জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ব্রিটিশ এমপি রুপা হকের লেখা

বাংলাদেশে দরকার নতুন শুরু, আদৌ কি তা হবে

লেখা:
লেখা:
রুপা হক

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

‘জেনে খুশি হবেন, আমি পোস্টাল ভোট দিয়েছি’—বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের পর প্রথম নির্বাচনের আগে অফিসে এক সহকর্মী এমনটাই জানিয়েছেন। ২০২৪ সালে ওই আন্দোলনে শত শত ছাত্র নিহত হয়েছিল এবং শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। আগের কথাবার্তা থেকেই জানা ছিল, তার শিকড়ও আমার মতো বাংলাদেশে।

‘কাকে ভোট দিলেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম। ‘জামায়াতকে,’ তিনি বললেন। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইসলামপন্থীদের?’। তিনি উত্তর দিলেন, ‘একবার সুযোগ দিয়ে দেখাই যায়।’

একজন মানুষের মতামত পরিসংখ্যানগতভাবে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে ‘দুই পক্ষই খারাপ’—এমন মনোভাব আরও অনেকের ভেতর থাকলে ইসলামভিত্তিক দলটি বড় সাফল্য পেতে পারত। দলটি কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত আগের বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বড় জয় পায়।

এবারের নির্বাচনটি আর সেই ‘ব্যাটলিং বেগমস’ যুগের মতো ছিল না। নব্বইয়ের দশক থেকে দুই শাড়ি পরা নেত্রী পালা করে ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জীবিত নেই।

২০১৭ সালে সংসদীয় প্রতিনিধি দলে কাজ করার সময় আমি দুজনের সঙ্গেই দেখা করি। তখন শেখ হাসিনা ছিলেন পাকাপোক্তভাবে ক্ষমতায়। তাঁর দল আওয়ামী লীগ সংসদের ৯০ শতাংশ আসন দখল করে রেখেছিল। অন্যদিকে দুর্বল শরীরের খালেদা জিয়া তখন গৃহবন্দী। তাঁর দল বিএনপি আসন্ন নির্বাচন বর্জন করেছিল—কারচুপির অভিযোগে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে রুপা হকের লেখা
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে রুপা হকের লেখা

২০২৬ সালে এসে দেখা যায়, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল ছাত্রদের পছন্দে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে। সরকারটি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে দায়িত্ব নেয়। তবে ব্যালটের সঙ্গে সাংবিধানিক সংস্কারের গণভোটে ‘সব নয় তো কিছুই নয়’ ধরনের সিদ্ধান্ত কঠোর সমালোচনার জন্ম দেয়।

২০২৪ সালের আগস্টের ‘বর্ষা বিপ্লব’-এর এক ছাত্রনেতা ডিসেম্বরে খুন হন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। দেশটির ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর সম্পর্কে যাই ভাবা হোক না কেন, বার্মিংহাম সিক্সের সময়টা নিজে দেখে আসা একজন মানুষ হিসেবে আমার কাছে এটি ভুল বলেই মনে হয়।

প্রতিশোধের রাজনীতি আর ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার রক্তাক্ত স্মৃতি যেন বাংলার জাতীয় ঐতিহ্য। খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব নেন ১৯৮২ সালে। আর শেখ হাসিনা তার বাবার কাছ থেকে দল উত্তরাধিকার সূত্রে পান। তাঁর বাবা ছিলেন দেশের প্রথম নেতা, যাঁকে ১৯৭৫ সালে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর দল টানা তিন মেয়াদ ক্ষমতায় ছিল, শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হয়।

এই সময়টা হওয়া উচিত ছিল নতুন শুরুর—দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির পুরোনো রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার। কিন্তু খুব বেশি আশা করা ঠিক হবে না। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান এখন দলের উত্তরসূরি। শেখ হাসিনার আমলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নেওয়ার পর তিনি ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছেন।

এবারের নির্বাচনটি আর সেই ‘ব্যাটলিং বেগমস’ যুগের মতো ছিল না। নব্বইয়ের দশক থেকে দুই শাড়ি পরা নেত্রী পালা করে ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জীবিত নেই।

তারেক রহমানের ৩০ বছর বয়সী মেয়ে, কুইন মেরি কলেজের গ্র্যাজুয়েট, নির্বাচনে বাবার পক্ষে প্রচারণাও চালিয়েছেন।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা এক অডিও বার্তায় এই নির্বাচনকে ‘একতরফা প্রহসন’ এবং ইউনুস সরকারকে ‘অবৈধ’ বলেছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা ৫০ বছরের একটু বেশি। এই পুরোটা সময়ই প্রায় রক্তাক্ত পথচলা। একদিকে দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর ধসে পড়া পোশাক কারখানার দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে চেয়েছে। অন্যদিকে গুম, সাজানো নির্বাচন, সামরিক শাসন, হত্যা আর অভ্যুত্থান হয়ে উঠেছে নিয়মিত ঘটনা।

শেখ হাসিনা ‘কেয়ারটেকার ব্যবস্থা’ তুলে দেওয়ার পর একটি চক্র স্পষ্ট হয়। আগে নিরপেক্ষ বিচারকরা নির্বাচন তদারকি করতেন, কারণ দুই পরিবারের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস ছিল। এখন যে পক্ষ এগিয়ে থাকে, তারা অন্য পক্ষকে দুর্নীতির অভিযোগে নিষিদ্ধ বা জেলে পাঠায়। ফলে বিরোধীরা পরের নির্বাচন বর্জন করে। তারপর আবার একই ঘটনা।

যেহেতু তরুণরাই ‘বাংলাদেশ ২.০’ এর সূচনা করেছিল। যদি তাদের সংগ্রাম পুরোনো ধারার রাজনীতিই টিকিয়ে রাখে, সেটা হবে দুঃখজনক। ছাত্রদের গড়া নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়ে শুরুতে আশা ছিল। কিন্তু তারা আশ্চর্যজনকভাবে আগে নিষিদ্ধ থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্থবিরতা ও পরিবারতন্ত্রের ধারাকে চূড়ান্তভাবে ভাঙতে নতুন ও আনকোরা কিছুর আবির্ভাব জরুরি।

আশা করি, ‘পুরোনো অভ্যাস সহজে যায় না’—এই কথার আরেকটি উদাহরণ বাংলাদেশে তৈরি হবে না।

  • রুপা হক: যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য

টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন সার্জিল

Ad 300x250

সম্পর্কিত