লাশের পরিচয় শনাক্ত

ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন আফগান নাগরিক

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ঝিনাইদহ

হাশমত মোহাম্মাদি আফগানিস্তানের নাগরিক। সঙ্গে ইতালির পাসপোর্টধারী ছিলেন। ছবি: সংগৃহীত

ঝিনাইদহের মহেশপুরের পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার লাশের পরিচয় ৯ দিন পর মিলেছে। হাশমত মোহাম্মাদি আফগানিস্তানের নাগরিক। সঙ্গে ইতালির পাসপোর্টধারী ছিলেন তিনি। হাশমতের স্বজনের দাবি, ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢোকার সময় ইছামতী নদীতে হাশমতকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, সুরতহালের সময় তারা ধারণা করেছিলেন, লাশটি কোনো বিদেশির। সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেখে নিহতের ভাই ও ভাবী যোগাযোগ করেছেন। তারা হাশমত মোহাম্মদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার কথা বলেছেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বড় ভাই মোহাম্মদ ইরা জানিয়েছেন, হাশমত আফগানিস্তানের নাগরিকের পাশাপাশি ইতালির পাসপোর্টধারী ছিলেন। এই পাসপোর্টে সে নিয়মিত ভারতে যাতায়াত এবং বিভিন্ন আংটির পাথর ও রত্ন এনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করত। বছরপাঁচেক আগে ভারতীয় কয়েক ব্যবসায়িক পার্টনারের সঙ্গে গণ্ডগোলের জেরে হাশমতকে ভারতীয় পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

তিনি জানান, ভারতীয় আদালত হাশমতকে বেকসুর খালাস দিলেও ইতালি ফেরা আটকে রাখেন। জেল থেকে বের হয়ে ইতালি ফেরার পরিকল্পনা করতে থাকে। একপর্যায়ে ভারতের মানব পাচারকারী পুরাব হেলা এবং যশোরের মানব পাচারকারী মাসুমের সঙ্গে পরিচয় হয়। মাসুম তাঁকে পরামর্শ দেন– ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে গেলে, সেখান থেকে সে দ্রুত ইতালি যেতে পারবে। এরপর হাশমত গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়। ১১ ও ১২ এপ্রিল দুদফা কথা হয়।

মোহাম্মদ ইরা বলেন, সর্বশেষ ফোন কলে হাশমত আমাকে জানায়– সামনে একটি নদী (ইছামতি)। এটি পার হলেই সে বাংলাদেশে নিরাপদ হয়ে যাবে। এ সময় সীমান্তের মানব পাচারকারী মাসুম ও পুরাব হেলার সঙ্গেও আমি কথা বলি। এরপর ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাসুম এবং পুরাবের ফোনও বন্ধ পাই।

তিনি বলেন, কয়েকদিন পরে মাসুম ফোন করে দুটি ছবি পাঠিয়ে বলেন– ‘হাশমত মারা গেছেন। বাংলাদেশে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন’। এরপর থেকে মাসুমের ফোন বন্ধ। কাছে থাকা অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিতেই হাশমতকে নদীতে চুবিয়ে হত্যা করতে পারেন মাসুম ও পুরাব। আমি ভাই হত্যার বিচার চাই।

গত ২২ এপ্রিল মোহাম্মদ ইরা পূর্বপরিচিত বাংলাদেশি আহসান ও চৌগাছার এক সাংবাদিকদের সহযোগিতায় মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতানের সঙ্গে কথা বলে ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন। মোহাম্মদ ইরা জানান, তাঁর আরেক ভাই লন্ডনে থাকেন। বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন তারা।

গত ১৩ এপ্রিল মহেশপুর থানা পুলিশ ও বিজিবি মহেশপুর সীমান্তের পলিয়ানপুর এলাকার ইছামতী নদী থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে। পরে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে কিছু না পেলে, ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে স্থানীয় কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশটি দাফন করে। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতান জানান, গত ২২ এপ্রিল বগুড়ার আহসানের মাধ্যমে তিনি মোহাম্মাদ ইরার সঙ্গে কথা বললে লাশটি তাঁর ভাইয়ের বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। তাঁর লন্ডনপ্রবাসী আরেক ভাই বাংলাদেশে আসার জন্য ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন। অভিযুক্ত মাসুমের মোবাইল নম্বর পেয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সুরতহালে লাশের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এজন্য ঠিক কী কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়– লাশের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এখন পুলিশ তদন্তের মাধ্যমেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও রহস্য উদঘাটন করতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি। সীমান্তে পাচারকারী ও চোরাচালানিদের তৎপরতা বন্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। পাচারকারী চক্র অত্যন্ত সুসংগঠিত। স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন।

এর আগে গত ১৬ এপ্রিল একই সীমান্তের ইছামতী নদীর কচুরিপানার নিচ থেকে রতিকান্ত জয়ধর (৪৬) নামে বাংলাদেশির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। রতিকান্ত গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার বাসিন্দা। পকেটে থাকা বাংলাদেশি পাসপোর্টের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সম্পর্কিত