জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

জন্মদিনে স্মরণ

দস্তয়েভস্কি কি আজকের দুনিয়াকে আগেই চিনে ফেলেছিলেন

আজ ফিওদর দস্তয়েভস্কির মৃত্যুদিন। প্রকাশের দেড়শ বছর পরও দস্তয়েভস্কির লেখা আজকের মানুষের সংকট সম্পর্কে ঠিক ততটাই সত্য কথা বলে, যতটা বলে আধুনিক জিনতত্ত্বের কোনো বই। এই লেখাগুলো দেখিয়ে দেয় যে শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি অনেক সময় ভবিষ্যৎকে আগেই দেখতে পায়।

লেখা:
লেখা:
রিচার্ড হেরেট

দস্তয়েভস্কি কি আজকের দুনিয়াকে আগেই চিনে ফেলেছিলেন। সংগৃহীত ছবি

ফিওদর দস্তয়েভস্কির উপন্যাসগুলোর আবহ বিষাদময়। তবু সেই বিষণ্নতার গভীরে আছে রোমান্টিক অনুভূতির এক সূক্ষ্ম স্রোত। মানুষ কীভাবে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে চায়? এই লড়াই নিয়ে ভাবতে গিয়ে দস্তয়েভস্কির দর্শনের সঙ্গে জার্মান চিন্তাবিদ শিলারের ধারণার মিল পাওয়া যায়। শিলারের মতে, শিল্প মানুষকে স্বাভাবিকভাবেই সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার দিকে টানে। শিল্প শুধু বিনোদন নয়। শিল্প মানুষকে এক ধরনের পথ দেখানোর শক্তি হিসেবেও কাজ করে। শিল্প মানুষকে ‘ভালোর দিকে’ যেতে সাহায্য করে।

দস্তয়েভস্কি একবার লিখেছিলেন, ‘শিল্পের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, শিল্প যে সৌন্দর্যের ছবি তৈরি করে, মানুষ তা নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করে ফেলে। শিল্প মানুষের শরীর ও মনের জন্য অপরিহার্য। শিল্প মানে সামঞ্জস্য। আর এই সামঞ্জস্যের মধ্যেই শান্তির সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। শিল্প মানুষের এবং সমগ্র মানবজাতির আদর্শকে ধারণ করে।’

এই ভাবনাগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তার সঙ্গেও মিলে যায়। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, শিল্প কোনো দেশের গণ্ডিতে আটকে না থেকে মানুষকে কিছু সর্বজনীন নৈতিক বোধের দিকে নিয়ে যায়। ১৯১৩ সালের এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, মানুষকে সবচেয়ে বেশি এক করতে পারে এমন বিশুদ্ধ শিল্পমাধ্যম হলো সংগীত।

রবীন্দ্রনাথ ‘নিজ’ বা ‘আমি’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই ‘আমি’র সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক কী, সমাজের বৃহত্তর নৈতিক জগতের সঙ্গে তার যোগসূত্র কোথায়? দস্তয়েভস্কিও এই একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। সংস্কৃতি আর সময় আলাদা হলেও দুজনের প্রশ্ন ছিল প্রায় একই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঘরে বাইরে উপন্যাসে দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে কম তাকায় নিজের ভেতরে। সেই পরিচয় আসলে অনেক সময় বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই তৈরি হয়।

দস্তয়েভস্কি আর রবীন্দ্রনাথ—দুজনের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল এমন এক ধরনের ভালোবাসা যাক অনেক কিছুকে জড়িয়ে ধরে। যে ভালোবাসা মতভেদ আর ভিন্ন জীবনদর্শনের মাঝেও আত্মকেন্দ্রিকতা ছাড়িয়ে করুণার দিকে এগোয়। এই ভাবনা অনেকটা বৌদ্ধ দর্শনের মতো। প্রকৃত স্বাধীনতা কোনো নিখুঁত সামাজিক কাঠামো বা কঠিন মতাদর্শ থেকে আসে না। আসে মানুষের অন্তরের পরিবর্তন থেকে। পৃথিবীর অনেক যন্ত্রণার মূল উৎস হলো অহং, নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।

বিভক্ত নৈতিক মন

নৈতিকতা মানুষকে এক করতে পারে। এই একই শক্তি আবার তাঁকে অন্ধও করে দিতে পারে। আজকের দুনিয়ায় অহংকার ছাড়িয়ে ‘ভালো’র আদর্শে পৌঁছানোর কথা অনেকের কাছেই সেকেলে বা অতিসরল মনে হয়। বাস্তবে আমরা দেখি, রাজনীতি দিন দিন আরও বিভক্ত হচ্ছে। মানুষ নিজের গোষ্ঠী, পরিচয় আর মতাদর্শের গণ্ডির ভেতরেই আটকে পড়ছে।

দস্তয়েভস্কির ডেমনস উপন্যাস পরিচয়ভিত্তিক চিন্তার এই ভিত্তিই নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবু আজ আমরা দেখি, দলভিত্তিক রাজনীতি, অন্যকে বাদ দেওয়ার প্রবণতা, ভয় দেখানো আর একঘরে করে দেওয়ার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এসব জায়গায় দয়া, সহনশীলতা বা ক্ষমার কোনো জায়গা থাকে না। বিভাজনের দুই দিকেই চরমপন্থা দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো—তারা দেখতে পায় না যে তাদের মধ্যে মিল কোথায়? নিজ নিজ মতাদর্শের বলয়ে আটকা পড়লে সবার সঙ্গে কেবল নিজের পার্থক্যই চোখে পড়ে।

তবে মতাদর্শের বিপদ আছে বুঝেও দস্তয়েভস্কি নিজে সব সময় তার বাইরে থাকতে পারেননি। তাঁর কিছু লেখায় এক ধরনের ‘আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদ’-এর ছাপ পাওয়া যায়। সেগুলোর সঙ্গে একমত হওয়া কঠিন। কিন্তু কোনো লেখকের সব মত মেনে না নিয়েও তাঁর লেখার মূল্য বুঝতে অসুবিধা হয় না। দস্তয়েভস্কির ক্ষেত্রেও সেটাই সত্য।

সমাজের সংকট আসলে ‘ভালো মানুষ বনাম খারাপ মানুষ’-এর লড়াই নয়। দস্তয়েভস্কি তা বুঝেছিলেন। আমরা সবাই রক্ত-মাংসের মানুষ। প্রত্যেকের ভেতরেই ভালো আর খারাপের টানাপোড়েন চলে। তিনি ছিলেন গভীরভাবে নৈতিক চিন্তাবিদ। কেউ যদি মানবিক মর্যাদা আর নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার হারায় তাহলে কোনো সমাজেই প্রকৃত সাম্য আসতে পারে না। জীবনের নানা ধাক্কা খেয়ে তা বুঝেছিলেন।

একই সঙ্গে তিনি গোষ্ঠীচেতনা আর সামাজিক বন্ধনের ইতিবাচক দিকও স্বীকার করেছিলেন। দস্তয়েভস্কি মেনে নিয়েছিলেন যে মানুষ ভুল করে। তিনি মানতেন যে আমরা সবাই অসম্পূর্ণ। আমাদের ভেতরে যুক্তি আছে। আবার প্রবৃত্তিও আছে।

দস্তয়েভস্কি বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবে একই সঙ্গে ভয়ও পেয়েছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল—যদি বিজ্ঞানকে সব কিছুর একমাত্র মাপকাঠি বানালে মানুষ ধীরে ধীরে যন্ত্রে পরিণত হবে। হারিয়ে যাবে তার বহুমাত্রিকতা আর বিস্ময়কর সম্ভাবনা। দস্তয়েভস্কি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান আর মানববিদ্যা একে অন্যের কাছ থেকে শিখতে পারে। কিন্তু মানুষের প্রকৃতি পুরোপুরি বোঝা কখনোই সম্ভব হবে না। এই সীমাবদ্ধতাও তিনি মেনে নিয়েছিলেন। তাই মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের মতো জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন গল্প আর রূপকের।

মানুষ নিজেরই বিপরীতে এক ছুটে চলা

দস্তয়েভস্কির জন্মের দুইশ বছর পার হয়েছে। আজও তাঁকে অনেকেই মনে করেন এক আবেগী, স্পষ্টভাষী এবং সংশয়বাদী চিন্তক। তিনি সব রকমের ঘৃণা আর দমনকে অপছন্দ করতেন। নিজেও তিনি কখনো কখনো এমন বিশ্বাসের ফাঁদে পড়েছেন। তবু তিনি চেষ্টা করেছেন ব্যক্তিগত স্বার্থর জন্য মানুষকে ছোট ছোট পরিচয়ের খোপে আটকে ফেলার লোভ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে।

আজকের দুনিয়ায় মানুষ হাজার পাতার দস্তয়েভস্কি উপন্যাস পড়বে, এমনটা কল্পনা করা কঠিন। তবু এসব বই পড়া দরকার। কারণ দস্তয়েভস্কির লেখা গভীরভাবে বিষণ্তার মধ্যেও অদ্ভুতভাবে মানুষকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করে। তঁর বইগুলোর মধ্য দিয়েই তিনি মানব স্বাধীনতার সীমা পরীক্ষা করেছেন। কারাগারে বসে তিনি মানুষের সবচেয়ে অন্ধকার দিক দেখেছেন। আবার মুক্ত জীবনে এসে কষ্ট পেয়েছেন মানুষের গোঁড়ামি আর নিজের ক্ষতি নিজে ডেকে আনার প্রবণতা দেখে।

১৮৬৪ সালের ১৬ এপ্রিলের এক নোটবুকে তিনি লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীতে মানুষ নিজের প্রকৃতির বিপরীত আদর্শের দিকে ছোটে।’ এই কথাটাই দস্তয়েভস্কির কাছে হয়ে উঠেছিল মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। জীবনের শেষদিকে এসে তিনি মানুষকে শুধু মন্দ, অহংকার বা স্বার্থপরতার জন্য দোষ দেননি। দোষ দিয়েছেন সেই অনড় ধারণাগুলোর কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য, যেগুলো আমাদের যৌথ আদর্শ চোখের আড়াল করে দেয়। সেগুলোর দিকে এগোনোর ইচ্ছাটুকুও হারিয়ে যায়।

এক দার্শনিক বলেছিলেন, ‘কোনো কল্পকাহিনি যথেষ্ট জরুরি হয়ে উঠলে তা আর মিথ্যা থাকে না।’ প্রকাশের দেড়শ বছর পরও দস্তয়েভস্কির লেখা আজকের মানুষের সংকট সম্পর্কে ঠিক ততটাই সত্য কথা বলে, যতটা বলে আধুনিক জিনতত্ত্বের কোনো বই। এই লেখাগুলো দেখিয়ে দেয় যে শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি অনেক সময় ভবিষ্যৎকে আগেই দেখতে পায়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত