‘গতকালও সব সুন্দর ছিল, আজ ভেসে গেছে’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ২২: ১৫
সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

নেপালের নুওয়াকোট জেলার ত্রিশূলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অন্য দিনের মতোই ক্লাস চলছিল। হঠাৎ শিক্ষকদের চিৎকার শুনতে পায় একাদশ শ্রেণির ছাত্র জ্ঞান দীপ সাপকোটা।

জ্ঞান দীপ জানায়, ‘শিক্ষকরা আমাদের দ্রুত বিদ্যালয় ছাড়তে বলেন। আমাদের কয়েকজন একটি পুরোনো সেতু পেরিয়ে নিরাপদ জায়গায় যাই। অধিকাংশ শিক্ষার্থী পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। আতঙ্কে কয়েকজন শিক্ষার্থী জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।’

বুধবার (২৬ আগস্ট) জেলার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুর এলাকায় বন্যা ও ভূমিধস আঘাত হানে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে নেপাল পুলিশ। এছাড়া তিব্বত সীমান্তে ৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে চীনা সংবাদমাধ্যম।

নেপালে আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদগুলোতে চলছে উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত।
নেপালে আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত জনপদগুলোতে চলছে উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত।

দুর্গম এলাকায় এখনো প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ৭০০ জনই বিদেশি পর্যটক, যাঁদের বড় অংশ ভারতীয় নাগরিক। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউক্রেনের নাগরিকরাও রয়েছেন। তবে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চিত করেছে, এই দুর্যোগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাহাকার

কাঠমান্ডুর ট্রমা সেন্টারে স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছেন রাজন নেপালি। তিনি জানান, ‘আমার ভগ্নিপতি রসুয়া জেলায় পর্যটকদের সঙ্গে ছিলেন। সকাল আটটা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা কোথায় যাব, কী করব বুঝতে পারছি না।’

নেপালে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহতা ছাপ ফুটে উঠছে নদীর কাছাকাছি আবাসনগুলোতে। ছবি: সংগৃহীত।
নেপালে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহতা ছাপ ফুটে উঠছে নদীর কাছাকাছি আবাসনগুলোতে। ছবি: সংগৃহীত।

আপার ত্রিশূলি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রকৌশলী জনক রাজ বোহোরা ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ। পশ্চিম নেপালের বাঝাং থেকে তাঁর স্ত্রী শর্মিলী ভান্ডারি জানান, সকালে কাজে যাওয়ার পর থেকে স্বামীর আর কোনো খোঁজ মিলছে না।

একই প্রকল্পের কর্মী দীপেশ ঢাকালও নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর বন্ধু বিষ্ণু অধিকারী জানান, বিপদের সংকেত বাজার পর অনেকেই নিরাপদে সরে যেতে পেরেছিলেন। দীপেশ সময়মতো সরতে পেরেছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ভূমিকম্পের মতো তীব্র স্রোত

বন্যার পানির ধাক্কা এত তীব্র ছিল যে ভূকম্পনবিদরা প্রথমে একে ভূমিকম্প মনে করেছিলেন। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন।

নুওয়াকোট জেলার বাসিন্দা কল্পনা মল্ল জানান, চোখের সামনে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভেসে গেছেন। কল্পনার বাবা, মা, বোন ও বোনের সন্তানরা বন্যার তোড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। কল্পনা বলেন, ‘বাঁচার কোনো সুযোগই ছিল না। বন্যার পানি সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি ও আমার ছেলে কোনোমতে ছাদের ওপর উঠে জীবন বাঁচিয়েছি।’

tibbet flood

তাঁর ছেলে সুগম মল্ল জানান, মাকে হাত ধরে টেনে ছাদে তুলতে পেরেছিলেন তিনি। তাঁর বোনের ফোন এখনো বন্ধ রয়েছে।

গোমা পণ্ডিত নামের এক নারী জানান, তাঁর গরু-মহিষ ও ফসলি জমি সব তলিয়ে গেছে। ঘরে রাখা ধান ও সরিষার মজুত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

কাঠমান্ডুর টিইউ টিচিং হাসপাতালে নিখোঁজ স্বজনদের জন্য মানুষ ভিড় করছেন। রাম কুমারী শ্রেষ্ঠা ফোনে স্বামীর ছবি দেখিয়ে জানান, গাড়ি চালানোর কাজের জন্য তাঁর স্বামী রসুয়া গিয়েছিলেন। সকাল থেকে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

ট্রেকিং গাইড সোনাম দর্জি জানান, তাঁর বাড়ি রসিওয়া স্যাফ্রু গ্রামে। সকালে গ্রাম ছেড়ে বের হওয়ার এক ঘণ্টা পর বন্যার গর্জন শুনতে পান তিনি। দর্জি বলেন, ‘শব্দটা একদম ভূমিকম্পের মতো ছিল। আমার বাড়ি ভেঙে পড়েছে। বোন দেচেন তামাং ও তাঁর পরিবার নিখোঁজ রয়েছে।’

তিনি জানান, বহু মানুষ এখন গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের জন্য খাবার, অস্থায়ী আশ্রয় ও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দ্রুত প্রয়োজন।

সবকিছু ভেসে গেছে

নুওয়াকোট জেলার বেত্রাবতী শহরের স্বাস্থ্যকর্মী রাজেন্দ্র পৌডেল বলেন, ‘আজ সকাল পর্যন্ত এই এলাকা সুন্দর ছিল। এখানে সুন্দর ঘরবাড়ি ও ফলের বাগান ছিল। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিল। সবকিছু এক নিমেষে ভেসে গেছে। এখানে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’

নুওয়াকোটের আরেক বাসিন্দা লাল বাহাদুর রাই জানান, বন্যার পানি তাঁর বাড়ির ১০ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘নদীর ওপারে গ্রামের অনেক বাড়ি ও একটি স্কুল ভেসে গেছে। আমার বাড়ি অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। এলাকার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কফি বাগান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।’

নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিবৃতিতে জানিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগকারী ১৯টি যানবাহন চলাচলের সেতু এবং ৪৩ কিলোমিটার মহাসড়ক বন্যায় ভেসে গেছে।

রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা ও চিতওয়ান জেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে দূরে থাকতে নাগরিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ সামাজিক মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। দেশজুড়ে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে যুবসমাজ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা এবং রয়টার্স

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত