সুইজারল্যান্ডে বৈঠক বাতিল, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ২০: ৪৪
বাম থেকে জেডি ভ্যান্স ও বাঘের গালিবাফ। ছবি: সংগৃহীত

কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নির্ধারিত শান্তি আলোচনা শুক্রবার হচ্ছে না। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটি স্থগিতের কথা জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শেষ মুহূর্তে সফর পরিকল্পনা বাতিল করায় আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।

এদিকে লেবাননের সংঘাতও আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। সেখানে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নতুন হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। লেবানন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজ বিমান হামলায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির অন্যতম প্রাণঘাতী হামলায় তাদের চার সেনা নিহত হয়েছেন।

এ সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা পরে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী চুক্তির মেয়াদও বাড়ানো যেতে পারে।

বিষয়টির সঙ্গে অবগত দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য অবকাশকেন্দ্র বুর্গেনস্টকে কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, তিনি সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।

এর আগে, বৃহস্পতিবার একটি সূত্র জানিয়েছিল, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেননি।

অন্তর্বর্তী চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আলোচনার বাইরে থাকা ইসরায়েল বলেছে, তারা এই চুক্তির অংশ নয়। এ সপ্তাহের শুরুতে লেবাননে সহিংসতা কমে এলেও পরে তা আবার বেড়েছে।

আলোচনা স্থগিত, বলছে সুইজারল্যান্ড

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে অন্তত ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছিল এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে এ সপ্তাহে তেলের দাম কিছুটা কমেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান এ প্রণালি বন্ধ করেছিল।

ইরান জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের চুক্তির ফলে অন্তত আরও ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার কারিগরি আলোচনা শুরু হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, আলোচনা পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলেই ভ্যান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

তবে বিবৃতিতে বলা হয়, এই আলোচনার লজিস্টিক ব্যবস্থা কখনোই সহজ বা পূর্বানুমানযোগ্য ছিল না।

এ বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে। তবে আলোচনার লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে দেশটি প্রস্তুত রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতিমূলক কাজ অব্যাহত আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, সুইজারল্যান্ডে চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানও হবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেছে, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে জানিয়েছেন চুক্তিতে সই করায় এমন আয়োজনের প্রয়োজন নেই।

ট্রাম্পের সমালোচকদের প্রশ্ন

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্রদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ বন্ধ করতে ট্রাম্প খুব বেশি ছাড় দিয়েছেন কি না।

মার্চ মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধের অবসান হবে না।

কিন্তু ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল, বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করা এবং তেল রপ্তানির জন্য ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প হতাশা থেকে এই চুক্তিতে সই করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আসন্ন আলোচনা সহজ হবে না।

এক বার্তায় তিনি বলেন, আমেরিকান পক্ষ যদি অতিরিক্ত দাবি করতে চায়, আমরা তা মেনে নেব না।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদও আমেরিকান পক্ষের যেকোনো লঙ্ঘনের জবাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার অঙ্গীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, দেশের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো হবে না।

ভ্যান্স বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও সীমিত করার চেষ্টা করবে।

যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে, যুদ্ধের ব্যয় এবং কিছু অসংশ্লিষ্ট বিল পরিশোধে তাদের ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনার মাধ্যমে এখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি শক্তিশালী চুক্তি সম্ভব। তাদের লক্ষ্য ২০১৫ সালের চুক্তির চেয়েও ভালো একটি সমঝোতা অর্জন করা। ওই চুক্তি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য কয়েকটি দেশের মধ্যে হয়েছিল, যা ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এখন ইরান আগের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তারা একটি পরাশক্তির হামলা মোকাবিলা করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করেছে এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞা থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছাড়ও আদায় করে নিয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত