ইরানের ১০ লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, পাল্টা জবাব তেহরানের

অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্থগিতের হুঁশিয়ারি আইআরজিসির

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ১০: ১৪
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ ও নৌকা। ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার জেরে শনিবার রাতে ইরানের ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে তেহরান। একই সঙ্গে মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে অন্তর্বর্তী সমঝোতা (এমওইউ) স্থগিতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার ভোরে পানামার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজে ইরানি ড্রোন হামলার পর এ অভিযান চালানো হয়। হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় ইরানের নজরদারি, যোগাযোগ, আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন সংরক্ষণ এবং সমুদ্রে মাইন পাতা–সংক্রান্ত স্থাপনাসহ ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুদ্ধবিমান থেকে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা অভিযান শেষ হওয়ার কথা জানালেও ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, রোববার ভোরেও দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

হামলার পর আইআরজিসি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সমঝোতার পঞ্চম ধারা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইরানের। তাই এখন থেকে ইরানের নির্দেশনা অমান্যকারী জাহাজের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাহিনীটি আরও বলেছে, হামলা অব্যাহত থাকলে সমঝোতা বাস্তবায়ন ও চলমান আলোচনা পুরোপুরি স্থগিত হয়ে যাবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তার জবাব ‘চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার মতো’ হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি মেনে চলার সুযোগ ইরানকে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা করেনি। ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান আরও জোরদার করবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবি, ওয়াশিংটন সমঝোতা মেনে চলছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তার দায় ইরানের।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা মার্কিন-সংশ্লিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহর জানিয়েছে, সিরিক বন্দর স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং সেখানে কোনো অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। একই সঙ্গে পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্দেশনা অমান্য করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মার্কিন এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বাহরাইন, কুয়েতসহ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের দিকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। তবে এসব হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন সেনা হতাহত বা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে কুয়েতের আলি আল-সালেম ঘাঁটি এবং বাহরাইনের রাজধানী মানামায় মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে সফল হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।

ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের। সে কারণে ইরানের নির্দেশনা অমান্য করে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তেহরানের ভাষ্য, এখন অনেক জাহাজই প্রণালি অতিক্রমের আগে ইরানের অনুমতি নিচ্ছে।

শনিবারের হামলার আগে বৃহস্পতিবারও একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে আবারও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য তদারকি সংস্থা (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, শনিবার হামলার শিকার তেলবাহী জাহাজটির ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সব নাবিক নিরাপদ আছেন। এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক নৌ-জোট পরিচালিত জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়েছে।

প্রায় চার মাস ধরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত ছিল। গত দুই সপ্তাহে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। এতে তেলের দামও যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থার কাছাকাছি নেমে আসে। তবে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় সেই পরিস্থিতি আবার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ইরানের অভিযোগ, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। তেহরানের মতে, এটিও অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘনের শামিল।

এদিকে লেবাননেও উত্তেজনা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি একে ‘আত্মসমর্পণের চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি তাদের কাছে বাতিল।

শনিবার দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলার খবর দিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের বাহিনীর জন্য হুমকি হয়ে ওঠা এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেই হামলাটি চালানো হয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও আল জাজিরা

Ad 300x250

সম্পর্কিত