জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সংসদের প্রথম দিন

ঐকমত্যের উষ্ণতায় শুরু, স্লোগান–ওয়াকআউটে শেষ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সংসদ অধিবেশন। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকাল ছিল ঐকতানের। সরকারি-বিরোধী উভয় দলের মুখে হাসি, উষ্ণ শুভেচ্ছা, সব মিলিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক আশাব্যঞ্জক সূচনা। কিন্তু দিন গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে ফিরে আসে চেনা উত্তাপ, স্লোগান আর শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলের ওয়াকআউট।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিন আরও অনেক কারণেই ছিল ভিন্ন। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাধারণত সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার। তবে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পলাতক এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় কারাগারে থাকায় অধিবেশন শুরু হয় স্পিকারের শূন্য আসন নিয়ে।

বেলা ১১টা ৫ মিনিটে সরকার ও বিরোধী দলের ঐকমত্যে সিদ্ধান্ত আসে–অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন প্রবীণ রাজনীতিক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নাম প্রস্তাব করলে তাতে সমর্থন জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। দেশের অতীত রাজনীতিতে এমন দৃশ্য বিরল।

এরপর ড. মোশাররফের সভাপতিত্বে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার হন কায়সার কামাল। পরে সংসদ ভবনেই রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে তাঁদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার নতুন সদস্য হিসেবে শপথ নেন আহমেদ আযম খান।

আবেগ, শ্রদ্ধা ও জুলাইয়ের চেতনা

দুপুরে নামাজের বিরতির পর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদ আবার বসলে কক্ষে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, এটাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না।’

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পিকারকে ‘লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আজকের সংসদ জুলাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়ানো সংসদ। আপনার কাছে সরকারি ও বিরোধী দল আলাদা হবে না, আমরা শুধু ইনসাফ চাই।’

ঐকমত্যের এই আবহ আরও স্পষ্ট হয় শোক প্রস্তাব আলোচনায়। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী সদ্য প্রয়াত খালেদা জিয়া, হত্যার শিকার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করেন স্পিকার। পরে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেন সরকার দলীয় চিফ হুইপ। আবরার ফাহাদ ও ফেলানী খাতুনের নাম যুক্ত করার প্রস্তাব আসে বিরোধী দল। সব প্রস্তাবই গৃহীত হয় সর্বসম্মতিতে।

অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে ওয়াকআউট করেছেন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা
অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে ওয়াকআউট করেছেন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা

স্লোগান আর ওয়াকআউট

তবে বিকেলের অধিবেশনেই পাল্টে যায় সেই সৌহার্দ্যের পরিবেশ। সাড়ে ৪টার দিকে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকে ভাষণের জন্য স্পিকার আমন্ত্রণ জানালে শুরু হয় উত্তেজনা।

রাষ্ট্রপতির নাম ঘোষণার পর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। মাইক না পেয়ে তিনি উচ্চস্বরে বলেন, ‘কিলার ইন দ্য পার্লামেন্ট!’ মুহূর্তেই বিরোধী দলের সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে পড়েন।

তুমুল হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি স্পিকারের পাশে এসে দাঁড়ান। পরিস্থিতি তখন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু আপনি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন।’

বিরোধী বেঞ্চ থেকে তখন ‘লজ্জা, লজ্জা’, ‘গেট আউট’, ‘স্বৈরাচারের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’– এমন স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে। স্পিকার বারবার শান্ত থাকার আহ্বান সত্ত্বেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। একপর্যায়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ওয়াকআউটের ঘোষণা দিলে বিরোধী দলের সব সদস্য একযোগে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।

পরে বিরোধী দল ছাড়া সংসদেই রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন ভাষণ দেন। বক্তব্যে তিনি দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন।

বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে স্পিকার আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।

সব মিলিয়ে নতুন বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পা রাখল এক দ্বৈত বাস্তবতায়। যার শুরু ঐকমত্যের কোমলতায় শেষটি প্রতিবাদের তীব্রতায়।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত