জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

র‍্যাব ও ডিজিএফআই বিলুপ্তি চাইলেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং ‘আয়নাঘর’ সংস্কৃতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) বিলুপ্তি চেয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জবানবন্দিতে তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরেরও (ডিজিএফআই) বিলুপ্তি চান।

ইকবাল করিম বলেন, ‘আমি মনে করি, র‍্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার। সেটি সম্ভব না হলে র‍্যাব থেকে সেনা সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফেরত আনা হোক। আমি চাই, ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ এই সংগঠনটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার পর টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।’

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে অসমাপ্ত সাক্ষ্য দেন ইকবাল করিম। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী থেকে পেশাদার অফিসারদের র‍্যাবে পাঠানো হতো। অথচ সেখান থেকে তাঁরা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসতেন।’

এমনকি কিলিং মিশন শেষে মানসিক অনুশোচনা থেকে হত্যাকাণ্ডের বিনিময়ে পাওয়া টাকা মসজিদে দান করার মতো নজির জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

ইকবাল করিমের দাবি, সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি স্বাধীনতার পর থেকেই ছিল। তবে গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে উঠেছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। কথিত অপরাধীদের ধরে সেনাক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে, কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তা ছিল সীমিত।

র‍্যাব গঠনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে কখনো পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে র‍্যাব গঠনে। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনাসদস্যদের যে প্রশিক্ষণ, তা র‍্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না।’

তিনি ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ ও ইনডেমনিটির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে এই সংখ্যা ছিল ৬০ জন। পরে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়, যা ছিল হত্যার লাইসেন্স।’

সেনাবাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, অধিনায়কদের মনে চাপ থাকে তাদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার। কারণ তাদের প্রশিক্ষণ “এক গুলি, এক শত্রু” নীতির ওপর পরিচালিত।’

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘প্রশিক্ষণকালে সেনা সদস্যদের ডিহিউম্যানাইজেশন (অমানবিকীকরণ) করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়, মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে।’

চারটি ভয়ংকর নেক্সাস ও সুপার চিফ

জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা দেশ ও প্রশাসনের ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের জন্য তার আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন।

তিনি বলেন, ‘মেজর জেনারেল সিদ্দিক অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব, এনটিএমসি ইত্যাদি সংস্থাগুলোকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।’

জবানবন্দিতে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গড়ে ওঠা চারটি নেক্সাস বা চক্রের কথা উল্লেখ করেন—অপরাধ চক্র, ডিপ স্টেট, কেনাকাটা চক্র এবং সামরিক প্রকৌশলী চক্র।

জিয়াউল আহসান ও বেনজীরের দৌরাত্ম্য

ইকবাল করিম ভূঁইয়া র‍্যাবের সাবেক এডিজি জিয়াউল আহসানের সঙ্গে তাঁর সংঘাতের বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ‘সেনাপ্রধান হওয়ার পর পরই আমি র‍্যাবের এডিজিকে ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি আরও বদলে যায় যখন বেনজীর আহমেদ র‍্যাবের ডিজি হয়ে আসেন। জিয়াউল আহসান আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করেন। তাঁকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চাপ আসে।’

হত্যাকাণ্ডের টাকা মসজিদে দান

জবানবন্দিতে তিনি তিনটি রোমহর্ষক ঘটনার উদাহরণ দেন। এর মধ্যে একটি ঘটনায় তিনি বলেন, ‘র‍্যাব থেকে ফেরা এক জুনিয়র অফিসার আমাকে জানায়, সে ছয়জনকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। প্রতি হত্যার জন্য সে ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছিল। মানসিক অনুশোচনা থেকে সেই টাকা সে গ্রামের মসজিদে দান করে দেয়।’

আরেকটি ঘটনায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং বিষ্ঠা খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট?’ উত্তরে ওই কর্মকর্তা “হত্যা করা” বললেও কেন হত্যা করেছে—তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

‘র’ ও ডিজিএফআই কানেকশন

আজকের জবানবন্দিতে তিনি অভিযোগ করেন, মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্রছায়ায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করতেন এবং সেখানে কাজ করতেন।

জবানবন্দি শেষে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকে জনাব ইকবাল করিম ভূঁইয়া যে সমস্ত বিষয়াদি বলেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি র‍্যাব ও ডিজিএফআইয়ের বিলুপ্তি চেয়েছেন। কারণ এই কলঙ্কের দায় নিয়ে এই বাহিনী দুটো বেশি দূর অগ্রসর হতে পারবে না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেননি, বরং সেনাবাহিনী যেভাবে কলঙ্কযুক্ত হয়েছে, সেই গৌরব পুনরুদ্ধারের কথাই বলেছেন।’

উল্লেখ্য, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে। যার মধ্যে গাজীপুরে ৩ জন এবং বরগুনা ও বাগেরহাটে কথিত বনদস্যু দমনের নামে ১০০ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ মামলার সাক্ষীর জেরা আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত