জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

নারীকে হেনস্তা: এক বছরে অর্ণবের ‘টিকিটিও’ ধরা যায়নি

আদালতের হাজতখানা থেকেই মুক্ত হন অর্ণব। পরে ঘিরে ধরে অর্ণবের মাথায় পাগড়ি, গলায় ফুলের মালা ও হাতে কোরআন দিয়ে বরণ করে নেন ২০-৩০ জন।

জামিনে মুক্তির পর নারী হেনস্তাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী মোস্তফা আসিফ অর্ণবকে আদালত প্রাঙ্গণেই ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে হেনস্থার অভিযোগে একই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মোস্তফা আসিফ অর্ণব গ্রেপ্তারের এক বছর পার হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সহকারী এই বাইন্ডারকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য, সিন্ডিকেটে অর্ণবকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সেই সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক চিঠি কোনো দপ্তরে পৌঁছেনি। ফলে অর্ণবের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালের ৫ মার্চ এক ছাত্রীকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে অর্ণবের বিরুদ্ধে। পুলিশ তাঁকে আটক করলে শাহবাগ থানা ঘেরাও করা হয়। পরে জামিনে মুক্তি পেলে ক্যাম্পানে অর্ণবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে অর্ণবকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ঘটনার এক বছরেও অর্ণবের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক শাস্তির চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

যদিও সাময়িক বহিষ্কারাদেশ কার্যকর আছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাওসুল হক। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘ব্যবস্থা নিতে প্রক্টর অফিস তিন সদস্যের কমিটি করেছিল। কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্রক্টর বলতে পারবেন। তবে অর্ণবের সাময়িক বহিষ্কারাদেশ বহাল রয়েছে।’

প্রক্টর মো. সাইফুদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সিন্ডিকেটে অর্ণবকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্তের চিঠি কোন পর্যায়ে আছে, তা জানা নেই।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

সূত্র জানায়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বিষয় দেখভাল করেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. কামরুজ্জামান ও আঞ্জুয়ারা পারভীন। তবে তাদের কেউই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

প্রশাসন-৯ শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার আঞ্জুয়ারা পরভীন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো চিঠি আসেনি। হয়তো এখনো এটি ইস্যু হয়নি।’

শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক শিমু আক্তার স্ট্রিমকে বলেন, নারীবিদ্বেষী মনোভাব এদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে খুবই প্রকট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তচিন্তার জায়গায় ছাত্রীকে হেনস্তা খুবই উদ্বেগের। ইসলাম যেখানে নারীর সর্বোচ্চ সম্মান-মর্যাদা নিশ্চিত করেছে, সেখানে হেনস্তার পর ধর্মীয় রঙ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ছাত্রীরা নিরাপদ হবে না। আমি হেনস্তাকারী কর্মচারীর বিচারের দাবি জানাচ্ছি।

লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী শাখা ছাত্রদলের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ ইমাম হাসান অনিক বলেন, অভিযুক্তকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত কার্যকরে বিলম্বের নিন্দা জানাই। হেনস্তাকারীর পক্ষ নিয়ে সিদ্ধান্ত কার্যকরে বাধা যারা দিচ্ছেন, তাদের মুখোশ উন্মোচনের দাবিও জানান অনিক।

ওমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের ছাত্র মনোয়ার হোসেন প্রান্ত বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আমরা বিচারহীনতার বদলে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছিলাম, তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিশেষ গোষ্ঠীর কারণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের চিঠি মাসের পর মাস গেলেও ইস্যু হচ্ছে না। এর অর্থ অদৃশ্য শক্তি অর্ণবকে রক্ষায় সবকিছু করতে সক্ষম।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

২০২৫ সালের ৫ মার্চ ভুক্তভোগী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের ছাত্রী ফেসবুকে অভিযুক্ত অর্ণবের ছবি যুক্ত করে লেখেন, এই লোকটা আজকে আমাকে শাহবাগ থেকে আসার পথে হ্যারাস করেছে। সে আমাকে হুট করে রাস্তায় দাঁড় করায়ে বলতেসে, আমার ড্রেস ঠিক নাই, আমি পর্দা করি নাই ইত্যাদি ইত্যাদি এবং তার আচরণ খুবই অ্যাগ্রেসিভ ছিল। পরে তাকে আমি জিজ্ঞাসা করি, আপনি কোন হলে থাকেন, কোন ডিপার্টমেন্টে পড়েন? সে বলে সে এই ক্যাম্পাসের কেউ না।

তিনি আরও লেখেন, আমি সালওয়ার-কামিজের সঙ্গে ঠিকমতো ওড়না রেখেছিলাম। সে আমাকে বলে– আমার নাকি ওড়না সরে গেছে। পরে আমি তাকে বললাম এইটা তো আপনার দেখার বিষয় না। আর আপনার তাকানোও জাস্টিফাইড না। এরপর আমি প্রক্টরকে কল দিতে চাইলে সে দৌঁড় দিয়ে চলে যায়।

এই পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা অর্ণবকে শনাক্ত করে প্রক্টর অফিসে নিলে অভিযোগ স্বীকার করেন। এরপর ভুক্তভোগীর মামলায় তাঁকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়। তবে অর্ণবের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে রাত ১টার দিকে শাহবাগ থানা ঘেরাও করা হয় ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে। এ সময় তারা অভিযুক্তের মুক্তি চান এবং ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে মামলা নিতে চাপ দেন। পরদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ থানা থেকে সরে যায় আন্দোলনকারীরা।

এ ঘটনায় ৬ মার্চ গ্রেপ্তার দেখিয়ে অর্ণবকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। বাদীও তদন্ত কর্মকর্তা বরাবর মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করেন। আবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেরা মাহবুব শুনানি শেষে এক হাজার টাকা মুচলেকায় আসামির জামিন মঞ্জুর করেন।

আদালতের হাজতখানা থেকেই মুক্ত হন অর্ণব। পরে ঘিরে ধরে ‘নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে অর্ণবের মাথায় পাগড়ি, গলায় ফুলের মালা ও হাতে কোরআন দিয়ে বরণ করে নেন ২০-৩০ জন।

এ ঘটনায় সে সময় প্রক্টর বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘একটা সমঝোতা হয়েছে। তৌহিদী জনতা সারারাত শাহবাগ ঘিরে রেখেছিল। ওই কারণেই হয়েছে... একটা সমঝোতা। ওরা (তৌহিদি জনতা) বলছিল থানা থেকেই মামলা প্রত্যাহার করতে। কিন্তু থানা ও অন্যান্য পক্ষ রাজি হয়নি। বলেছে, কোর্টে যাবে। কোর্টে জামিন পেলে কোর্ট থেকেই বা কীভাবে মামলা প্রত্যাহার করা যায়, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘মামলা প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে ওই ব্যক্তিকে মুচলেকা দিতে হবে যে মামলার বাদী নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে তিনি দায়ী থাকবেন। কারণ মেয়েটার নিরাপত্তা আমাদের দেখতে হবে।’

সম্পর্কিত