চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের রোডম্যাপে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

সুইজারল্যান্ডে প্রথম দফা আলোচনা শেষ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১০: ৩১
বৈঠকে করমর্দনরত ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ও পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। পেছনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ছবি : রয়টার্স

সুইজারল্যান্ডে টানা ১২ ঘণ্টার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনার প্রথম দফা শেষ হলো।

এ সময় দুই দেশ পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং লেবানন সংঘাত নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে একাধিক যৌথ ব্যবস্থাও গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে রোববার (২১ জুন) শুরু হওয়া বৈঠক একটানা ১২ ঘণ্টা চলে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অংশ নেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি।

আলোচনা শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার জানায়, বৈঠক ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ভিত্তিতে পুরো মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে সব পক্ষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা হবে। লেবাননে সামরিক তৎপরতা বন্ধ রাখা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ। এ ছাড়া আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে সপ্তাহজুড়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডে শান্তি আলোচনার শুরু থেকেই উত্তেজনা ছিল। বৈঠক শুরুর ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, তারা আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করলে ‘দেশই থাকবে না’। একই সঙ্গে তিনি ইরানের মিত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে না আনলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার হুমকিও দেন।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের দাবি, ট্রাম্পের ওই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ইরানি প্রতিনিধিরা আলোচনা কক্ষে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানান। পরে পাকিস্তান ও কাতারের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কূটনীতিক রয়টার্স জানিয়েছেন, ইরানি প্রতিনিধিরা বৈঠক ছাড়েননি, তারা রাতভর আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।

বৈঠক সূত্রে রয়টার্স জানিয়েছে, পারমাণবিক ইস্যুতে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু করার আগে সমঝোতা স্মারকের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দিয়েছে ইরান। এর মধ্যে রয়েছে জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

আলোচনা শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেন, ইরান তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড়, কিছু জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা এবং দেশটির পুনর্গঠন ও উন্নয়ন কর্মসূচি চালুর বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও কাতারের নিরলস মধ্যস্থতায় লেবানন যুদ্ধ অবসানের পথেও ‘বড় অগ্রগতি’ হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, চূড়ান্ত আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় ধারাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তেল বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে ‘ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পর্যায়ের আলোচনার কাজ শেষ হয়েছে, এখন থেকে কারিগরি দলগুলো বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, লেবানন, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, লেবাননের সহিংসতা বন্ধের বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং এমন আলোচনা সব সময়ই কিছুটা জটিল হয়ে থাকে।

তবে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দেশদুটির মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে। লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়ায় সপ্তাহান্তে আবারও প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রোববার প্রণালিটি দিয়ে মাত্র পাঁচটি জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে আগের দিন সংখ্যা ছিল ২৬টি।

আলোচনায় অগ্রগতির খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও কমতে শুরু করেছে। কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল। ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতেই গত সপ্তাহের সমঝোতা স্মারকে সম্মতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির তুলনায় এবারের আলোচনা ভিন্ন, কারণ এতে পাকিস্তান ও কাতারের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো সরাসরি মধ্যস্থতা করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাস, লেবানন সংঘাত এবং নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত