জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

খামেনির উত্থান-পতন

মাহজাবিন নাফিসা
মাহজাবিন নাফিসা

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬: ৪৪
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

রোববার (১ মার্চ) সকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের রাষ্ট্র্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রচার করা হয় বলে তথ্য দেয় বিবিসি ও সিএনএন।

১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া এই কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অটল ছিলেন তার কঠোর আদর্শিক সিদ্ধান্তে।

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে পাঁচ বছর পর প্রথমবার জনসমক্ষে উপস্থিত হয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক আপসহীন বার্তা দেন। মসজিদের খুতবায় সমর্থকের সামনে তিনি বলেন, ইসরায়েল ‘দীর্ঘদিন টিকবে না’।

এর সতেরো মাস পর বহু দশকের তিক্ত সংগ্রামের পর খামেনি তাঁর শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের মুখোমুখি হন।

যেভাবে খামেনির উত্থান

পূর্ব ইরানের ধর্মীয় শহর মাশহাদে স্বল্প আয়ের এক ছোট ধর্মীয় আলেম পরিবারে ১৯৩৯ সালে খামেনির জন্ম।

১৯৬০-এর শুরুতে উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি প্রথম একজন কট্টরপন্থী কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তখন শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি বড় ধরনের সংস্কার কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, যা দেশের রক্ষণশীল আলেমদের বড় অংশই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ছাত্রজীবনে খামেনি শিয়া ইসলামের ঐতিহ্য এবং রক্ষণশীল বিরোধী আন্দোলনের উদীয়মান নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হন। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে নির্বাসিত খোমেনির হয়ে তিনি গোপন দায়িত্ব পালন করতেন এবং ইসলামপন্থী আন্দোলনের নেটওয়ার্ক সংগঠিত করতেন।

ইরানের নিরাপত্তা সংস্থার হাতে বহুবার বন্দি হলেও ১৯৭৮ সালের গণআন্দোলনে তিনি অংশ নিতে সক্ষম হন। এই আন্দোলনের ফলে পাহলভি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং খোমেনি দেশে ফিরে আসেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী খামেনি তখন দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ১৯৮১ সালে এক হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

যেভাবে ক্ষমতা সুসংহত করেছেন

১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধন করে কম ধর্মীয় যোগ্যতাসম্পন্ন কাউকে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয় এবং আগের তুলনায় অধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়। এরপর খামেনি উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত হন।

তিনি দ্রুত এই ক্ষমতা ব্যবহার করে বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের জটিল ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।

তাঁর প্রধান শক্তির ভিত্তিগুলোর একটি ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এটি তাঁর নতুন শাসনের আদর্শিক কেন্দ্র এবং একটি শক্তিশালী সামরিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। তবে খামেনি সবসময়ই অন্য শক্তিশালী মিত্র ও অনুসারীদেরও কাছে রাখতেন।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

১৯৯০-এর দশকে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দিয়ে এবং অনুগতদের পুরস্কৃত করে আরও শক্তভাবে নিজের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। এইসময় বিদেশে অবস্থানরত বিরোধীদের হত্যার পাশাপাশি হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেন তিনি। সবসময়ই তার লক্ষ্য ছিল খোমেনির রেখে যাওয়া প্রকল্পের কঠোর নীতিকে বাস্তববাদী পদ্ধতিতে এগিয়ে নেওয়া।

সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক

১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে খামেনি তাঁকে কিছুটা স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করতে দেন। তবে শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামো ও আদর্শ রক্ষায় আগের মতোই কঠোর অবস্থানে ছিলেন তিনি। এর ফলস্বরূপ খাতামি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাকে তিনি বাধা দেননি। তিনি খোমেনির মতোই গণবিধ্বংসী অস্ত্র পরিত্যাগের নীতি সমর্থন করেন।

তবে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণের পর সেখানে মার্কিন বাহিনীকে দুর্বল করার জন্য আইআরজিসির প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেন এবং এভাবে ইরানে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা চালান।

পারমাণবিক চুক্তি ও দমননীতি

যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে তিনি সন্দিহান থাকলেও ২০১৫ সালে এটি বাস্তবায়নে বাধা দেননি।

এছাড়াও ইরানে তিনি ক্রমাগত বিক্ষোভ ও সংস্কারের দাবির জবাবে কঠোর দমননীতি পরিচালনা করেন। নারী, সমকামী ব্যক্তি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে।

অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সাবেক সমর্থক শাসনব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে অসন্তোষ ক্রমে বিস্ফোরণমুখী পরিস্থিতিতে পৌঁছায়।

এছাড়াও তার শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাক ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন করা। ইরানি কর্মকর্তারা একে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ নামে উল্লেখ করেন। এতে ব্যাপক বিনিয়োগও করা হয় দল গুলো থেকে।

এটি একসময় কার্যকর কৌশল মনে হলেও গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের আক্রমণের মুখে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিসেম্বর মাসে বাশার আল-আসাদের পতনের মাধ্যমে সিরিয়ার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের জোটও শেষ হয়ে যায়।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় খামেনির দপ্তর লক্ষ্যবস্তু হওয়ার সময় হিজবুল্লাহর নতুন নেতৃত্ব শুধু মৌখিক সমর্থন দেয়। হামাসেরও তেমন কিছু করার ক্ষমতা নেই এবং হুথিরাও কার্যত নিষ্ক্রিয়।

এভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে খামেনি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে ছিলেন।

যেভাবে পতন

তিন দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে খামেনি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন শক্তির চাপ সামলাতে, সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে এবং খোমেনির উত্তরাধিকার রক্ষা করতে চেষ্টা করেছেন—এবং অবশ্যই নিজের ক্ষমতা ও অনুগতদের অবস্থানও বজায় রেখেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার কিছু বাস্তববাদী আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর দাবির মুখে তিনি সময়ক্ষেপণের কৌশল নেন এবং হামলা এড়াতে কিছু ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দেন।

কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাস্তববাদীর পরিবর্তে তার কঠোর মতাদর্শিক রূপটিই বারবার সামনে চলে আসে। তিনি পুলিশও আধাসামরিক বাহিনী ব্যবহার করে ১৯৭০-এর দশকের বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভগুলো নির্মমভাবে দমন করেন। সাম্প্রতিক সরকার বিরোধী বিক্ষোভেও তিনি তার কঠোর দমননীতি মেনে চলেছেন। ফলে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তার উত্তরসূরি নিয়ে জোর জল্পনা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির মতে, খামেনি নিহত হলে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কট্টরপন্থী নেতারা। কারণ তারা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আদর্শ ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গত সপ্তাহে রয়টার্সকে দুটি সূত্র এ তথ্য জানায়।

তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি এখন তার অনেক ব্যর্থতা ও চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে তুলেছে। তবে খামেনির নির্মম ভারসাম্য রক্ষার রাজনীতি শেষ হয়ে গেছে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত