leadT1ad

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নয়া সমীকরণ: ঐতিহাসিক অবিশ্বাস থেকে আস্থার সন্ধানে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ২৯
গ্রাফিক: তুফায়েল আহমদ

রাজনীতির দৃশ্যপটে প্রায়ই নতুন মোড় আসে, কখনো নিঃশব্দে, কখনো সশব্দে। ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কটাও ঠিক তেমনই এক বাঁকবদলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গত ৩১ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে তারেক রহমানের যে বৈঠক হয়েছে, তা কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মোড়কে ঢাকা কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। সেখানে ছিল দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, জমাট বাঁধা ক্ষোভ ও বর্তমান বাস্তবতার সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা। ভারতের চোখে একসময়ের 'পাকিস্তানপন্থী' ও 'ভারতবিরোধী' বলে চিহ্নিত তারেক রহমানের হাতেই মোদির চিঠি পৌঁছে দেওয়া হলো।

খালেদা জিয়ার জানাজাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা জড়ো হয়েছিলেন, তবে সবার দৃষ্টি ছিল জয়শঙ্করের ওপর। কালো পোশাকে মোড়ানো জয়শঙ্কর যখন শোকবার্তা ও মোদির চিঠি তুলে দেন তারেক রহমানের হাতে, তখন মনে হচ্ছিল এক যুগের জমে থাকা শীতল সম্পর্কে হয়তো খানিকটা উষ্ণতার সঞ্চার হচ্ছে। সাক্ষাতের পর সামাজিক মাধ্যমে জয়শঙ্কর লিখেছেন, বেগম জিয়ার মূল্যবোধ দুই দেশের সম্পর্কে পথ দেখাবে। কথাগুলো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু দিল্লির সঙ্গে বিএনপির অতীত সম্পর্কের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের কাছে এটি ছিল এক বড় চমক। বছরের পর বছর ধরে ভারত খালেদা জিয়ার রাজনীতির বিরোধিতা করে এসেছে। কিন্তু আজ সেই ভারতই বলছে ভিন্ন কথা। আসলে রাজনীতির স্রোত কখন কোনদিকে মোড় নেয়, তা বলা কঠিন।

ঐতিহাসিক বিরোধ ও সন্দেহের দেওয়াল

খালেদা জিয়া ছিলেন আশির দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। ১৯৯১ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ভারত বরাবরই তাঁকে দেখেছে সন্দেহের চশমা দিয়ে। কারণটা খুব স্পষ্ট। বিএনপি দীর্ঘদিন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতি করেছে। আর জামায়াতে ইসলামীকে ভারত সব সময় পাকিস্তানের মিত্র মনে করে। ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে যাদের দহরম-মহরম, তাদের বিশ্বাস করা দিল্লির জন্য ছিল কঠিন। উল্টো দিকে শেখ হাসিনা আর তাঁর আওয়ামী লীগ ছিল ভারতের ‘স্বাভাবিক মিত্র’। ভারত সব সময় মনে করত, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কথা বলা আওয়ামী লীগই তাদের জন্য নিরাপদ।

কিন্তু দিন বদলেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের দামামা বাজতে শুরু করেছে। আর এই নির্বাচনের আগে দুই দেশের রাজনীতির অঙ্কটাই যেন উল্টে গেছে। জয়শঙ্কর ও তারেক রহমানের এই বৈঠক ছিল অত্যন্ত উষ্ণ ও আন্তরিক। তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের মতে, এই সাক্ষাৎ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায় শুরুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি আসলে উভয় পক্ষকেই এই বদলের পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে।

নতুন সূর্যের অপেক্ষা?

২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশে তখন উত্তাল সময়। ছাত্র আন্দোলনের তীব্র ঝড়ে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের একচেটিয়া শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনার প্রতি দিল্লির দীর্ঘদিনের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। আর সে কারণেই তাঁর পতনের পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের বিরুদ্ধে এক গভীর ক্ষোভ দানা বাঁধে।

হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসিত। তাঁর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চালানো কঠোর অভিযানের দায়ে বাংলাদেশের এক ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবমতে, ওই আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে নারাজ। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এরপর যোগ হয়েছে ভারতবিরোধী আন্দোলনের নেতা ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবার নতুন করে বিক্ষোভ দানা বাঁধে। পরিস্থিতি এত দূর গড়ায় যে উভয় দেশকে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়।

এই ডামাডোলের মধ্যে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাজনৈতিক মাঠে বিএনপি এখন একলা চলো নীতিতে হাঁটছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট ভেঙে তারা নিজেদের উদার ও মধ্যপন্থী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে। ১৭ বছর লন্ডনে থাকার পর গত ডিসেম্বরে তারেক রহমান দেশে ফিরেছেন। তিনি সবার সামনে যে বাংলাদেশের কথা বলছেন, তা এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ। সেখানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মনে করেন, নির্বাসনের এই দীর্ঘ সময় তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি পরিপক্ক করেছে। তাঁর কথা ও আচরণে সেই ছাপ স্পষ্ট।

অবিশ্বাসের কালো মেঘ

বিএনপি আর ভারতের সম্পর্কের ইতিহাসে আস্থার চেয়ে অবিশ্বাসের জায়গাই বেশি ছিল। ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে বিএনপি অনেকটা রাজনৈতিক নির্বাসনে চলে গিয়েছিল। প্রথমে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তারপর শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, বিএনপি যখন শেষবার ক্ষমতায় ছিল (২০০১-২০০৬), তখন ভারতেও ছিল বিজেপির সরকার। অটল বিহারি বাজপেয়ী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

সেই সময়ে দুই দেশের মধ্যে সমস্যা ছিল পাহাড়সমান। সীমান্তে গুলি, বাণিজ্যে বিরোধ, নদীর পানি নিয়ে টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। ভারত অভিযোগ করত, বাংলাদেশ তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বা জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রতি বিএনপির দুর্বলতার অভিযোগও ভারত বারবার তুলেছে। ঢাকা অবশ্য সব সময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

শ্রিংলা স্বীকার করেছেন যে দুই দেশের সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবেই অবিশ্বাস আর বৈরিতার প্রাচীর ছিল। তাঁর মতে, ওই সময় বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে নীতি গ্রহণ করেছিল। আর সেই সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন তারেক রহমান। তাঁর প্রভাব ছিল অপরিসীম।

তারেক রহমান: নিরাপদ বাজি?

রাজনীতিতে চিরশত্রু বলে কিছু নেই। খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবর পেয়ে নরেন্দ্র মোদি যখন আরোগ্যের বার্তা পাঠিয়েছিলেন, বিএনপি তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে দেরি করেনি। শ্রিংলার মতে, তারেক রহমান বুঝেছেন সফল হতে হলে ভারতের বিরোধিতা করে টেকা যাবে না। ভারতের সমর্থন বা অন্তত তাদের বিরোধিতা না করাটা জরুরি। এখন দেখার বিষয়, তাঁর কথার সঙ্গে কাজের মিল কতটুকু থাকে।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, ভারতের কাছে তারেক রহমান এখন ‘সঠিক কথাই’ বলছেন। লন্ডন থেকে ফেরার পর ঢাকার রাজপথে তাঁকে স্বাগত জানাতে মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তা তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়। এই জনপ্রিয়তা প্রতিবেশী অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হতে পারে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, জামায়াতে ইসলামী কিংবা ছাত্র আন্দোলনের অপরীক্ষিত নেতৃত্বের চেয়ে বিএনপির অভিজ্ঞ নেতৃত্বই এখন ভারতের কাছে ‘সেফেস্ট বেট’ বা সবচেয়ে নিরাপদ বাজি। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মনে করেন, ভারত মূলত জামায়াত ও ছাত্রনেতাদের উত্থানকেই নিজেদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে। তাই তারা তারেকের মধ্যে পরিপক্কতা খুঁজে পাচ্ছে।

আরেক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির বিচ্ছেদ ভারতের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করেছে। যদিও ভারত এই সম্পর্ক আনন্দের সঙ্গে করছে না, বরং তারা এটি করতে বাধ্য হচ্ছে।

মানুষে-মানুষে সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ

কেবল করমর্দন বা চিঠি আদান-প্রদান দিয়ে ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানো যায় না। তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির পরিষ্কার করে বলেছেন, নতুন করে শুরু করতে হলে অতীতকে পুরোপুরি পেছনে ফেলতে হবে। ভারত দাবি করে তারা বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু। কিন্তু বাস্তবে তারা কেবল শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বন্ধুই ছিল। হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, শেখ হাসিনার আমলে ঢাকা কার্যত দিল্লির ‘আজ্ঞাবহ’ হয়ে পড়েছিল।

তারেক রহমান যদি ক্ষমতায় আসেন, তবে তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে অটল থাকবেন। তিনি ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান দূরত্ব বা ভারসাম্য বজায় রাখবেন। কবির অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা ভারতের সমর্থন ব্যবহার করে নিজের অপকর্মগুলো ধামাচাপা দিতেন। এ কারণেই আজ বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতের প্রতি এত বিরক্তি। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ হাসিনাকে একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখে। তাই হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার দাবি থেকে ঢাকা সরে আসবে না। নির্বাচনের পরেও এই চাপ অব্যাহত থাকবে।

কবির আরও বলেন, ভারতকে বুঝতে হবে হাসিনার যুগ শেষ। ভারতে বসে হাসিনা যাতে বাংলাদেশকে অস্থির করতে না পারেন, সেদিকে তাদের খেয়াল রাখতে হবে। অন্যথায়, মানুষের মনে যে ভারত-বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে, তা পরবর্তী সরকারের জন্য ভারতের সঙ্গে কাজ করা কঠিন করে তুলবে। উত্তেজনার আঁচ রাজনীতি ছাড়িয়ে ক্রিকেটের ময়দানেও পৌঁছেছে। আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় বোঝা যায় সম্পর্কের ফাটল কত গভীর।

আগামীর পথচলা

সামনে কী অপেক্ষা করছে? ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুণায়াতের শঙ্কা, তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে পাকিস্তানপন্থী ও ভারতবিরোধী গোষ্ঠীগুলো আবার মাথাচাড়া দিতে পারে। এটিই হবে ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জন ড্যানিলোভিচের মতে, অতীতের ইতিহাস বিবেচনা করলে ভারতের এই উদ্বেগ খুবই স্বাভাবিক।

তবে হুমায়ুন কবির আশ্বাস দিয়ে বলছেন, তারেক রহমান সহযোগিতার হাত বাড়াতে প্রস্তুত। শেখ হাসিনার আমলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সত্যিকারের কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। সেটা ছিল কেবল ‘হাসিনা-কেন্দ্রিক’ সম্পর্ক। এখন সময় এসেছে ভারতের নীতি পরিবর্তনের। তাদের দেখাতে হবে যে তারা সত্যিই গতিপথ বদলাতে চায়। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সম্পর্ক শুধু দুই নেতার মধ্যে নয়, হতে হবে দুই দেশের মানুষের মধ্যে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভিসা বন্ধ, সীমান্তে উত্তেজনা এবং ক্রিকেট মাঠেও বৈরিতার ছায়া পড়েছে। এমন অবস্থায় সম্পর্কের বরফ গলানো খুব সহজ কাজ হবে না। ভারতকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কোনো ব্যক্তি বা দলকে নয়, বাংলাদেশের মানুষকে মূল্য দেয়। শেখ হাসিনার আশ্রয়কে কেন্দ্র করে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছে, তার সমাধান খুঁজতে হবে। অন্যথায়, তারেক রহমান সরকারে এলেও, জনমতের চাপে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খুব বেশি এগিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে। ২০২৬ সালের এই নতুন বাস্তবতায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক তাই কেবল রাজনৈতিক মিত্রতা নয়, বরং নতুন ভূ-রাজনৈতিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে চলেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং মোদি সরকারের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে মিলবে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা অবলম্বনে মাহবুবুল আলম তারেক

Ad 300x250

সম্পর্কিত