এ কে এনামুল হকের সাক্ষাৎকার

শুধু সস্তা শ্রম নয়, ‘গ্লোবাল কানেক্টিভিটি হাব’ হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি

ড. এ কে এনামুল হক বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক। ছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক পদে। অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন। আসন্ন জাতীয় বাজেট, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, কর ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাসুম বিল্লাহ

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৬, ১৪: ০০
এ কে এনামুল হক। স্ট্রিম ছবি

স্ট্রিম: নতুন সরকারের প্রথম বাজেট আসন্ন। মাত্র ১০০ দিন দায়িত্ব পালনের পরই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রবৃদ্ধির হারের বিবেচনায় এই বাজেট কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

এ কে এনামুল হক: প্রথমত, এটি বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। আশা করি, সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে আগামী চার-পাঁচ বছরে অর্থনীতি নিয়ে তাদের পরিকল্পনার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবে। মানুষ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে যে অর্থনীতির চাকা আবার কীভাবে সচল হবে।

বর্তমানে আমরা নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে আছি। আমাদের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশেপাশে। কোভিডের সময় প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। তারও আগে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এমন অবস্থা ছিল। ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমরা পিছিয়ে আবারও সেই নব্বইয়ের দশকের অবস্থায় চলে গিয়েছি। এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে এই বাজেটকে একটি ভবিষ্যৎমুখী দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

স্ট্রিম: একসময় আমাদের প্রবৃদ্ধি ৮-৯ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু তখনো কর্মসংস্থান তেমন বাড়েনি। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়াতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

এ কে এনামুল হক: দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৪ শতাংশের নিচে নেমে গেলে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যায়। তাই প্রবৃদ্ধি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। তবে কর্মসংস্থানের সংকট মূলত দুই ধরনের—অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিক আর শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান। শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে আমাদের ‘কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রণোদনা’ চালু করতে হবে।

শুধু রপ্তানি করলেই প্রণোদনা দেওয়া হবে—এই প্রথাগত নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বরং যারা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে, তাদের অতিরিক্ত প্রণোদনা দিতে হবে। বর্তমানে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বহু মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। তাই নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি।

স্ট্রিম: কর্মসংস্থান বাড়াতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু দেশি বা বিদেশি নতুন বিনিয়োগ এখনও দৃশ্যমান নয়। এ ক্ষেত্রে বাজেটে কী ধরনের উদ্যোগের আশা দেখছেন?

এ কে এনামুল হক: বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ বাড়ানো। বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু নগদ অর্থ নয়, বরং কর ছাড় বা আমদানির ক্ষেত্রে সুরক্ষা দেওয়ার মতো নীতিগত প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংকিং খাতকে সুদৃঢ় করা। ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের বর্তমান আস্থার সংকট দূর করতে হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অর্থনীতি মূলত বিশ্বাসের ওপর চলে। সরকার বা অর্থনীতির ওপর বিশ্বাস না থাকলে কেউ বিনিয়োগ করবে না।

পাশাপাশি, বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন করতে হবে। আজ একটি নিয়ম করে আগামী বাজেটে তা বাতিল করলে বিনিয়োগ আসবে না। অন্তত চার-পাঁচ বছরের জন্য কর ও বিনিয়োগ সুবিধা স্থির রাখতে হবে। আমাদের বাজেটগুলো সাধারণত ট্রেড বা ব্যবসানির্ভর—বাজেট এলেই কিছু পণ্যের কর বাড়ে, যা শুধু সরকারের আয় বাড়ায় কিন্তু অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে না। এর বদলে বাজেটকে দূরদর্শী করতে হবে।

স্ট্রিম: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আমরা ১০০ পাতার গাইডলাইন, ৩৫টি জায়গা থেকে লাইসেন্স নেওয়ার মতো জটিলতা বা জরিমানার বিধান করে রেখেছি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এই বাধাগুলো কতটা যৌক্তিক?

এ কে এনামুল হক: আমি মনে করি, শতভাগ বিদেশি মালিকানায় বিনিয়োগ উৎসাহিত করা উচিত নয়। এতে আমাদের দেশ থেকে পুঁজি সহজেই বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর বদলে দেশি বিনিয়োগকারীদের সাথে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিদেশি বিনিয়োগ আনা উচিত।

আমাদের দেশে মন্ত্রণালয়গুলো অতিরিক্ত আমলানির্ভর হয়ে গেছে। ভারতের দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে আমলাদের পাশাপাশি মন্ত্রীদের টেকনিক্যাল উপদেষ্টা থাকে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে যদি এমন একটি পেশাদার ও কারিগরি দল থাকে, তবে মন্ত্রীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস পান এবং শুধু আমলাদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয় না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, আমাদের দেশে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো একটি পণ্যের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু নিজেরাই উৎপাদন করতে চায়। এর মূল কারণ স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন বা মানের অভাব। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত যদি সঠিক মানের পণ্য সরবরাহ করতে না পারে, তবে বড় কোম্পানিগুলো তাদের ওপর ভরসা করবে না। সরকারের উচিত এসএমই ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছোট উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ দিয়ে তাদের পণ্যের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা। এতে ছোট ও বড় শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে, যা অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান—উভয়কেই গতিশীল করবে।

স্ট্রিম: আমাদের দেশের বাস্তবতায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর কতটা আস্থা রাখবে? বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদের মূল সক্ষমতা বা মডেল কী হতে পারে?

এ কে এনামুল হক: আগামী ১০-২০ বছরের বৈশ্বিক অর্থনীতির দিকে তাকালে এশিয়া একটি বড় গ্রোথ সেন্টার। জমির সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশে হয়তো বিশাল পরিসরে শিল্পায়ন সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের তিনটি বড় শক্তি রয়েছে—ভৌগোলিক অবস্থান, সস্তা অথচ শিক্ষিত মানবসম্পদ (যাদের ইংরেজি জ্ঞান ভালো) এবং আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি বাড়ানোর সুযোগ।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ভারত, চীন এবং আসিয়ান—এই তিনটি বৃহৎ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। ঢাকা থেকে এই তিন অঞ্চলের যেকোনো বড় বিমানবন্দরে যেতে মাত্র দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাংলাদেশকে একটি গ্লোবাল এভিয়েশন বা কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।

ইউরোপ বা অন্যান্য বৈশ্বিক এয়ারলাইন্সগুলো ভারত বা সিঙ্গাপুরে সহজেই তাদের রুট সম্প্রসারণ করতে পারে না রেগুলেশনের কারণে। আমরা যদি ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটকে হাব হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দিই, তবে চিত্রটি বদলে যাবে। এর ফলে শুধু বিমান খাত নয়, বৈশ্বিক ব্যাংকিং, ইন্স্যুরেন্স এবং কমপ্লায়েন্স অডিটিংয়ের মতো বড় বড় সার্ভিস সেক্টর বাংলাদেশে তাদের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করবে, কারণ এখান থেকে পুরো এশিয়ায় যাতায়াত সহজ ও সাশ্রয়ী। সিঙ্গাপুর বা চীনের মতো কঠোর রেগুলেশন না থাকায় তারা ঢাকাকে বেছে নিতে পারে।

গ্লোবাল কানেক্টিভিটি বাড়লে আমাদের কৃষি ও পচনশীল পণ্য সহজেই ইউরোপের বাজারে রপ্তানি করা যাবে। সফটওয়্যার শিল্প, ট্যুরিজম এবং হোটেল ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটবে। মূলত শিক্ষিত তরুণদের জন্য প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য আমাদের ফাইন্যান্সিয়াল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আমাদের নীতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল। ‘দিন এনে দিন খাওয়ার’ মতো শুধু বাজেট ঘাটতি মেটানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আগামী ১০ বছরে আমরা কোথায় যেতে চাই, সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

আমরা যদি ৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও ধরে রাখতে পারি, তবে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। এর জন্য খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই, শুধু সঠিক কৌশল, দীর্ঘমেয়াদি নীতি এবং গ্লোবাল কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট। সরকার কীভাবে ভাবছে আমি জানি না, তবে এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।

স্ট্রিম: কোভিড-পরবর্তী সময় থেকে মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও রিজার্ভের ঘাটতির মতো সামষ্টিক অর্থনীতিতে একধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে নতুন বাজেটে কী ধরনের উদ্যোগ থাকা উচিত?

