাইলট জোন’ বা পরীক্ষামূলক এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানান, এই জোনগুলোর একটি লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং অন্যটি লিতানি নদীর উত্তরে হবে। তিনি জানান, হিজবুল্লাহ পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত এবং ইসরায়েলের ওপর হুমকি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এই বাফার জোনে অবস্থান করবেন।

অন্যদিকে, লেবানন সরকার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে জানিয়েছে, তারা দেশের অভ্যন্তরে সরকারি কর্তৃত্বের বাইরে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বলপ্রয়োগের নীতিকে সমর্থন করবে না।

হিজবুল্লাহর অনড় অবস্থান ও গণবিক্ষোভ

এই চুক্তির আলোচনার টেবিলে হিজবুল্লাহর কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। ফলে স্বাক্ষরের পরেই হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এই চুক্তিকে ‘অপমানজনক ও অবৈধ’ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের বিষয়কে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রস্তাব।

তিনি এই চুক্তির পরিবর্তে গত ১৫ জুন স্বাক্ষরিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন সমর্থনে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গেলে লেবানন গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে।

চুক্তির প্রতিবাদে ইতিমধ্যে বৈরুতের রাস্তায় নেমে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছেন হিজবুল্লাহ সমর্থকরা।

ইসলামাবাদ সমঝোতার সঙ্গে বৈপরীত্য

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নতুন চুক্তির সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘সমঝোতা স্মারকে’র সরাসরি বৈপরীত্য রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় কোনো শর্ত ছাড়াই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এই নতুন চুক্তিতে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসাবে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ যুক্ত হয়েছে।

ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ অভিযোগ করেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইসরায়েলকে অবরুদ্ধ এলাকায় অবস্থান করার এবং যুদ্ধবিরতির প্রথম শর্ত লঙ্ঘন করার সুযোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে এই অমীমাংসিত সংকটের মাঝেই শনিবার লেবাননের নাবাতিহ আল-ফাওকা এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

বিশ্লেষকদের মতামত

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো তাহানি মুস্তফা আল জাজিরাকে বলেন, ‘হিজবুল্লাহর এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে এই অজুহাতে পুরো শান্তি প্রক্রিয়াই নষ্ট করার পরিকল্পনা করেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।’

সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিনকাসও এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করে বলেন, চুক্তি মূলত ইসরায়েল, লেবানন ও আমেরিকার মধ্যে হয়েছে, কিন্তু আসল পক্ষ হিজবুল্লাহ এখানে অনুপস্থিত।

আল জাজিরার সাংবাদিক আলী হাশেম বলেছেন, হিজবুল্লাহর সম্মতি ছাড়া এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। লেবাননের বর্তমান সরকার, মাঠপর্যায়ে হিজবুল্লাহর ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পরিবর্তে আরেকটি সংঘাতের পথ তৈরি করছে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

Ad 300x250

সম্পর্কিত