যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি প্রশ্নে ইরানে বিভেদ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ১৭: ৪৬
রাস্তার পাশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলি খামেনির ছবিযুক্ত একটি বিলবোর্ড। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা স্মারক নিয়ে দেশটির ভেতরে বিতর্ক চলছে। গত বৃহস্পতিবার এক লিখিত বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, ‘নীতিগতভাবে এই সমঝোতা নিয়ে আমার ভিন্ন মতামত রয়েছে।’

তাঁর এই অবস্থান কট্টরপন্থীদের আরও সক্রিয় করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আপসের কড়া বিরোধিতা করছেন।

পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।

সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি চুক্তির দায়ভার অনেকটাই প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। পেজেশকিয়ান তুলনামূলক মধ্যপন্থী হওয়ায় কট্টরপন্থীরা সমঝোতা ইস্যুতে তাঁর সমালোচনা করছেন।

খামেনি কী বলেছেন

ওই বিবৃতিতে খামেনি জানান, পেজেশকিয়ান আশ্বাস দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত দাবি তুললে ইরান তা মেনে নেবে না। সরাসরি আলোচনার মানে এই নয় যে ইরান প্রতিপক্ষের অবস্থান মেনে নিচ্ছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, খামেনি আরও একটি শর্ত দিয়েছেন। নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ সদস্যকে চুক্তির পক্ষে থাকতে হবে। এর মধ্যে সামরিক কমান্ডাররাও রয়েছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, অধিকাংশ সদস্য চুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তবে ভোটাভুটির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

কর্তৃপক্ষ কী বলছে?

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, তারা ইরানি জনগণ ও মিত্রদের স্বার্থ রক্ষা করবে। একই সঙ্গে যুদ্ধে নিহত ইরানি নেতাদের স্মৃতির প্রতিও সম্মান জানাবে।

পরিষদ বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণ অবিশ্বাস নিয়েই আলোচনা চালাবে। চুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ হলে পাল্টা পদক্ষেপের পরিকল্পনাও প্রস্তুত রয়েছে।

এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক দলিল বর্ণনা করে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এক্সে লিখেছেন, এটি শক্তিশালী ইরানের পক্ষ থেকে শান্তি ও পারস্পরিক সম্মানের বার্তা।

তিনি আরও বলেন, এই দলিল এমন জাতির কণ্ঠস্বর, যারা হুমকি বা চাপের কাছে নিজেদের মর্যাদা ও স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়নি।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও খামেনিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, যুদ্ধের অর্জনগুলো আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পেরেছে ইরান। তবে শান্তির পথ এখনো দীর্ঘ ও কঠিন।

গালিবাফ আরও বলেন, এখন সরকারের দায়িত্ব জনগণকে অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করা। যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।

কট্টরপন্থীরা কেন বিক্ষোভ করছে?

খামেনির সমর্থকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইরানকে অনড় থাকতে হবে। তাদের দাবি, চুক্তিতে এ বিষয়টি না থাকলে আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্র-সমর্থিত সমাবেশ হয়েছে। এসব সমাবেশে পেজেশকিয়ান, গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সমালোচনা হয়েছে।

কট্টরপন্থীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বৈঠকে এই নেতারা বেশি ছাড় দিতে পারেন।

রাজধানীর কাছের শাহর-ই রে শহরে ধর্মীয় শোকগাথা পাঠক মোহাম্মদ আলী বাখশি পেজেশকিয়ানকে সতর্ক করে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার শর্ত বাস্তবায়ন না হলে কঠিন পরিণতির মুখে পড়তে হবে।

এর জবাবে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তা মেহদি তাবাতাবাই এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, এই ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক বিভেদ উসকে দিচ্ছে।

এদিকে কিছু কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য পার্লামেন্ট পুরোপুরি চালুর দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ক্ষতিকর চুক্তি হলে সংসদ তা আটকে দিতে পারবে।

কোম শহরের প্রতিনিধি মোহাম্মদ মান্নান রাইসি এক্সে লিখেছেন, ন্যায়বিচার করুন এবং পার্লামেন্ট খুলে দিন। আমার সর্বোচ্চ নেতা একা হয়ে গেছেন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদে জুমার খতিব আয়াতুল্লাহ আহমদ আলামোলহোদা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই শেষ হয়নি। আমাদের পিছু হটার সুযোগ নেই ।

শনিবার সকালে ইরানের সংবাদপত্রগুলোতেও এই সমঝোতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রক্ষণশীল দৈনিকগুলো মনে করছে, সর্বোচ্চ নেতা শর্তসাপেক্ষে চুক্তির অনুমতি দিলেও সামনে কঠিন সময়। অপরদিকে সংস্কারপন্থী পত্রিকা ‘এতেমাদ’ এই খসড়াকে একটি ‘বিজয় দলিল’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত