leadT1ad

উপনিবেশের ভাষায় জ্ঞান ও ক্ষমতার রাজনীতি, কীভাবে ঘটে ভাষার মুক্তি

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে শাসকগোষ্ঠী ভাষার মাধ্যমে কীভাবে কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায় এবং শোষিত জনগোষ্ঠী কীভাবে ভাষাকেই প্রতিরোধের হাতিয়ার করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে উপনিবেশের ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে।

সামিয়া রহমান
সামিয়া রহমান

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ২২
উপনিবেশের ভাষায় জ্ঞান ও ক্ষমতার রাজনীতি। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

ফেব্রুয়ারি মাস বাঙালির কাছে ভাষার জন্য রক্তদানের স্মৃতি, আত্মপরিচয়ের দাবি এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার প্রতীক। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা কখনোই নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ভাষা ক্ষমতা, রাজনীতি ও আধিপত্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে শাসকগোষ্ঠী ভাষার মাধ্যমে কীভাবে কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায় এবং শোষিত জনগোষ্ঠী কীভাবে ভাষাকেই প্রতিরোধের হাতিয়ার করে তোলে।

এই প্রেক্ষাপটে উপনিবেশের ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসে। ঔপনিবেশিক শাসন শুধু ভূখণ্ড দখলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ফেব্রুয়ারির ভাষা-সচেতনতার আলোয় দাঁড়িয়ে উপনিবেশের ভাষা নিয়ে পুনর্বিচার করা মানে ইতিহাসের সেই ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করা যেখানে ভাষা ছিল শাসনের অন্যতম সূক্ষ্ম অথচ শক্তিশালী অস্ত্র।

ভাষা হলো স্মৃতি, ইতিহাস ও কল্পনার ধারক। যখন একটি জনগোষ্ঠী নিজের ভাষায় গল্প বলতে পারে না, তখন সে নিজের ইতিহাসও নিজের মতো করে ভাবতে পারে না। তাই উপনিবেশকরা প্রথমেই উপনিবেশিতের ভাষাকে দখল করেছে। উপনিবেশবাদকে সাধারণত সামরিক দখল, অর্থনৈতিক শোষণ কিংবা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু উপনিবেশবাদ তার সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে মানুষের চিন্তার কাঠামোর ওপর, আর এই কাঠামো নির্মাণের প্রধান মাধ্যম ছিল ভাষা।

ভাষার সঙ্গে সঙ্গে উপনিবেশিত মানুষ উপনিবেশকের মূল্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ এবং আত্মমূল্যায়নের মানদণ্ডকেও আত্মস্থ করে। ফলে কৃষ্ণাঙ্গ বা উপনিবেশিত মানুষ নিজেকে দেখতে শেখে উপনিবেশকের চোখ দিয়ে।

ভাষা কেবল যোগাযোগের প্রযুক্তি নয়, এটি বাস্তবতাকে বোঝার উপায়, জ্ঞান উৎপাদনের মাধ্যম এবং আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র। ফলে উপনিবেশ যখন একটি জনগোষ্ঠীর ভাষাকে দমিয়ে দেয় বা অবমূল্যায়িত করে, তখন সে আসলে সেই জনগোষ্ঠীর চিন্তার স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করে। বাংলা ভাষা ও আফ্রিকার বিভিন্ন ভাষার অভিজ্ঞতা এই সত্যকে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, কিন্তু প্রায় একই কাঠামোগত যুক্তিতে উন্মোচিত করে। এডওয়ার্ড সাইদের ভাষায়, উপনিবেশবাদ ছিল ‘a structure of knowledge and power’ যেখানে ভাষা জ্ঞান উৎপাদনের বৈধ মাধ্যম হিসেবে নির্ধারিত হয়। ফলে উপনিবেশের ভাষা হয়ে ওঠে ক্ষমতার ভাষা, আর স্থানীয় ভাষাগুলোকে ঠেলে দেওয়া হয় প্রান্তিকতা, নৈঃশব্দ্য ও অবৈধতার দিকে।

গ্রামসির হেজেমনির ধারণায় এই প্রক্রিয়ায় আধিপত্য কেবল রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সাংস্কৃতিক সম্মতির মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়। ঔপনিবেশিক ভাষানীতি এই সম্মতি উৎপাদনের একটি প্রধান মাধ্যম। যখন উপনিবেশিত সমাজ নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের ভাষা ‘অপরিণত’ এবং উপনিবেশকের ভাষাই জ্ঞান, উন্নয়ন ও আধুনিকতার একমাত্র বাহন, তখন ভাষাগত আধিপত্য স্বাভাবিক ও প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে। বাংলা ও আফ্রিকার ভাষাগত অভিজ্ঞতা এই হেজেমনিক প্রক্রিয়ার দুটি ভিন্ন কিন্তু কাঠামোগতভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ রূপ।

ঔপনিবেশিক ভাষানীতির মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক সুবিধা ছাড়াও জ্ঞান ও ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ইউরোপীয় উপনিবেশকরা খুব সচেতনভাবেই স্থানীয় ভাষাগুলোকে ‘অপর্যাপ্ত’, ‘অবৈজ্ঞানিক’ বা ‘অসভ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর বিপরীতে ইংরেজি, ফরাসি বা পর্তুগিজ ভাষাকে যুক্তি, বিজ্ঞান ও আধুনিকতার বাহন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই দ্বৈত নির্মাণের মাধ্যমে উপনিবেশকরা একটি ভাষাগত শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে, যেখানে ভাষা হয়ে ওঠে সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণের প্রধান সূচক। যে ভাষায় রাষ্ট্র কথা বলে, সেই ভাষাতেই ক্ষমতা বাস করে, এটি ঔপনিবেশিক বাস্তবতার অন্যতম মৌলিক সূত্র।

ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষত বাংলায়, এই ভাষাগত উপনিবেশায়ন ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। লর্ড ম্যাকলের শিক্ষা-নীতি ইংরেজি শিক্ষার প্রসারই ঘটায়নি; এটি একটি নতুন মানসিক শ্রেণি তৈরি করেছিল, যারা নিজেদের সমাজের চেয়ে উপনিবেশকের জ্ঞান ব্যবস্থার সঙ্গে বেশি সংযুক্ত ছিল। ইংরেজি হয়ে ওঠে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতার ভাষা, আর বাংলা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় আবেগ, সাহিত্য ও ঘরোয়া পরিসরে। ফলে বাংলা ভাষায় চিন্তা করা মানুষ ক্রমশই নিজেকে আধুনিক জ্ঞানচর্চার বাইরে ভাবতে শুরু করে। এটি ছিল ভাষার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস হরণের এক সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া। এই প্রেক্ষাপটে ফ্রাঞ্জ ফ্যানন তাঁর Black Skin, White Masks গ্রন্থে দেখান যে ভাষা গ্রহণের অর্থ কেবল নতুন শব্দ শেখা নয়, এর ফলে একটি সম্পূর্ণ মানসিক জগত আত্মস্থ করা হয়ে যায়। তাঁর মতে, “To speak a language is to take on a world, a culture.” উপনিবেশকের ভাষায় কথা বলার মধ্য দিয়ে উপনিবেশিত মানুষ উপনিবেশকের দৃষ্টিভঙ্গিকেই নিজের করে নেয়।

বাংলার ক্ষেত্রে ইংরেজি শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে এই মানসিক দ্বৈততা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যেখানে তারা সাংস্কৃতিকভাবে দেশীয় হলেও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে উপনিবেশকের সঙ্গে যুক্ত। একদিকে বাংলা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে অবমূল্যায়িত একটি ভাষা, অন্যদিকে এটি নিজেই একটি প্রভাবশালী ভাষা হিসেবে অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষাকে ছাপিয়ে গেছে। এই বাস্তবতা আমাদের দেখায় যে ভাষাগত নিপীড়ন কোনো সরল দ্বিমাত্রিক সম্পর্ক নয়; এটি স্তরবিন্যস্ত এবং অভ্যন্তরীণ উপনিবেশও তৈরি করে। তবু ইংরেজির সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ছিল স্পষ্টতই অসম ক্ষমতার সম্পর্ক, যেখানে ইংরেজি ছিল রাষ্ট্র, জ্ঞান ও ভবিষ্যতের ভাষা।

আফ্রিকার ভাষাগত অভিজ্ঞতা এই একই কাঠামোর আরও নগ্ন ও বিস্তৃত রূপ প্রকাশ করে। আফ্রিকা ছিল ভাষাগত বৈচিত্র্যের এক বিশাল ভাণ্ডার, কিন্তু উপনিবেশবাদ এই বৈচিত্র্যকে সমস্যা হিসেবে দেখেছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষাকে গোটা অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়। এর ফলে আফ্রিকার অধিকাংশ মানুষ রাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলার ভাষাটিই বুঝত না। রাষ্ট্র হয়ে ওঠে একটি বিদেশি ভাষায় কথা বলা দূরবর্তী সত্তা।

ঔপনিবেশিক ভাষানীতির মূল লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক সুবিধা ছাড়াও জ্ঞান ও ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ইউরোপীয় উপনিবেশকরা খুব সচেতনভাবেই স্থানীয় ভাষাগুলোকে ‘অপর্যাপ্ত’, ‘অবৈজ্ঞানিক’ বা ‘অসভ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর বিপরীতে ইংরেজি, ফরাসি বা পর্তুগিজ ভাষাকে যুক্তি, বিজ্ঞান ও আধুনিকতার বাহন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

নগুগি ওয়া থিয়োংগো এই বাস্তবতাকে মানসিক উপনিবেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, ভাষা দখলের অর্থ হলো কল্পনার দখল। যখন একটি শিশু তার নিজের ভাষায় নয়, বরং উপনিবেশকের ভাষায় বিশ্বকে চিনতে শেখে, তখন সে নিজের সংস্কৃতিকে অজান্তেই নিম্নতর হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। নগুগির ইংরেজি বর্জন করে গিকুয়ু ভাষায় লেখার সিদ্ধান্ত ছিল সাহিত্যিক কৌশলের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক জ্ঞান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মৌলিক রাজনৈতিক অবস্থান।

নাইজেরিয়া ঔপনিবেশিক ভাষানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো ইয়োরুবা, ইগবো ও হাউসা এই তিন বৃহৎ ভাষার পাশাপাশি শতাধিক স্থানীয় ভাষা থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এর ফলে ভাষা হয়ে ওঠে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার দূরত্বের প্রতীক। ইংরেজি দক্ষতা এখানে সামাজিক পুঁজি, যা শ্রেণিভেদ আরও গভীর করে। আলজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশবাদ ভাষাকে ব্যবহার করেছিল সরাসরি সাংস্কৃতিক দখলের হাতিয়ার হিসেবে। ফরাসি ভাষা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আরবি ও বারবার ভাষাকে প্রান্তিক করা হয়। ফ্যাননের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ভাষানীতি আলজেরীয় সমাজে গভীর আত্মবিচ্ছিন্নতা তৈরি করে ফলে সেখানে ভাষা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আনুগত্যের চিহ্ন।

ভাষার সঙ্গে সঙ্গে উপনিবেশিত মানুষ উপনিবেশকের মূল্যবোধ, সৌন্দর্যবোধ এবং আত্মমূল্যায়নের মানদণ্ডকেও আত্মস্থ করে। ফলে কৃষ্ণাঙ্গ বা উপনিবেশিত মানুষ নিজেকে দেখতে শেখে উপনিবেশকের চোখ দিয়ে। এই আত্মবিচ্ছিন্নতাই উপনিবেশের সবচেয়ে স্থায়ী ক্ষত।

এই অসমতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন একটি মৌলিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে শুধু সাংস্কৃতিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক গভীরতা অনুধাবন করা যায় না। এটি ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতার পুনরুৎপাদনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ। পাকিস্তানি রাষ্ট্র উর্দুকে যে কর্তৃত্বমূলকভাবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তা ছিল ভাষার মাধ্যমে কৃত্রিম জাতীয় পরিচয় নির্মাণের প্রচেষ্টা। বাংলাদেশকে প্রায়শই একটি ‘ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে ভাষা আন্দোলন ও ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ রাষ্ট্রগঠনের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এই বর্ণনা যতটা গৌরবময়, বাস্তব ভাষানীতির কাঠামো ততটাই দ্বন্দ্বপূর্ণ। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও রাষ্ট্রের জ্ঞান-উৎপাদন, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুযোগের কেন্দ্র থেকে বাংলা ক্রমাগত সরে গেছে।

এই বৈপরীত্য বোঝার জন্য ভাষাকে কেবল সাংবিধানিক মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষিত হলেও, সংবিধান একই সঙ্গে ইংরেজিকে কার্যত বিকল্প ক্ষমতার ভাষা হিসেবে রেখে দেয়। উচ্চ আদালতের রায়, আন্তর্জাতিক চুক্তি, করপোরেট আইন ও উচ্চশিক্ষার বড় অংশ এখনও ইংরেজিনির্ভর। রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে স্বীকৃতি দিলেও কার্যকর ক্ষমতার ক্ষেত্রগুলোতে ইংরেজির আধিপত্য বজায় রেখে একটি দ্বৈত ভাষাগত কাঠামো তৈরি করেছে। এই দ্বৈততা সাধারণ নাগরিকের কাছে ‘স্বাভাবিক’ বলে প্রতীয়মান হয়, ফলে ভাষাগত বৈষম্য প্রশ্নাতীত থেকে যায়।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই হেজেমনির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলা মাধ্যম থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি হয়ে ওঠে এক ধরনের গেটকিপিং মেকানিজম। ইংরেজি মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সন শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক পুঁজি উৎপাদনের প্রধান যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এখানে ভাষা কেবল দক্ষতার বিষয় নয়; এটি শ্রেণিগত অবস্থান নির্ধারণের সূচক হিসেবেও কাজ করে। ফ্যাননের ভাষায়, ইংরেজি দক্ষতা এখানে ‘মানসিক ঔপনিবেশিকতা’-র প্রতীক, যেখানে ইংরেজিতে সাবলীলতা আত্মমূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষাকে শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু খুব দ্রুতই একটি দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে, বাংলা মাধ্যম এবং ইংরেজি মাধ্যম। এই বিভাজন শুধুই পাঠদানের ক্ষেত্রে ভাষার পার্থক্য নয়; এটি দুটি ভিন্ন সামাজিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাঠামো। বাংলা মাধ্যম শিক্ষা মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জন্য, আর ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ক্রমশ শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির জন্য সামাজিক পুঁজি অর্জনের পথ হয়ে ওঠে।

