তুরাগ নদের ৩ লাশ, সরেজমিন যা জানা গেল

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাভার (ঢাকা)

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ০০: ০৯
২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ ছিলেন মো. সুমন। পরে তুরাগ নদে মেলে তাঁর লাশ। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী সংলগ্ন তুরাগ নদে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাতজনের লাশ ভাসছে– সামাজিক মাধ্যমে কয়েকদিন ধরে এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট থানা, নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্বজনের সঙ্গে কথা বলে তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে স্ট্রিম।

শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ‘তুরাগ নদে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মীর লাশ’ শিরোনামে সামাজিক মাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এই ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি পুলিশ অনুরোধ জানাচ্ছে।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে গাজীপুর মহানগর পুলিশও। কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত এই ধরনের অপপ্রচারে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন। একইসঙ্গে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।

সরেজমিন যেসব তথ্য জানা গেল

সামাজিক মাধ্যমে আসা তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে তুরাগ নদ সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক থানা এবং নৌ-পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম। উত্তরা ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের আওতাধীন তুরাগ থানা, বাউনিয়া ও বিরুলিয়া পর্যন্ত এলাকায় ২২ জুন থেকে শনিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনো লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি।

ডিএমপির রূপনগর থানার ওসি নোমান হোসেনও জানান, ২২ জুন থেকে শনিবার পর্যন্ত তুরাগ নদ থেকে কোনো লাশ উদ্ধারের ঘটনা তাদের কাছে নেই।

ডিএমপির দারুস সালাম থানার ওসি দুলাল হোসেন বলেন, নৌ-পুলিশ গত বুধবার (২৪ জুন) আরিফ হাসান রাকিব নামে একজনের লাশ উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় নিহতের চাচা আরশাদুল ইসলাম একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই হুমায়ুন কবির বলেন, শনিবার আরিফ নামের একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দুপুরে দিয়াবাড়ী ঘাটে কয়েকজন একসঙ্গে গোসলের সময় রনি নামের একজন ডুবে যান। অন্যরা ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর তাঁর লাশ পান। রনির মৃত্যুর ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

ডিএমপির তুরাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তুরাগ নদের আশুলিয়া থানা এলাকা থেকে ২২ জুনের পর একটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। ওইদিন মিছিল হয়েছিল, বেশ কিছু আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল, সবই হয়েছে আশুলিয়া থানা এলাকায়।

যাদের লাশ মিলেছে, কারা তাঁরা

রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা আরিফ হাসান রাকিব ২২ জুনের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাঁর লাশ তুরাগ নদে পাওয়া যায়। আরিফের চাচা আরশাদুল ইসলাম বলেন, ‘২২ জুন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয় আরিফ। ওইদিন বিকেল ৪টার একটু আগে মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল। গত বুধবার তুরাগ নদ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার হয়। সে যে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত, আমরা জানতাম না।’

তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর জানছি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা। আমরা জানি না কীভাবে সে মারা গেছে। মামলা করতে চাইনি। একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাই মামলা করছি। বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি রংপুরে রাকিবের লাশ দাফন করা হয়েছে। সাঁতার খুব একটা ভালো পারত না সে।’

রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা রনি মোল্লার (৩৫) মৃত্যুর ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রচারের সঙ্গে যুক্ত করার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। রনির বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘উত্তরার দিয়াবাড়ী এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন রনি। ২৪ জুন রনির মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি গোসল করার সময় সে ডুবে যায়। হোটেলের লোকজন জানিয়েছে– ওইদিন সকালে রনি হোটেল থেকে বের হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘রনির মানসিক একটু সমস্যা ছিল। যখন মন চাইতো এদিক-সেদিক চলে যেত। কোনো রাজনীতির সঙ্গে কখনোই জড়িত ছিল না।’

এদিকে, রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমনের বয়স ১৭ বছর। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি আর ফেরেননি। শুক্রবার আশুলিয়া থানা পুলিশ তুরাগ নদ থেকে তাঁর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে।

শনিবার দুপুরে রানাভোলায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের বাসার একটি কক্ষে সুমনের বাবা শাহ আলম, মা ও বোন বসে আছেন। ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা বাকরুদ্ধ। প্রশ্ন করেও জবাব মেলেনি। সুমন ২২ তারিখ থেকে নিখোঁজ ছিল কিনা– প্রশ্নেও কিছু বলেননি। স্বজনেরা কিছু জিজ্ঞেস না করতে অনুরোধ জানান।

নিখোঁজ ছিল– এতটুকু উত্তর দিয়ে স্বজনেরা জানান, শুক্রবার খবর পেয়ে তাঁরা লাশ নিয়ে আসেন। মোবাইল থেকে সুমনের সব ছবি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। বাসায় থাকা ছবিগুলোও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সুমনের মোবাইল ভেঙে ফেলা হয়েছে। সন্তান হারানোয় মানসিক যন্ত্রণা বাড়বে, তাই কোনো স্মৃতি রাখা হয়নি।

আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ২৫ জুন রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদের পাশের এক চক থেকে একজনের লাশ উদ্ধার করি। পরে স্বজনেরা লাশটি সুমনের শনাক্ত করেন। শুক্রবার এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন– ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হয়। পরে তুরাগ নদে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানত না। পরিবারের সদস্যরাও নদে খোঁজাখুজি করেছে। নদে একটি লাশের কথাই আমরা জানি। অন্য যেসব কথাবার্তা আসতেছে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত