গত ২২ মার্চ দিনমজুর আজিজুর রহমানের মৃত্যু সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতনের সেই পুরনো উদ্বেগজনক তালিকায় আরও একটি নাম যোগ করল।
ঘটনার শুরু গত বছরের ৪ এপ্রিল। গরু চরাতে গিয়ে ঘাস কাটার জন্য আজিজুর আর তাঁর আরও তিন সঙ্গী ঠাকুরগাঁ এলকার সীমান্ত পিলার ৩৭৩/১-এস এর জিরো পয়েন্টের কাছে জড়ো হয়েছিলেন। আর সব দিনের মতই সেই সাধারণ একটি দিন আজিজুরের জীবনে ১১ মাসের এক দুঃস্বপ্নে রূপ নেয়। ভারতে বন্দি হওয়া, নির্যাতনের অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত কফিনে করে নিজের মাতৃভূমিতে ফেরা—এই ছিল তাঁর ভাগ্যের লিখন।
আজিজুরের মৃত্যুর খবর তাঁর পরিবার জানতে পারে আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে। আজিজুরের স্ত্রী তাসকারা বেগমের দাবি, স্বজনরা তাঁকে জানিয়েছেন যে হেফাজতে থাকাকালীন আজিজুরের ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্যাতনের ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ বাংলাদেশিরা দিনের পর দিন মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং দায়বদ্ধতার অভাবের কারণে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। দুই দেশই মুখে ‘জিরো কিলিং’ নীতির কথা বলে। কিন্তু আজিজুরের নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো বারবার ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আর এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া মানুষদের প্রায় সবাই সীমান্তের এপার অর্থাৎ বাংলাদেশের নাগরিক।
পরিসংখ্যানের পাতায় নিষ্ঠুর বাস্তবতা
বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন চুক্তি নেই তবে বেশ কিছু দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা রয়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের ‘যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ অনুযায়ী দুই পক্ষই সীমান্তে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের অঙ্গীকার করেছিল।
এমনকি গত বছরের ২৫ আগস্ট বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠকেও সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ বন্ধে উভয় পক্ষ একমত হয়। সেই সঙ্গে জিরো লাইনের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ না করা এবং আটককৃত নাগরিকদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
বছরের পর বছর ধরে এসব উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে একই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সীমান্তে প্রাণহানি থামছে না।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ও ‘সাফরান’-এর তথ্যমতে, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত বিএসএফের হাতে ৫৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৬৫ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে রাজশাহীতে বিএসএফের হাতে একজন বাংলাদেশি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রংপুরে একজনকে আটক এবং আরেকজনকে আহত করা হয়েছে।
গত বছর বিএসএফের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে আর ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মারা যান। ওই একই বছর আহত হয়েছেন ৩৮ জন। আটক করা হয়েছে ১৪ জনকে, যাদের মধ্যে মাত্র ৪ জন পরে দেশে ফিরতে পেরেছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, এর আগের বছর (২০২৪) সীমান্তে ৩০ জন বাংলাদেশি নিহত হন, যাঁদের ২৫ জনই ছিলেন গুলির শিকার। এছাড়া ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২১ সালে ১৬ জন বাংলাদেশি সীমান্তে প্রাণ হারান। এর বাইরে অসংখ্য মানুষ আহত বা আটকের শিকার হয়েছেন। আসক-এর মতে, এসব মৃত্যুর সিংহভাগই ঘটেছে বিএসএফের সরাসরি গুলিতে বা মারধরে।
সীমান্তে এই হত্যাযজ্ঞ একাধিক আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। ‘ইন্টারন্যাশনাল কভনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’ (আইসিসিপিআর)-এর ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে মানুষের জীবনের সহজাত অধিকার রক্ষা এবং বিচারবহির্ভূত বা খেয়ালখুশি মতো জীবন কেড়ে নেওয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, ‘প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতার নীতি মানতে হবে।’
এছাড়া আইসিসিপিআর-এর ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্যাতন এবং অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবার জাতিসংঘের ‘নির্যাতন বিরোধী সনদে’র ২ ও ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রগুলো যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার প্রতিরোধ করতে বাধ্য।
আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে জাতিসংঘের মৌলিক নীতিমালা (অনুচ্ছেদ ৪, ৫ ও ৬) বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলপ্রয়োগের আগে অবশ্যই অহিংস পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। যখন জীবন বাঁচাতে আর কোনো বিকল্প থাকবে না, আগ্নেয়াস্ত্র কেবল তখনই ব্যবহার করা যাবে।
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’: একতরফা সহিংসতা
ওপরের পরিসংখ্যানগুলো দেখে মনে হতে পারে এটি কেবল বাংলাদেশের একতরফা বর্ণনা। বাংলাদেশের হাতে ভারতীয় নাগরিকদের অবস্থার বয়ান সেখানে অনুপস্থিত। আসলে উল্লেখ করবার মতো কিছু নেই। অর্থাৎ বিজিবির গুলিতে ভারতীয় নাগরিক নিহতের তেমন কোনো তুলনামূলক রেকর্ড নেই।
ভারতীয় দুটি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ (২০১২) এবং ‘ইকোনমিক টাইমস’ (২০১৫) বিজিবির গুলিতে দুজন ভারতীয় বেসামরিক নাগরিক নিহতের খবর প্রকাশ করেছিল। এই দুটি বিচ্ছিন্ন প্রতিবেদন ছাড়া ভারতীয় নাগরিক নিহতের আর কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
এমনকি এই তথ্যগুলো যদি সঠিকও ধরা হয়, তবে ‘অধিকার’ ও ‘সাফরান’-এর দেওয়া বিগত ১৫ বছরে (২০২৫ পর্যন্ত) নিহত ৫৩৪ জন বাংলাদেশি কিংবা ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিএসএফের গুলিতে নিহত ১ হাজার ২৩৬ জন বাংলাদেশির সংখ্যার কাছে তা নগণ্য।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক (২০১৬-২০১৯)। তিনি তাঁর মেয়াদে আগের ঝুলে থাকা মামলাগুলোও পর্যালোচনা করেছিলেন। তিনি জানান যে ওই দুটি প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিজিবির হাতে ভারতীয় নাগরিক নিহতের বিষয়ে তিনি অবগত নন।
দুই সীমান্ত বাহিনীর এই ব্যাপক সংঘাতের পার্থক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নেই। তবে বাংলাদেশ পতাকা বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। এই বৈঠক সাধারণত সীমান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা যখন কোনো ভারতীয় নাগরিককে আটক করলে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বা এমনকি তার আগেই তাঁদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করি। কিন্তু বাংলাদেশিরা নিহত হওয়ার পর বিএসএফ সাধারণত দাবি করে যে, তাদের সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে অথবা তারা মাদক চোরাকারবারিদের লক্ষ্য করে গুলি করেছে।’
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ-আল-মঞ্জুর হোসেন ‘স্ট্রিম’-কে বলেন, ‘ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড চালায় মূলত বাংলাদেশকে ভয় দেখাতে। তারা দেখাতে চায় যে ভারত অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু এমন আচরণ আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের কর্মকাণ্ড একই সঙ্গে মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। সীমান্তে যদি কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা রাষ্ট্রের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো কর্মকাণ্ড না ঘটে, তবে কারও জীবন নেওয়ার অধিকার অন্য কারও নেই। এগুলো মূলত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়।’
সীমান্তে বারবার ঘটে চলা এই সংঘাতকে কেবল নিরাপত্তা বা সীমানা নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ঘটনার মূলে রয়েছে বর্জন, ভুল বোঝাবুঝি এবং বিচারহীনতার গভীর প্রাতিষ্ঠানিক এক সমস্যা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারান মো. আরাফ ‘স্ট্রিম’-কে বলেন, ‘সীমান্তে যেকোনো নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কোনো অজুহাতেই একে বৈধতা দেওয়া যায় না।’
তিনি আরও যোগ করেন, এই সহিংসতা আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি শেকড় গেড়ে বসা ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’র প্রতিফলন। এই বিচারহীনতায় নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে আইনি সুরক্ষা ও বিচার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। একে শুধু সীমানা দখলের লড়াই হিসেবে দেখাটা ঠিক হবে না। এটি আসলে এক ধরনের ‘বর্জনের রাজনীতি’র সঙ্গেও যুক্ত।
সাবেক মানবাধিকার চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের মতে, অনেক ক্ষেত্রে ভাষার বাধার কারণেও এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ‘সীমান্তে দায়িত্বরত অনেক বিএসএফ সদস্য ভাষার পার্থক্যের কারণে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারেন না। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ভুলবশত সীমান্তের কাছে চলে গেলে বিএসএফ সদস্যরা হয়তো মৌখিকভাবে সতর্ক করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই ভাষা না বোঝার কারণে নাগরিকরা তা বুঝতে পারেন না। এই যোগাযোগের অভাবও অনেক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
তিনি পরামর্শ দেন যে, সীমান্তে মোতায়েনকৃত সদস্যদের ওপারকার ভাষা সম্পর্কে অন্তত প্রাথমিক ধারণা থাকা উচিত। টেকসই কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে না।
পরিশেষে তিনি বলেন, বিষয়টি মূলত দুই দেশের সরকারের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় তারা এই সমস্যাটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলোচনার মাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি সমাধান করলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।