গ্রামসির হেজেমনির ধারণা অনুযায়ী, এখানেই ভাষাগত আধিপত্য নতুন রূপ নেয়। তখন ইংরেজি আর সরাসরি উপনিবেশকের ভাষা না থেকে ‘গ্লোবাল কম্পিটেন্স’ এর ভাষা হিসেবে স্বাভাবিকীকৃত হয়। এই প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষা একটি দ্বন্দ্বপূর্ণ অবস্থানে পড়ে। একদিকে এটি রাষ্ট্রভাষা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক; অন্যদিকে এটি আধুনিক জ্ঞান ও বৈশ্বিক সুযোগের ভাষা হিসেবে অপ্রতুল বলে চিহ্নিত হয়। শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই শিক্ষার্থীরা শিখে নেয় যে বাংলায় দক্ষতা সামাজিক মর্যাদা দেয় না, কিন্তু ইংরেজিতে দক্ষতা ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই সংকট আরও গভীর। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা মাধ্যমে পাঠদান হলেও পাঠ্যবই, রেফারেন্স এবং গবেষণা কার্যত ইংরেজিনির্ভর। ফলে বাংলা ভাষা জ্ঞান উৎপাদনের ভাষা হিসেবে পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। এটি নগুগি ওয়া থিয়োংগা’র ভাষায় একটি ‘arrested decolonization’, যেখানে ভাষাগত মুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলেও জ্ঞানতাত্ত্বিক স্তরে তা বাস্তবায়িত হয় না। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও একই চিত্র দেখা যায়। সরকারি নথিপত্র বাংলায় লেখা হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইংরেজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষত উন্নয়ন প্রকল্প, বৈদেশিক ঋণ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে। এর ফলে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র সাধারণ নাগরিকের ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সাইদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এক ধরনের ‘আত্ম-উপনিবেশায়ন’, যেখানে রাষ্ট্র নিজ জনগোষ্ঠীকেই একটি ভাষাগত দূরত্বে স্থাপন করে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভাষা একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। করপোরেট সেক্টর, বহুজাতিক কোম্পানি এবং এনজিও কাঠামোতে ইংরেজি প্রায় একচেটিয়া ভাষা। ফলে গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী, যারা বাংলায় দক্ষ কিন্তু ইংরেজিতে নয়, তারা কাঠামোগতভাবে এই সুযোগগুলো থেকে বাদ পড়ে। ভাষা এখানে সরাসরি অর্থনৈতিক বৈষম্য উৎপাদন করে। এটি ঔপনিবেশিক ভাষানীতিরই নতুন রূপ, যেখানে ইংরেজি আধুনিকতা ও পেশাদারিত্বের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা এই বৈষম্যকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো আন্তর্জাতিক কারিকুলাম, বিদেশি পরীক্ষাবোর্ড এবং পশ্চিমা একাডেমিক সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে এই শিক্ষাব্যবস্থা সরাসরি বৈশ্বিক পুঁজির সঙ্গেই যুক্ত হয়। বাংলা মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা সেই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগ থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন থাকে। ভাষা এখানে আর নিরপেক্ষ না থেকে শ্রেণি পুনরুৎপাদনের প্রধান যন্ত্র হিসেবে পরিগণিত হয়, ফলে নিজের সমাজের ভেতরেই ভাষার ভিত্তিতে কেন্দ্র ও প্রান্ত তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে যে, বাংলা ভাষার বি-উপনিবেশায়ন কি আদৌ সম্পন্ন হয়েছে? যদি বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে, আর ক্ষমতা ও জ্ঞানের স্তরে ইংরেজি আধিপত্য বজায় রাখে, তবে সেই বি-উপনিবেশায়ন কেবল প্রতীকী। প্রকৃত বি-উপনিবেশায়ন মানে হবে বাংলাকে বিজ্ঞানের ভাষা, গবেষণার ভাষা এবং উচ্চশিক্ষার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা। এটি কোনো আবেগি জাতীয়তাবাদী প্রকল্প নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক সংগ্রাম।

বাংলা ভাষার বি-উপনিবেশায়ন তাই শিক্ষা সংস্কার ছাড়া অসম্ভব। একদিকে ইংরেজিকে সম্পূর্ণ বর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়, অন্যদিকে ইংরেজিকে শ্রেষ্ঠত্বের ভাষা হিসেবে রেখে বাংলা মাধ্যম শিক্ষাকে দুর্বল করে রাখাও ঔপনিবেশিক যুক্তিরই পুনরাবৃত্তি। প্রয়োজন একটি বহুভাষিক কিন্তু অসমতাবিহীন শিক্ষানীতি, যেখানে বাংলা হবে জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্রীয় ভাষা এবং ইংরেজি হবে সহায়ক ভাষা কোনোভাবেই ক্ষমতার প্রতীক নয়।

বাংলাদেশের ভাষানীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায় অনালোচিত দিক হলো ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘আদিবাসী’ ও ‘সংখ্যালঘু’ ভাষার অবস্থান। সংবিধানে এসব ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দুর্বল, এবং শিক্ষা ও প্রশাসনে তাদের কার্যত কোনো জায়গা নেই। এখানে বাংলা নিজেই একটি ক্ষমতার ভাষায় পরিণত হয়, যা দেখায় যে ভাষাগত আধিপত্য কেবল ঔপনিবেশক বনাম উপনিবেশিত সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের ভেতরেও পুনরুৎপাদিত হয়। এই ক্ষমতার কেন্দ্র-প্রান্তের বহু বাস্তবতা আধিপত্যবাদকে আরও জটিল করে তোলে।

ভাষা আন্দোলনের আদর্শ ও বর্তমান ভাষানীতির এই বৈপরীত্য আমাদের বাধ্য করে প্রশ্ন তুলতে যে ভাষাগত মুক্তি আসলে কী? যদি ভাষা কেবল প্রতীকী মর্যাদা পায়, কিন্তু জ্ঞান, অর্থনীতি ও ক্ষমতার ভাষা না হয়, তবে সেই মুক্তি কতটা বাস্তব? ফ্যাননের ভাষায়, এটি তখন হয়ে দাঁড়ায় ‘formal decolonization without mental liberation’।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভাষানীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন স্পষ্ট। ভাষার ডিকলোনাইজেশন মানে ইংরেজির বর্জন নয়, বরং বাংলাকে জ্ঞান উৎপাদনের পূর্ণ সক্ষম ভাষা হিসেবে গড়ে তোলা। উচ্চশিক্ষায় মানসম্পন্ন বাংলা পাঠ্যপুস্তক, গবেষণায় বাংলা প্রকাশনার স্বীকৃতি, এবং প্রশাসনে বাংলার কার্যকর প্রয়োগ। এসব ছাড়া ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বাস্তব রূপ পায় না।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ একটি অনন্য উদাহরণ যেখানে ভাষা রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে ভাষাগত উপনিবেশের কাঠামো নতুন রূপে টিকে আছে। এই দ্বন্দ্ব বোঝা ছাড়া উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রে ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্ক অনুধাবন অসম্ভব। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ তাই কেবল সাংস্কৃতিক আবেগের প্রশ্ন নয়; এটি জ্ঞান, রাষ্ট্র ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইংরেজির আধিপত্য এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইংরেজি এখন আর শুধুই উপনিবেশকের ভাষা নয়; এটি বিশ্ববাজার, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা। কিন্তু এই গ্লোবাল অবস্থানও নিরপেক্ষ নয়। ইংরেজি দক্ষতা আজও সামাজিক শ্রেণি, শিক্ষা ও সুযোগের বিভাজন তৈরি করে। ফলে ঔপনিবেশিক ভাষানীতির ছায়া নতুন রূপে টিকে থাকে।

এই বাস্তবতায় ভাষার বি-উপনিবেশায়ন মানে ইউরোপীয় ভাষা প্রত্যাখ্যান নয়, এর অর্থ হলো নিজের ভাষাকে জ্ঞান উৎপাদনের পূর্ণ সক্ষম বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষা, বিজ্ঞান, দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার ভাষা হিসেবে বাংলা বা আফ্রিকার ভাষাগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার না করতে পারলে ভাষাগত স্বাধীনতা কেবল প্রতীকী হয়েই থাকবে। উপনিবেশের ভাষা অতীতের কোনো বন্ধ অধ্যায় নয়, এটি বর্তমানের নয়া-উপনিবেশবাদের চলমান বন্দোবস্ত। বাংলা ভাষা ও আফ্রিকার ভাষাগত সংগ্রাম আমাদের শেখায় যে ভাষা ছাড়া মুক্তি অসম্পূর্ণ। রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ নিজের ভাষায় চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে। ভাষার মুক্তিই তাই উপনিবেশোত্তর সমাজে নয়া-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে মৌলিক ও চলমান সংগ্রাম।

লেখক: প্রাবন্ধিক; শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250

সম্পর্কিত