ড. আলী রীয়াজের সাক্ষাৎকার
ড. আলী রীয়াজ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এর সহ-সভাপতি ছিলেন। ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, গণভোট, জুলাই সনদ, সংস্কারসহ নানা বিষয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
মুজাহিদুল ইসলাম

স্ট্রিম: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দুটি ম্যান্ডেটের একটি ছিল ‘সংস্কার’ এবং অন্যটি ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর’। নির্বাচন তো অনুষ্ঠিত হলো। এই দুটি লক্ষ্য অর্জনে সরকার কতটা সফল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, সরকারের পক্ষ থেকে একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের যে প্রতিশ্রুতি ও প্রচেষ্টা ছিল, তা সফল হয়েছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সামগ্রিকভাবে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন এবং প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পেরেছেন। বড় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তাই আমরা বলতেই পারি, একটি সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু একই সঙ্গে দুটি নির্বাচন (সংসদ ও গণভোট) ছিল, তাই চ্যালেঞ্জও বেশি ছিল; সেই বিবেচনায় এটি একটি বড় সাফল্য।
আর সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে গেলে, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই সরকারের মেয়াদে দেড় শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যা মূলত প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা একটি বড় পদক্ষেপ। পাশাপাশি, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এবং সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করা হয়েছে, যা জনগণের কাছে উপস্থাপন করে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতিও পাওয়া গেছে। এর ফলে সরকার শুধু নিজেরা সংস্কার পদক্ষেপ নেয়নি, বরং নির্বাচিত সরকারের জন্য জনগণের সম্মতি সম্বলিত সাংবিধানিক সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট এজেন্ডাও প্রস্তুত করে যাচ্ছে। এটি সরকারের একক বিষয় নয়, বরং সকলের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি। তাই এদিক থেকেও সরকার যথেষ্ট সাফল্যের দাবি করতে পারে বলে মনে করি।
স্ট্রিম: সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হলো। আমরা দেখেছি, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও ‘না’ ভোটও উল্লেখযোগ্য হারে পড়েছে। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে বিএনপির কিছু 'নোট অফ ডিসেন্ট' (ভিন্নমত) ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে তারাই আগামীতে সরকার গঠন করবে। সেক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয়, বিএনপি কি পুরো 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়ন করবে, নাকি তাদের ভিন্নমত বজায় রেখে বাস্তবায়ন করবে?
ড. আলী রীয়াজ: সব দলের ক্ষেত্রেই আমরা বারবার বলেছি, যেহেতু তারা এই সনদে স্বাক্ষর করেছেন, তাই নীতিগতভাবে তারা এটি মেনে নিয়েছেন। এখন যেহেতু 'জুলাই জাতীয় সনদ' জনগণের ভোটে অনুমোদিত হয়েছে, তাই যেই সরকার গঠন করুক, এটি বাস্তবায়ন করা তাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। বিএনপির ইশতেহারেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা আছে। দল হিসেবে তাদের কিছু ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং ইশতেহারে তার প্রতিফলনও ঘটেছে। তবে যেহেতু জনগণের সম্মতি পাওয়া গেছে, তাই আশা করি বিএনপি নিঃসন্দেহে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কারণ, এই ভোটাররাই তাদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করে দেশ শাসনের ম্যান্ডেট দিয়েছে।
অতীতেও বিএনপি বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯১ সালে তারা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার ম্যান্ডেট পেলেও জনগণের দাবির মুখে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিএনপি যথেষ্ট অভিযোজনক্ষম একটি দল। অর্থনৈতিক সংস্কারসহ বিভিন্ন সময়ে তাদের মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা আমরা দেখেছি। আমি আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে মতভিন্নতাগুলো তারা বিবেচনায় নেবে। সংস্কার এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দল এবং সিভিল সোসাইটিরও ভূমিকা থাকবে, কারণ অধিকাংশ মানুষ সংস্কার চায়।
স্ট্রিম: আপনি বলেছিলেন যে আগামী সংসদ গঠিত হওয়ার পর ১৮০ দিনের মধ্যে তা 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' হিসেবে কাজ করে সংবিধানের সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে। বিষয়টি আসলে কীভাবে কাজ করবে, যদি বিস্তারিত বলতেন?
