স্ট্রিম ডেস্ক

অনেকে মনে করেন ইরান শুরু থেকেই শিয়াপ্রধান দেশ ছিল। এটা ঐতিহাসিকভাবে ভুল ধারণা। ইরানের শিয়া হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত রাজনৈতিক। ১৬শ শতাব্দীতে সাফাভি রাজবংশের উত্থানের আগে ইরান মূলত সুন্নিপ্রধান এলাকা ছিল। সম্রাট প্রথম ইসমাইল যখন ক্ষমতায় বসেন, তিনি ঘোষণা করেন যে শিয়া ইসলাম হবে পারস্যের রাষ্ট্রধর্ম।
এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল ভূ-রাজনীতি। পশ্চিমে সুন্নি অটোমান সাম্রাজ্য এবং উত্তর-পূর্বে উজবেক সুলতানদের থেকে নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতেই সাফাভিরা শিয়া মতবাদকে ব্যবহার করে। তারা সুদূর লেবানন ও বাহরাইন থেকে শিয়া আলেমদের ইরানে নিয়ে আসেন। একপ্রকার বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ মানুষকে শিয়া মতবাদে দীক্ষিত করেন। এভাবেই পারস্যের জাতীয়তাবাদের সাথে শিয়া ধর্মীয় পরিচয় একীভূত হয়ে যায়।
সব শিয়া কি এক
শিয়াদের মধ্যে অনেক উপদল থাকলেও মূলত তিনটি ধারা প্রধান: ১. জাইদি, যারা মনে করেন ইমাম হওয়ার জন্য ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর হওয়াই যথেষ্ট, যদি তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এখন এরা মূলত ইয়েমেনে কেন্দ্রিভূত। ২. ইসমাইলি শিয়ারা ষষ্ঠ ইমামের পর সপ্তম ইমাম হিসেবে ইসমাইলকে মানেন। আগা খান এই ধারার আধ্যাত্মিক নেতা। ৩. ইমামি বা দ্বাদশবাদীরা ইরান ও ইরাকের সংখ্যাগুরু শিয়ারা এই ধারার। তারা বারোজন নির্দিষ্ট ইমামের ওপর বিশ্বাস রাখেন। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ১২তম ইমাম (ইমাম মাহদি) ৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে শিশুকালে আত্মগোপন করেন। তিনি কিয়ামতের আগে ফিরে এসে পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এই ‘ফিরে আসার’ প্রতীক্ষাই এই ধারার শিয়াদের মূল চালিকাশক্তি।
মজলুম বনাম জালিম: শিয়া দর্শনের মেরুদণ্ড
শিয়া ইসলামের মূল দর্শন আবর্তিত হয় কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা নিয়ে। ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাত শিয়াদের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিই সবসময় সঠিক নন। সত্যের পথে লড়াই করে জীবন দেওয়া ‘মজলুম’ বা অত্যাচারিতরাই প্রকৃত বিজয়ী। এই ‘মজলুম’ বনাম ‘জালিম’ (অত্যাচারী)-এর চিরন্তন লড়াই শিয়াদের একটি বিপ্লবী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দান করেছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহকে ‘জালিম ইয়াাজিদ’ আর খোমেনিকে ‘মুক্তিকামী হোসেন’-এর প্রতীকে চিত্রিত করা হয়েছিল।
৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বাদশ ইমামের অন্তর্ধানের পর শিয়া আলেমরা এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সন্ন্যাসে চলে যান। একে বলা হয় ‘মহা নীরবতার কাল’। তাদের ধারণা ছিল, ইমাম মাহদি যেহেতু নেই তাই দুনিয়ার কোনো সরকারই বৈধ নয়। সুতরাং রাজনীতিতে নাক গলিয়ে লাভ নেই। আলেমদের কাজ ছিল কেবল মানুষের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান করা।
এই হাজার বছরের নীরবতাকে চুরমার করে দেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ১৯৭০-এর দশকে নির্বাসিত জীবনে তিনি এক জ্বালাময়ী প্রশ্ন তুললেন—‘ইমাম মাহদি ফিরে না আসা পর্যন্ত কি মুসলমানরা অবিচার আর জুলুমের শিকার হতেই থাকবে?’ তিনি উদ্ভাবন করলেন ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’ বা ‘ইসলামি আইনবিদের অভিভাবকত্ব’। তিনি বললেন, ইমাম নেই তো কী হয়েছে? একজন সুযোগ্য আলেম বা ‘ফকিহ’ হবেন ইমামের ছায়া, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। এটি ছিল শিয়া ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিবর্তন।
১৯৭৯: বিপ্লব কীভাবে শিয়াদের দখলে গেল
ইরান বিপ্লব কেবল শিয়াদের একার ছিল না। এতে কমিউনিস্ট (তুদেহ পার্টি), জাতীয়তাবাদী এবং সাধারণ ছাত্ররা অংশ নিয়েছিল। কিন্তু খোমেনির ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’ তত্ত্ব এবং তাঁর আকর্ষণীয় নেতৃত্বের কাছে অন্যরা পরাস্ত হয়। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড বা পাশদারান গঠিত হয় বিপ্লবকে পাহারা দেওয়ার জন্য। অত্যন্ত কৌশলে বিপ্লবের অন্যান্য শক্তিকে হটিয়ে আলেমতন্ত্র কায়েম করা হয়। ১৯৭৯ সালের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই ক্ষমতা দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। শাহর পতন হলো এবং খোমেনি বীরের বেশে তেহরানে ফিরলেন। ইরানের নতুন সংবিধানে ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’কে এমনভাবে বসানো হলো যে, রাষ্ট্রপ্রধান (প্রেসিডেন্ট) থাকলেও আসল ক্ষমতা থাকল ‘রেহবার’ বা সর্বোচ্চ নেতার হাতে। খোমেনি কেবল একজন নেতা নন, তিনি হয়ে উঠলেন রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক কম্পাস। সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ—সবই সরাসরি তাঁর ইশারায় চলতে শুরু করল।
খামেনি আমল ও বর্তমান সংকট
১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দায়িত্ব নেন। তিনি আদর্শকে একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। খোমেনি ছিলেন বিপ্লবের স্থপতি, আর খামেনি হলেন সেই বিপ্লবের দীর্ঘস্থায়ী প্রহরী। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খামেনি ইরানকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছেন যে, তাঁর ইশারা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'অক্ষশক্তির প্রতিরোধ' যা ইরাক থেকে লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত।
খামেনির প্রয়াণ একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শুন্যতা পূরণ হওয়া সহজ নয়। এখন সম্ভাব্য যে বিষয়গুলো সামনে আছে তা এরকম:
উত্তরসূরি বনাম রক্তধারা: ইরানের সংবিধান অনুযায়ী ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ পরবর্তী নেতা নির্বাচন করবে। এক সময় ইব্রাহিম রাইসিকে খামেনির উত্তরসূরি ভাবা হতো। কিন্তু ২০২৪-এর সেই রহস্যময় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এখন খামেনির ছেলে মোশতবা খামেনির নাম উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু এখানেই সংকট। বিপ্লব হয়েছিল শাহর রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে; এখন খামেনির ছেলেকে যদি ক্ষমতায় বসানো হয়, তবে তা এক প্রকার ‘ইসলামি রাজতন্ত্র’ হিসেবেই পরিচিত হবে, যা সাধারণ ইরানিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
পাশদারান এবং ছায়া-সরকার: ইরানে এখন সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থা হলো ‘রেভল্যুশনারি গার্ড’ বা পাশদারান। খামেনির মৃত্যুর পর তারা কি কেবল একজন নতুন আলেমের নির্দেশ মানবে? নাকি পর্দার আড়াল থেকে তারাই রাষ্ট্র চালাবে? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান ধীরে ধীরে একটি ‘ধর্মীয় সামরিক রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা থাকবেন কেবল প্রতীকী প্রধান হিসেবে, আর সব সিদ্ধান্ত নেবে সামরিক বাহিনী।
দেয়ালের লিখন: জনবিক্ষোভ
ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি এখন ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো। ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে তরুণ প্রজন্ম এই ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’র কঠোর শাসন আর নিতে পারছে না। খামেনির মৃত্যুর পর যে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হবে, তাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষ আবার রাস্তায় নেমে আসতে পারে। সেই গণজোয়ার দমানো হয়তো আগের মতো সহজ হবে না।
‘বিলায়েত-ই ফকিহ’ ইরানকে আধুনিক যুগে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক সত্তা দিয়েছিল। কিন্তু এক ব্যক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। খামেনির প্রয়াণ হবে এই ব্যবস্থার জন্য ‘এসিড টেস্ট’। যদি ক্ষমতার রূপান্তর মসৃণ না হয়, তবে হয়তো ইরানের ইতিহাসে নতুন কোনো বাস্তবতার জন্ম হবে।

অনেকে মনে করেন ইরান শুরু থেকেই শিয়াপ্রধান দেশ ছিল। এটা ঐতিহাসিকভাবে ভুল ধারণা। ইরানের শিয়া হওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত রাজনৈতিক। ১৬শ শতাব্দীতে সাফাভি রাজবংশের উত্থানের আগে ইরান মূলত সুন্নিপ্রধান এলাকা ছিল। সম্রাট প্রথম ইসমাইল যখন ক্ষমতায় বসেন, তিনি ঘোষণা করেন যে শিয়া ইসলাম হবে পারস্যের রাষ্ট্রধর্ম।
এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল ভূ-রাজনীতি। পশ্চিমে সুন্নি অটোমান সাম্রাজ্য এবং উত্তর-পূর্বে উজবেক সুলতানদের থেকে নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতেই সাফাভিরা শিয়া মতবাদকে ব্যবহার করে। তারা সুদূর লেবানন ও বাহরাইন থেকে শিয়া আলেমদের ইরানে নিয়ে আসেন। একপ্রকার বাধ্যতামূলকভাবে সাধারণ মানুষকে শিয়া মতবাদে দীক্ষিত করেন। এভাবেই পারস্যের জাতীয়তাবাদের সাথে শিয়া ধর্মীয় পরিচয় একীভূত হয়ে যায়।
সব শিয়া কি এক
শিয়াদের মধ্যে অনেক উপদল থাকলেও মূলত তিনটি ধারা প্রধান: ১. জাইদি, যারা মনে করেন ইমাম হওয়ার জন্য ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর হওয়াই যথেষ্ট, যদি তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এখন এরা মূলত ইয়েমেনে কেন্দ্রিভূত। ২. ইসমাইলি শিয়ারা ষষ্ঠ ইমামের পর সপ্তম ইমাম হিসেবে ইসমাইলকে মানেন। আগা খান এই ধারার আধ্যাত্মিক নেতা। ৩. ইমামি বা দ্বাদশবাদীরা ইরান ও ইরাকের সংখ্যাগুরু শিয়ারা এই ধারার। তারা বারোজন নির্দিষ্ট ইমামের ওপর বিশ্বাস রাখেন। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ১২তম ইমাম (ইমাম মাহদি) ৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে শিশুকালে আত্মগোপন করেন। তিনি কিয়ামতের আগে ফিরে এসে পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। এই ‘ফিরে আসার’ প্রতীক্ষাই এই ধারার শিয়াদের মূল চালিকাশক্তি।
মজলুম বনাম জালিম: শিয়া দর্শনের মেরুদণ্ড
শিয়া ইসলামের মূল দর্শন আবর্তিত হয় কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা নিয়ে। ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদাত শিয়াদের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিই সবসময় সঠিক নন। সত্যের পথে লড়াই করে জীবন দেওয়া ‘মজলুম’ বা অত্যাচারিতরাই প্রকৃত বিজয়ী। এই ‘মজলুম’ বনাম ‘জালিম’ (অত্যাচারী)-এর চিরন্তন লড়াই শিয়াদের একটি বিপ্লবী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দান করেছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে শাহকে ‘জালিম ইয়াাজিদ’ আর খোমেনিকে ‘মুক্তিকামী হোসেন’-এর প্রতীকে চিত্রিত করা হয়েছিল।
৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দ্বাদশ ইমামের অন্তর্ধানের পর শিয়া আলেমরা এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সন্ন্যাসে চলে যান। একে বলা হয় ‘মহা নীরবতার কাল’। তাদের ধারণা ছিল, ইমাম মাহদি যেহেতু নেই তাই দুনিয়ার কোনো সরকারই বৈধ নয়। সুতরাং রাজনীতিতে নাক গলিয়ে লাভ নেই। আলেমদের কাজ ছিল কেবল মানুষের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান করা।
এই হাজার বছরের নীরবতাকে চুরমার করে দেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ১৯৭০-এর দশকে নির্বাসিত জীবনে তিনি এক জ্বালাময়ী প্রশ্ন তুললেন—‘ইমাম মাহদি ফিরে না আসা পর্যন্ত কি মুসলমানরা অবিচার আর জুলুমের শিকার হতেই থাকবে?’ তিনি উদ্ভাবন করলেন ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’ বা ‘ইসলামি আইনবিদের অভিভাবকত্ব’। তিনি বললেন, ইমাম নেই তো কী হয়েছে? একজন সুযোগ্য আলেম বা ‘ফকিহ’ হবেন ইমামের ছায়া, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। এটি ছিল শিয়া ধর্মতত্ত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিবর্তন।
১৯৭৯: বিপ্লব কীভাবে শিয়াদের দখলে গেল
ইরান বিপ্লব কেবল শিয়াদের একার ছিল না। এতে কমিউনিস্ট (তুদেহ পার্টি), জাতীয়তাবাদী এবং সাধারণ ছাত্ররা অংশ নিয়েছিল। কিন্তু খোমেনির ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’ তত্ত্ব এবং তাঁর আকর্ষণীয় নেতৃত্বের কাছে অন্যরা পরাস্ত হয়। ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড বা পাশদারান গঠিত হয় বিপ্লবকে পাহারা দেওয়ার জন্য। অত্যন্ত কৌশলে বিপ্লবের অন্যান্য শক্তিকে হটিয়ে আলেমতন্ত্র কায়েম করা হয়। ১৯৭৯ সালের সংবিধানে সর্বোচ্চ নেতার হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হয়। এই ক্ষমতা দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। শাহর পতন হলো এবং খোমেনি বীরের বেশে তেহরানে ফিরলেন। ইরানের নতুন সংবিধানে ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’কে এমনভাবে বসানো হলো যে, রাষ্ট্রপ্রধান (প্রেসিডেন্ট) থাকলেও আসল ক্ষমতা থাকল ‘রেহবার’ বা সর্বোচ্চ নেতার হাতে। খোমেনি কেবল একজন নেতা নন, তিনি হয়ে উঠলেন রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক কম্পাস। সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ—সবই সরাসরি তাঁর ইশারায় চলতে শুরু করল।
খামেনি আমল ও বর্তমান সংকট
১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দায়িত্ব নেন। তিনি আদর্শকে একটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। খোমেনি ছিলেন বিপ্লবের স্থপতি, আর খামেনি হলেন সেই বিপ্লবের দীর্ঘস্থায়ী প্রহরী। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খামেনি ইরানকে এমন এক শক্তিতে পরিণত করেছেন যে, তাঁর ইশারা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'অক্ষশক্তির প্রতিরোধ' যা ইরাক থেকে লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত।
খামেনির প্রয়াণ একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শুন্যতা পূরণ হওয়া সহজ নয়। এখন সম্ভাব্য যে বিষয়গুলো সামনে আছে তা এরকম:
উত্তরসূরি বনাম রক্তধারা: ইরানের সংবিধান অনুযায়ী ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ পরবর্তী নেতা নির্বাচন করবে। এক সময় ইব্রাহিম রাইসিকে খামেনির উত্তরসূরি ভাবা হতো। কিন্তু ২০২৪-এর সেই রহস্যময় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এখন খামেনির ছেলে মোশতবা খামেনির নাম উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু এখানেই সংকট। বিপ্লব হয়েছিল শাহর রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে; এখন খামেনির ছেলেকে যদি ক্ষমতায় বসানো হয়, তবে তা এক প্রকার ‘ইসলামি রাজতন্ত্র’ হিসেবেই পরিচিত হবে, যা সাধারণ ইরানিদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
পাশদারান এবং ছায়া-সরকার: ইরানে এখন সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্থা হলো ‘রেভল্যুশনারি গার্ড’ বা পাশদারান। খামেনির মৃত্যুর পর তারা কি কেবল একজন নতুন আলেমের নির্দেশ মানবে? নাকি পর্দার আড়াল থেকে তারাই রাষ্ট্র চালাবে? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান ধীরে ধীরে একটি ‘ধর্মীয় সামরিক রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা থাকবেন কেবল প্রতীকী প্রধান হিসেবে, আর সব সিদ্ধান্ত নেবে সামরিক বাহিনী।
দেয়ালের লিখন: জনবিক্ষোভ
ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি এখন ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো। ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে তরুণ প্রজন্ম এই ‘বিলায়েত-ই ফকিহ’র কঠোর শাসন আর নিতে পারছে না। খামেনির মৃত্যুর পর যে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হবে, তাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষ আবার রাস্তায় নেমে আসতে পারে। সেই গণজোয়ার দমানো হয়তো আগের মতো সহজ হবে না।
‘বিলায়েত-ই ফকিহ’ ইরানকে আধুনিক যুগে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক সত্তা দিয়েছিল। কিন্তু এক ব্যক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। খামেনির প্রয়াণ হবে এই ব্যবস্থার জন্য ‘এসিড টেস্ট’। যদি ক্ষমতার রূপান্তর মসৃণ না হয়, তবে হয়তো ইরানের ইতিহাসে নতুন কোনো বাস্তবতার জন্ম হবে।

পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনী শত্রুদের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর কঠোর আঘাত হানা অব্যাহত রাখবে।
৩ ঘণ্টা আগে
রোববার (১ মার্চ) সকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের রাষ্ট্র্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচার করা হয় বলে তথ্য দেয় বিবিসি ও সিএনএন।
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দারা তথ্য আদান–প্রদান করেছিল। অভিযান সম্পর্কে জানেন এমন একাধিক ব্যক্তি এ বিষয়ে জানান।
৬ ঘণ্টা আগে
১৯৩৯ সালে ইরানের পূর্বাঞ্ছলে সাধারণ এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেয় এক শিশু। আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় এই শিশুই সাধারণের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেন দেশের সর্বোচ্চ নেতা। শুধু দেশ নয়, সামরিক বাহিনীসহ সর্বত্র ছিল তাঁর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
৯ ঘণ্টা আগে