যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ঝুঁকি এড়াতে ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমিয়ে আনার পাশাপাশি এর কিছু অংশ বিদেশে রপ্তানির প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে তেহরান। বিনিময়ে তারা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পরমাণু আলোচনা হতে পারে। ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের (এইচইইউ) কিছু অংশ বিদেশে রপ্তানি এবং বাকি অংশ ‘ডাইলুট’ বা লঘু করে এর বিশুদ্ধতা কমানোর প্রস্তাব বিবেচনা করছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে ইরানের কাছে ৪৪০ কেজির বেশি ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করুক। অন্যদিকে, ইরান চাইছে তাদের ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ’-এর অধিকার স্বীকৃত হোক। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তেল ও খনিজ সম্পদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ কখনোই বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে না; তবে অর্থনৈতিক প্যাকেজের অংশ হিসেবে মার্কিন কোম্পানিগুলো ইরানের তেল ও গ্যাস খাতে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতে পারবে।
এদিকে সাবেক এক সিআইএ কর্মকর্তা জন কিরিয়াকু দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছে এবং তা আগামী সপ্তাহের শুরুতেই হতে পারে। মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানান, এত বিশাল সামরিক চাপের পরেও ইরান কেন আত্মসমর্পণ করছে না, তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাদের হাতে বিকল্প থাকলেও তারা কেন নতি স্বীকার করছে না।’
এর জবাবে ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়েছে। আক্রান্ত হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানবে। ইরানি সেনাবাহিনীর গ্রাউন্ড ফোর্সের কমান্ডার আমির জাহানশাহি জানিয়েছেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের গতিবিধি কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে পরমাণু আলোচনার মধ্যেই ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নতুন মোড় নিয়েছে। রোববার তেহরানের বেহেশতি ও শরিফ ইউনিভার্সিটি এবং মাশহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। ইরান ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নিহতদের ৪০তম দিনের স্মরণসভায় শিক্ষার্থীরা ‘এটিই শেষ লড়াই, পাহলভি ফিরে আসবে’ এবং ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু চাই’ স্লোগান দিয়েছেন। তেহরানের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ নিশ্চিত করেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের ক্ষমতাচ্যুত রাজপরিবারের সন্তান রেজা পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে নির্বাসিত রেজা পাহলভির সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের এই যোগাযোগ ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের মার্কিন ইচ্ছারই ইঙ্গিত বহন করে। মার্কিন সিনেটর ডেভ ম্যাককরমিকও মন্তব্য করেছেন, ইরানি জনগণ স্বাধীনতার অধিকার রাখে এবং তিনি ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের নীতিকে সমর্থন করেন।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গেও ইরানের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। ইইউ ইরানের রিভোলিউশনারি গার্ডকে (আইআরজিসি) ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জেরে পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে তেহরান। রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইইউ সদস্য দেশগুলোর নৌ ও বিমান বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ইইউ-এর পদক্ষেপ জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে করা হচ্ছে, মার্চ মাসের প্রস্তাবিত আলোচনা ব্যর্থ হলে এই অঞ্চল বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।