ড. আলী রীয়াজ: 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ ২০২৫' অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে একটি প্রস্তাব ছিল যে, এই সংসদই 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' হিসেবে কাজ করবে। আমি স্পষ্ট করতে চাই—এটি 'গণপরিষদ' (কন্সটিটুয়েন্ট এ্যাসেম্বলি) নয়, এটি 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ'। গণপরিষদের যে গাঠনিক ক্ষমতা থাকে, সাধারণ সংসদের তা থাকে না; সংসদের থাকে কেবল সংশোধনী ক্ষমতা। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট 'বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন' বা মৌলিক কাঠামো মতবাদ একধিকবার ব্যবহার করে সংবিধানের সংশোধন বাতিল করেছে। তাই সংসদকে গাঠনিক ক্ষমতা দেওয়ার জন্যই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছে এবং জাতীয় সংসদকে একই সঙ্গে নির্ধারিরত সময়ের জন্যে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বলা হচ্ছে । জনগণ তা অনুমোদন করেছেন। ফলে, নির্বাচিত ৩০০ জন সংসদ সদস্যই সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' হিসেবে বসবেন এবং আগামী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবেন। এতে বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিনের কারণে সংস্কারগুলো আদালতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।
এই কাজটি সমান্তরালভাবে চলবে। অর্থাৎ, জাতীয় সংসদ প্রথম দিন থেকেই তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাবে—যেমন সরকার গঠন, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, মন্ত্রিসভা গঠন, বাজেট পাস বা প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদের নিজস্ব ক্ষমতায় তারা এসব করবে। পাশাপাশি, তারাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বড় ধরনের সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবেন। এর মানে এই নয় যে এখানেই সব শেষ; বিদ্যমান সংবিধান এবং জুলাই সনদের বিধান অনুসরণ করে ভবিষ্যতেও সংসদ আরও সংশোধনী আনতে পারবে। মূলত, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব এই সংস্কার পরিষদের ওপরই অর্পিত হবে।
স্ট্রিম: গণভোটে আমরা দেখলাম 'হ্যাঁ' ভোটের পাশাপাশি প্রায় ৩০ শতাংশের মত 'না' ভোটও পড়েছে। এটি আমাদের কী বার্তা দেয়? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ড. আলী রীয়াজ: এটি দুটি বার্তা দেয়। প্রথমত, স্বল্প সময়ের মধ্যে গণভোটের আয়োজন করায় বিষয়টি হয়তো সবার কাছে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি; সময় পেলে আরও মানুষকে সম্মত করা যেত। দ্বিতীয়ত, যারা বিরোধিতা করেছেন, তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু গণভোটে ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে ৩০ শতাংশ 'না' বললেও ৭০ শতাংশ মানুষ সম্মতি দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে, পাশাপাশি যারা 'না' বলেছেন তাদের মতকেও বিবেচনায় রাখতে হবে।
স্ট্রিম: সরকার তো অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। এই সংস্কারগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনে কতটা সক্ষম হবে বলে মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: অনেকটাই সক্ষম হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য তিনটি বিষয় জরুরি: ১. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ২. রাজনৈতিক সংস্কৃতি, এবং ৩. রাজনৈতিক অর্থনীতি। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছভাবে কাজ না করে, তবে গণতন্ত্র সংহত হয় না। 'জুলাই জাতীয় সনদ' প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ। তবে কেবল প্রতিষ্ঠান দিয়ে হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখছি; যেমন—৩০টিরও বেশি দল দীর্ঘ সময় আলোচনায় থেকে একটি দলিলের অনেক বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। তাঁরা আলোচনায় ভিন্ন মত স্বত্বেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন। তারি ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনের পরে পরাজিত প্রার্থীরা বিজয়ীদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন, যা একটি বড় পরিবর্তন। সবশেষে, রাজনৈতিক অর্থনীতি, অর্থাৎ সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে বৈষম্য তৈরি করে এবং যার ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতায় বৈষম্য তৈরি হয় তা কমিয়ে আনতে হবে। যদি এই তিনটি বিষয় একত্রে অগ্রসর হয়, তবে গণতন্ত্র সংহত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
স্ট্রিম: কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা মনে করে—'আমরা যা করব সেটাই ঠিক'। সেক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয়, এবারের বিজয়ী দল কি সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে, নাকি ক্ষমতার দাপটে আগের রূপেই ফিরে যাবে?
ড. আলী রীয়াজ: এখানে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। গত ১৬ বছর দেশ একটি স্বৈরতন্ত্রের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক কর্মীরা সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন, কারণ বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল না। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আমরা দেখেছি কীভাবে আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধীদের সাজা দেওয়া হয়েছে। গুম-খুন নিয়ে প্রশ্ন করা যায়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নিশ্চয়ই উপলব্ধি হয়েছে যে, স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী কতটা জরুরি। ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের বিষয়েও সবাই একমত হয়েছেন। যদিও দক্ষিণ এশিয়ায় বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সঠিক আচরণ না করার নজির বেশি, তবুও ১৬ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানে এত মানুষের আত্মত্যাগের কারণে আমি আস্থা রাখতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দায়বদ্ধতা অনুভব করবে এবং সঠিক পথেই হাঁটবে।
স্ট্রিম: নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে—প্রথমত, শাসনের বা সুশাসনের চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট অন্যতম। বিগত সরকার অর্থনীতির খাতকে শুধু নিঃস্বই করেনি, বরং বানোয়াট পরিসংখ্যান দিয়ে তা আড়াল করার চেষ্টা করেছে। এর আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এমন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি হাতে পেয়ে প্রথমেই রক্তপাত বন্ধ করার দিকে নজর দিয়েছিল এবং তা তারা করেছে। কিন্তু কেবল রক্তপাত বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। কারণ, দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি। দেশি বা বিদেশি—কোনো বিনিয়োগই তেমন আসেনি। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, বরং বেকারত্ব বেড়েছে। বিনিয়োগ না হওয়ার কারণ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের অনিশ্চয়তা। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে চান ভবিষ্যৎ নীতি কী হবে। নির্বাচিত সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ক্ষমতায় থাকলে আগামী দিনের নীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হয়। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো সংস্কার। আমি প্রচুর অধ্যাদেশের কথা উল্লেখ করেছি—সেগুলো নির্বাচিত সরকারকে অনুমোদন করতে হবে। পাশাপাশি 'জুলাই জাতীয় সনদ'-এর ভিত্তিতে ১৮০ দিনের মধ্যে যে সাংবিধানিক সংস্কার করার কথা, সেটি সম্পন্ন করা। এটি একটি সময় নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট কাজ।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো রাজনৈতিক। একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। এখানে বিরোধী দলের ভূমিকা থাকবে, কিন্তু মূল উদ্যোগটি ক্ষমতাসীনদেরই নিতে হবে। তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে যেন সংসদ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বিরোধীদের মতামত গুরুত্ব পায়।
চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অস্থিতিশীলতা তৈরিতে বিভিন্ন উপাদান কাজ করেছে। পুলিশের ব্যবস্থাটি এই সরকার এক অর্থে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়েছে। এখানে বড় ধরনের সংস্কার এবং একটি সংগঠিত শক্তির প্রয়োজন। এর অভাবেই 'মব জাস্টিস', মাজারে হামলা বা নারীদের অবমাননাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। আর পাশাপাশি, পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি বিদেশ থেকে হুমকি-ধামকি বা উত্তেজনা সৃষ্টি করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করবে। যদিও আমি নির্বাচনে দেখেছি তাদের আবেদন কমে আসছে, তবুও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে।
স্ট্রিম: এই প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে বিরোধী দলের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: যেকোনো সংসদীয় ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হচ্ছে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। এই জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো যাতে গড়ে ওঠে, সেদিকে তাদের চেষ্টা থাকতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে সত্য অবহিত করা এবং নিজেদের স্বচ্ছ থাকা জরুরি। বিরোধী দলকে স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে সরকার কোথায় সঠিক কাজ করছে এবং কোথায় ভুল করছে। সরকারের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা তখনই পালন করতে পারবে, যদি ক্ষমতাসীন দল সমালোচনা সহ্য করে এবং বলপ্রয়োগের পথে না হাঁটে—যা অতীতে আমরা দেখেছি। তাই বিরোধী দলের ভূমিকা হওয়া উচিত গঠনমূলক এবং জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর তাদের জোর দিতে হবে।
স্ট্রিম: আপনি তো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার কি মনে হয় রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা কতটা সম্ভব হয়েছে? আর যতটুকু হয়েছে, তা ধরে রাখার জন্য কী করা দরকার?
ড. আলী রীয়াজ: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে 'জুলাই জাতীয় সনদ' তৈরি হয়েছে, এটাই বড় অর্জন। এখানে ভিন্নমত অবশ্যই আছে। সব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল প্রতিটি শব্দে একমত হবে—এটা সম্ভব নয়। যারা সমালোচনা করেন যে সবাই একমত হয়নি, তাদের বুঝতে হবে মৌলিক জায়গাগুলোতে ঐকমত্য হয়েছে কিনা। অনেক বিষয়েই কিন্তু ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নির্দিষ্ট করা কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা যায়। তবে তার চেয়েও বড় অর্জন হলো এই সংস্কৃতিটি তৈরি করা—যেখানে সকল দলকে একত্র করে সাংবিধানিক ও নীতিগত বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করা সম্ভব হয়েছে।
এটি ধরে রাখা জরুরি। এর মানে এই নয় যে কমিশন ৫ বছর ধরে কাজ করবে, কারণ তখন সংসদ থাকবে। সংসদেই আলোচনা হবে। তবে সংসদের বাইরেও জবাবদিহিতার জায়গা থাকতে হবে। কারণ ১৮ কোটি মানুষ তো সংসদে যায় না। তাই নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে—তারা বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছে এবং মোকাবেলা করছে। আমি এ ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।
স্ট্রিম: জুলাই সনদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিএনপির 'নোট অব ডিসেন্ট' (ভিন্নমত) ছিল। যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—সংস্কারগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হবে? আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম, তার কতটুকু পাব বলে আপনি মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: দেখুন, এটি সংখ্যা বা শতাংশ দিয়ে বিচার করা যাবে না। বিচার করতে হবে মূল জায়গাগুলো এবং জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা দিয়ে। জুলাই জাতীয় সনদে বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট পথরেখা দেওয়া আছে। রাজনীতিতে আলোচনার সুযোগ সবসময়ই থাকে। আমি আগেও বলেছি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপির অতীতেও মানিয়ে নেওয়ার বা ইতিবাচক পরিবর্তনের নজির আছে। তারা অনেক কিছুই গ্রহণ করেছে এবং এই আলোচনাতেও অংশ নিয়েছে। কেবল বিএনপি নয়, অন্য দলগুলোও তা করেছে। তাই সংস্কার কতটুকু টিকবে বা বাস্তবায়িত হবে—এই প্রশ্নটি যৌক্তিক হলেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত আমরা সকলে মিলে কতটা অর্জন করতে পারছি। যেহেতু জনগণের ম্যান্ডেট বিএনপির হাতে, আমরা আশা করতেই পারি যে তারা সেই দায়িত্ব পালন করবে।
স্ট্রিম: সবশেষে, যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শেষ এবং আপনারা বিদায় নিচ্ছেন, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী থাকবে?
ড. আলী রীয়াজ: সরকারের অংশ হিসেবে নয়, বরং আমার অভিজ্ঞতা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমি কয়েকটি বিষয় বলতে চাই। প্রথমত, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দায়িত্ব জনগণের। জনগণকে সবসময় সরকারের ওপর নজরদারি বা 'ভিজিল্যান্স' বজায় রাখতে হবে এবং জবাবদিহিতা চাইতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা, স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা। এটি ভবিষ্যতে সব দলের জন্যই সুফল বয়ে আনবে।
সর্বশেষ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে আমাদের সকলকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং অংশগ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অর্থ শুধু দলের সদস্য হওয়া বা রাজপথে মিছিল করা নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতিটি কাজই রাজনীতির অংশ। আমাদের সকলকে 'সচেতন নাগরিক' হিসেবে জেনে-বুঝে রাজনীতির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং সরকার বা বিরোধী দল—সবাইকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই জায়গায় আমাদের ঘাটতি আছে, যা পূরণ করা জরুরি।

ড. আলী রীয়াজ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এর সহ-সভাপতি ছিলেন। ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন, গণভোট, জুলাই সনদ, সংস্কারসহ নানা বিষয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
স্ট্রিম: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দুটি ম্যান্ডেটের একটি ছিল ‘সংস্কার’ এবং অন্যটি ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর’। নির্বাচন তো অনুষ্ঠিত হলো। এই দুটি লক্ষ্য অর্জনে সরকার কতটা সফল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট যে, সরকারের পক্ষ থেকে একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের যে প্রতিশ্রুতি ও প্রচেষ্টা ছিল, তা সফল হয়েছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সামগ্রিকভাবে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন এবং প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পেরেছেন। বড় কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তাই আমরা বলতেই পারি, একটি সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু একই সঙ্গে দুটি নির্বাচন (সংসদ ও গণভোট) ছিল, তাই চ্যালেঞ্জও বেশি ছিল; সেই বিবেচনায় এটি একটি বড় সাফল্য।
আর সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে গেলে, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই সরকারের মেয়াদে দেড় শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যা মূলত প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা একটি বড় পদক্ষেপ। পাশাপাশি, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এবং সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করা হয়েছে, যা জনগণের কাছে উপস্থাপন করে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতিও পাওয়া গেছে। এর ফলে সরকার শুধু নিজেরা সংস্কার পদক্ষেপ নেয়নি, বরং নির্বাচিত সরকারের জন্য জনগণের সম্মতি সম্বলিত সাংবিধানিক সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট এজেন্ডাও প্রস্তুত করে যাচ্ছে। এটি সরকারের একক বিষয় নয়, বরং সকলের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি। তাই এদিক থেকেও সরকার যথেষ্ট সাফল্যের দাবি করতে পারে বলে মনে করি।
স্ট্রিম: সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও অনুষ্ঠিত হলো। আমরা দেখেছি, ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও ‘না’ ভোটও উল্লেখযোগ্য হারে পড়েছে। ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে বিএনপির কিছু 'নোট অফ ডিসেন্ট' (ভিন্নমত) ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে তারাই আগামীতে সরকার গঠন করবে। সেক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয়, বিএনপি কি পুরো 'জুলাই সনদ' বাস্তবায়ন করবে, নাকি তাদের ভিন্নমত বজায় রেখে বাস্তবায়ন করবে?
ড. আলী রীয়াজ: সব দলের ক্ষেত্রেই আমরা বারবার বলেছি, যেহেতু তারা এই সনদে স্বাক্ষর করেছেন, তাই নীতিগতভাবে তারা এটি মেনে নিয়েছেন। এখন যেহেতু 'জুলাই জাতীয় সনদ' জনগণের ভোটে অনুমোদিত হয়েছে, তাই যেই সরকার গঠন করুক, এটি বাস্তবায়ন করা তাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। বিএনপির ইশতেহারেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা আছে। দল হিসেবে তাদের কিছু ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং ইশতেহারে তার প্রতিফলনও ঘটেছে। তবে যেহেতু জনগণের সম্মতি পাওয়া গেছে, তাই আশা করি বিএনপি নিঃসন্দেহে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। কারণ, এই ভোটাররাই তাদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করে দেশ শাসনের ম্যান্ডেট দিয়েছে।
অতীতেও বিএনপি বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯১ সালে তারা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার ম্যান্ডেট পেলেও জনগণের দাবির মুখে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিএনপি যথেষ্ট অভিযোজনক্ষম একটি দল। অর্থনৈতিক সংস্কারসহ বিভিন্ন সময়ে তাদের মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা আমরা দেখেছি। আমি আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে মতভিন্নতাগুলো তারা বিবেচনায় নেবে। সংস্কার এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দল এবং সিভিল সোসাইটিরও ভূমিকা থাকবে, কারণ অধিকাংশ মানুষ সংস্কার চায়।
স্ট্রিম: আপনি বলেছিলেন যে আগামী সংসদ গঠিত হওয়ার পর ১৮০ দিনের মধ্যে তা 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' হিসেবে কাজ করে সংবিধানের সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে। বিষয়টি আসলে কীভাবে কাজ করবে, যদি বিস্তারিত বলতেন?
ড. আলী রীয়াজ: 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ ২০২৫' অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে একটি প্রস্তাব ছিল যে, এই সংসদই 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' হিসেবে কাজ করবে। আমি স্পষ্ট করতে চাই—এটি 'গণপরিষদ' (কন্সটিটুয়েন্ট এ্যাসেম্বলি) নয়, এটি 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ'। গণপরিষদের যে গাঠনিক ক্ষমতা থাকে, সাধারণ সংসদের তা থাকে না; সংসদের থাকে কেবল সংশোধনী ক্ষমতা। আমাদের সুপ্রিম কোর্ট 'বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন' বা মৌলিক কাঠামো মতবাদ একধিকবার ব্যবহার করে সংবিধানের সংশোধন বাতিল করেছে। তাই সংসদকে গাঠনিক ক্ষমতা দেওয়ার জন্যই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছে এবং জাতীয় সংসদকে একই সঙ্গে নির্ধারিরত সময়ের জন্যে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বলা হচ্ছে । জনগণ তা অনুমোদন করেছেন। ফলে, নির্বাচিত ৩০০ জন সংসদ সদস্যই সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' হিসেবে বসবেন এবং আগামী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবেন। এতে বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিনের কারণে সংস্কারগুলো আদালতে বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।
এই কাজটি সমান্তরালভাবে চলবে। অর্থাৎ, জাতীয় সংসদ প্রথম দিন থেকেই তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাবে—যেমন সরকার গঠন, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, মন্ত্রিসভা গঠন, বাজেট পাস বা প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সংসদের নিজস্ব ক্ষমতায় তারা এসব করবে। পাশাপাশি, তারাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বড় ধরনের সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবেন। এর মানে এই নয় যে এখানেই সব শেষ; বিদ্যমান সংবিধান এবং জুলাই সনদের বিধান অনুসরণ করে ভবিষ্যতেও সংসদ আরও সংশোধনী আনতে পারবে। মূলত, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব এই সংস্কার পরিষদের ওপরই অর্পিত হবে।
স্ট্রিম: গণভোটে আমরা দেখলাম 'হ্যাঁ' ভোটের পাশাপাশি প্রায় ৩০ শতাংশের মত 'না' ভোটও পড়েছে। এটি আমাদের কী বার্তা দেয়? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ড. আলী রীয়াজ: এটি দুটি বার্তা দেয়। প্রথমত, স্বল্প সময়ের মধ্যে গণভোটের আয়োজন করায় বিষয়টি হয়তো সবার কাছে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি; সময় পেলে আরও মানুষকে সম্মত করা যেত। দ্বিতীয়ত, যারা বিরোধিতা করেছেন, তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু গণভোটে ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে ৩০ শতাংশ 'না' বললেও ৭০ শতাংশ মানুষ সম্মতি দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে, পাশাপাশি যারা 'না' বলেছেন তাদের মতকেও বিবেচনায় রাখতে হবে।
স্ট্রিম: সরকার তো অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে। এই সংস্কারগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনে কতটা সক্ষম হবে বলে মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: অনেকটাই সক্ষম হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য তিনটি বিষয় জরুরি: ১. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, ২. রাজনৈতিক সংস্কৃতি, এবং ৩. রাজনৈতিক অর্থনীতি। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছভাবে কাজ না করে, তবে গণতন্ত্র সংহত হয় না। 'জুলাই জাতীয় সনদ' প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ। তবে কেবল প্রতিষ্ঠান দিয়ে হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখছি; যেমন—৩০টিরও বেশি দল দীর্ঘ সময় আলোচনায় থেকে একটি দলিলের অনেক বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। তাঁরা আলোচনায় ভিন্ন মত স্বত্বেও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন। তারি ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচনের পরে পরাজিত প্রার্থীরা বিজয়ীদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন, যা একটি বড় পরিবর্তন। সবশেষে, রাজনৈতিক অর্থনীতি, অর্থাৎ সমাজের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে বৈষম্য তৈরি করে এবং যার ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতায় বৈষম্য তৈরি হয় তা কমিয়ে আনতে হবে। যদি এই তিনটি বিষয় একত্রে অগ্রসর হয়, তবে গণতন্ত্র সংহত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
স্ট্রিম: কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, কোনো দল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা মনে করে—'আমরা যা করব সেটাই ঠিক'। সেক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয়, এবারের বিজয়ী দল কি সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে, নাকি ক্ষমতার দাপটে আগের রূপেই ফিরে যাবে?
ড. আলী রীয়াজ: এখানে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। গত ১৬ বছর দেশ একটি স্বৈরতন্ত্রের মধ্য দিয়ে গেছে। রাজনৈতিক কর্মীরা সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন, কারণ বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল না। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আমরা দেখেছি কীভাবে আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধীদের সাজা দেওয়া হয়েছে। গুম-খুন নিয়ে প্রশ্ন করা যায়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নিশ্চয়ই উপলব্ধি হয়েছে যে, স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত পুলিশ বাহিনী কতটা জরুরি। ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের বিষয়েও সবাই একমত হয়েছেন। যদিও দক্ষিণ এশিয়ায় বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সঠিক আচরণ না করার নজির বেশি, তবুও ১৬ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানে এত মানুষের আত্মত্যাগের কারণে আমি আস্থা রাখতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দায়বদ্ধতা অনুভব করবে এবং সঠিক পথেই হাঁটবে।
স্ট্রিম: নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী হবে বলে আপনি মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে—প্রথমত, শাসনের বা সুশাসনের চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট অন্যতম। বিগত সরকার অর্থনীতির খাতকে শুধু নিঃস্বই করেনি, বরং বানোয়াট পরিসংখ্যান দিয়ে তা আড়াল করার চেষ্টা করেছে। এর আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এমন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি হাতে পেয়ে প্রথমেই রক্তপাত বন্ধ করার দিকে নজর দিয়েছিল এবং তা তারা করেছে। কিন্তু কেবল রক্তপাত বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। কারণ, দেশে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ হয়নি। দেশি বা বিদেশি—কোনো বিনিয়োগই তেমন আসেনি। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব নয়, বরং বেকারত্ব বেড়েছে। বিনিয়োগ না হওয়ার কারণ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের অনিশ্চয়তা। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে চান ভবিষ্যৎ নীতি কী হবে। নির্বাচিত সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ক্ষমতায় থাকলে আগামী দিনের নীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হয়। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো সংস্কার। আমি প্রচুর অধ্যাদেশের কথা উল্লেখ করেছি—সেগুলো নির্বাচিত সরকারকে অনুমোদন করতে হবে। পাশাপাশি 'জুলাই জাতীয় সনদ'-এর ভিত্তিতে ১৮০ দিনের মধ্যে যে সাংবিধানিক সংস্কার করার কথা, সেটি সম্পন্ন করা। এটি একটি সময় নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট কাজ।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো রাজনৈতিক। একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। এখানে বিরোধী দলের ভূমিকা থাকবে, কিন্তু মূল উদ্যোগটি ক্ষমতাসীনদেরই নিতে হবে। তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে যেন সংসদ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। বিরোধীদের মতামত গুরুত্ব পায়।
চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অস্থিতিশীলতা তৈরিতে বিভিন্ন উপাদান কাজ করেছে। পুলিশের ব্যবস্থাটি এই সরকার এক অর্থে জোড়াতালি দিয়ে চালিয়েছে। এখানে বড় ধরনের সংস্কার এবং একটি সংগঠিত শক্তির প্রয়োজন। এর অভাবেই 'মব জাস্টিস', মাজারে হামলা বা নারীদের অবমাননাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। আর পাশাপাশি, পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি বিদেশ থেকে হুমকি-ধামকি বা উত্তেজনা সৃষ্টি করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করবে। যদিও আমি নির্বাচনে দেখেছি তাদের আবেদন কমে আসছে, তবুও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং রাজনৈতিকভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে।
স্ট্রিম: এই প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে বিরোধী দলের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: যেকোনো সংসদীয় ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হচ্ছে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। এই জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো যাতে গড়ে ওঠে, সেদিকে তাদের চেষ্টা থাকতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে সত্য অবহিত করা এবং নিজেদের স্বচ্ছ থাকা জরুরি। বিরোধী দলকে স্বচ্ছতার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে সরকার কোথায় সঠিক কাজ করছে এবং কোথায় ভুল করছে। সরকারের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়ে ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে হবে। বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা তখনই পালন করতে পারবে, যদি ক্ষমতাসীন দল সমালোচনা সহ্য করে এবং বলপ্রয়োগের পথে না হাঁটে—যা অতীতে আমরা দেখেছি। তাই বিরোধী দলের ভূমিকা হওয়া উচিত গঠনমূলক এবং জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর তাদের জোর দিতে হবে।
স্ট্রিম: আপনি তো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার কি মনে হয় রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা কতটা সম্ভব হয়েছে? আর যতটুকু হয়েছে, তা ধরে রাখার জন্য কী করা দরকার?
ড. আলী রীয়াজ: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে 'জুলাই জাতীয় সনদ' তৈরি হয়েছে, এটাই বড় অর্জন। এখানে ভিন্নমত অবশ্যই আছে। সব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল প্রতিটি শব্দে একমত হবে—এটা সম্ভব নয়। যারা সমালোচনা করেন যে সবাই একমত হয়নি, তাদের বুঝতে হবে মৌলিক জায়গাগুলোতে ঐকমত্য হয়েছে কিনা। অনেক বিষয়েই কিন্তু ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর নির্দিষ্ট করা কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা যায়। তবে তার চেয়েও বড় অর্জন হলো এই সংস্কৃতিটি তৈরি করা—যেখানে সকল দলকে একত্র করে সাংবিধানিক ও নীতিগত বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করা সম্ভব হয়েছে।
এটি ধরে রাখা জরুরি। এর মানে এই নয় যে কমিশন ৫ বছর ধরে কাজ করবে, কারণ তখন সংসদ থাকবে। সংসদেই আলোচনা হবে। তবে সংসদের বাইরেও জবাবদিহিতার জায়গা থাকতে হবে। কারণ ১৮ কোটি মানুষ তো সংসদে যায় না। তাই নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে—তারা বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছে এবং মোকাবেলা করছে। আমি এ ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।
স্ট্রিম: জুলাই সনদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বিএনপির 'নোট অব ডিসেন্ট' (ভিন্নমত) ছিল। যেহেতু বিএনপি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—সংস্কারগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হবে? আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম, তার কতটুকু পাব বলে আপনি মনে করেন?
ড. আলী রীয়াজ: দেখুন, এটি সংখ্যা বা শতাংশ দিয়ে বিচার করা যাবে না। বিচার করতে হবে মূল জায়গাগুলো এবং জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা দিয়ে। জুলাই জাতীয় সনদে বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট পথরেখা দেওয়া আছে। রাজনীতিতে আলোচনার সুযোগ সবসময়ই থাকে। আমি আগেও বলেছি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপির অতীতেও মানিয়ে নেওয়ার বা ইতিবাচক পরিবর্তনের নজির আছে। তারা অনেক কিছুই গ্রহণ করেছে এবং এই আলোচনাতেও অংশ নিয়েছে। কেবল বিএনপি নয়, অন্য দলগুলোও তা করেছে। তাই সংস্কার কতটুকু টিকবে বা বাস্তবায়িত হবে—এই প্রশ্নটি যৌক্তিক হলেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত আমরা সকলে মিলে কতটা অর্জন করতে পারছি। যেহেতু জনগণের ম্যান্ডেট বিএনপির হাতে, আমরা আশা করতেই পারি যে তারা সেই দায়িত্ব পালন করবে।
স্ট্রিম: সবশেষে, যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শেষ এবং আপনারা বিদায় নিচ্ছেন, বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী থাকবে?
ড. আলী রীয়াজ: সরকারের অংশ হিসেবে নয়, বরং আমার অভিজ্ঞতা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমি কয়েকটি বিষয় বলতে চাই। প্রথমত, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দায়িত্ব জনগণের। জনগণকে সবসময় সরকারের ওপর নজরদারি বা 'ভিজিল্যান্স' বজায় রাখতে হবে এবং জবাবদিহিতা চাইতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা, স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা। এটি ভবিষ্যতে সব দলের জন্যই সুফল বয়ে আনবে।
সর্বশেষ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে আমাদের সকলকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং অংশগ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অর্থ শুধু দলের সদস্য হওয়া বা রাজপথে মিছিল করা নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রতিটি কাজই রাজনীতির অংশ। আমাদের সকলকে 'সচেতন নাগরিক' হিসেবে জেনে-বুঝে রাজনীতির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং সরকার বা বিরোধী দল—সবাইকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই জায়গায় আমাদের ঘাটতি আছে, যা পূরণ করা জরুরি।

এবারের নির্বাচনটি আর সেই ‘ব্যাটলিং বেগমস’ যুগের মতো ছিল না। নব্বইয়ের দশক থেকে দুই শাড়ি পরা নেত্রী পালা করে ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জীবিত নেই।
২ ঘণ্টা আগেত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে পদার্পণ করলেও, নতুন সরকারের জন্য মসৃণ পথের চেয়ে কাঁটা বিছানো চ্যালেঞ্জই বেশি বলে মনে করি।
২০ ঘণ্টা আগে
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, একই সঙ্গে সুন্দরবন দিবস। দিনটি কাকতালীয়ভাবে এক হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। ভালোবাসার লগ্ন যখন উদযাপিত হয়, তখন সেই ভালোবাসার দৃষ্টি দিয়ে যদি আমরা সুন্দরবনের দিকে তাকাই, তবে প্রকৃতিকে ভালোবাসার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
১ দিন আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে ২০০৮ সালের মাইলফলক ৮৭ শতাংশের তুলনায় ছোট। ভোটের এই হার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকেই।
২ দিন আগে