এ কে এনামুল হক: আমরা যদি কেবল বর্তমান বাজেট ঘাটতি নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকি, তাহলে অর্থনীতিকে বড় করতে পারব না। আমাদের নীতিগুলো এমনভাবে সাজাতে হবে, যার মূল লক্ষ্য হবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি। একটি সাধারণ উদাহরণ দিই—দরিদ্র মানুষ অভাবের তাড়নায় তার সন্তানকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে লাগিয়ে দেয়। কারণ তার তাৎক্ষণিক আয়ের প্রয়োজন। অন্যদিকে, ধনী ব্যক্তি নিজে কষ্ট করে হলেও সন্তানের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেন। কারণ এটি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কাজে লাগবে। আমাদের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এই একই মানসিকতার প্রতিফলন দরকার। তাৎক্ষণিক আয়-ব্যয়ের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আগামী ১০ বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংকিং খাতকে সুদৃঢ় করা। ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের বর্তমান আস্থার সংকট দূর করতে হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অর্থনীতি মূলত বিশ্বাসের ওপর চলে। সরকার বা অর্থনীতির ওপর বিশ্বাস না থাকলে কেউ বিনিয়োগ করবে না।

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে অবকাঠামো ও সুশাসনের ওপর জোর দিতে হবে। ঢাকা শহরে কার্যকর কোনো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই, ট্রাফিক লাইট কাজ করে না। যাতায়াত ব্যবস্থা নিরাপদ ও আরামদায়ক না হওয়ায় নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের হার কম। সম্প্রতি এআই দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের প্রশংসা করা হচ্ছে। কিন্তু এর পেছনের সত্য হলো—আমাদের শত শত ট্রাফিক পুলিশ বছরের পর বছর তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

বিনিয়োগ আকর্ষণের পূর্বশর্ত হলো আইনের শাসন এবং স্থিতিশীলতা। ভিয়েতনামের রাস্তায় গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের কারণে কেউ তা ভাঙে না। সেখানে বিদেশিরা নিরাপদ বোধ করে। আমাদের দেশে নিরাপদ পানীয় জল, মানসম্মত গণপরিবহন বা রাস্তায় আইনের শাসন—এসব মৌলিক বিষয়ে নিশ্চয়তা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে এবং বিনিয়োগে আসবে না।

স্ট্রিম: কর ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার কারণে অনেক নামিদামি বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এই অনিশ্চয়তা দূর করার উপায় কী?

এ কে এনামুল হক: এটি সম্পূর্ণ সত্য। আমাদের কর বিভাগে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করে। একজন বিনিয়োগকারী বছর শেষে গিয়ে জানতে পারেন তার ওপর কত কর আরোপ হবে। এতে তার পুরো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। তবে এবারই প্রথম সরকার আগামী ৫ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি ফরোয়ার্ড লুকিং বা ভবিষ্যৎমুখী রূপরেখা দিয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি উদ্যোগ।

উন্নত দেশ বা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, ‘সোশ্যাল সিকিউরিটি’ বা সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। এখানে ‘সেফটি’ এবং ‘সিকিউরিটি’র মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। সেফটি হলো কেউ যেন চরম দারিদ্র্যে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা। আর সিকিউরিটি হলো, বেসরকারি খাতে বড় কর্মসংস্থান তৈরি হলে স্বাভাবিকভাবেই কেউ কেউ চাকরি হারাবেন, নতুন কাজ পাওয়ার মাঝখানের এই বিরতিতে তাকে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া।

দেশে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে তারা ৬.৫ শতাংশ। মোট ৪ কোটি ২০ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী মাত্র ১৩ লাখ। বাকি বিশাল বেসরকারি খাতের কর্মীদের কোনো পেনশন নেই। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য সঠিক সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করলে অর্থনীতি ধসে পড়বে এবং এই ধরনের সামাজিক অস্থিরতার ভয়ে বিদেশিরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না।

স্ট্রিম: পূর্ববর্তী সরকারের আমলে চালু হওয়া ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ কি এই বাজেটেও গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে মনে করেন?

এ কে এনামুল হক: অবশ্যই। সরকার পরিবর্তন হলেও পেনশন কর্তৃপক্ষ বাতিল হয়নি। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বেসরকারি খাতে বা আত্মকর্মে নিয়োজিত। ৬৫ বছরের পর তাদের কাজ করার ক্ষমতা থাকবে না। তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা না রাখলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেখানকার সামাজিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। সামাজিক সুরক্ষা না থাকলে সংকটের সময় শ্রমিক অসন্তোষ বা জনরোষ তৈরি হয়, যার প্রথম শিকার হয় বিদেশি কোম্পানিগুলো। তাই অর্থনীতিকে নিরাপদ রাখতে সর্বজনীন পেনশনের মতো উদ্যোগগুলো বাজেটে সুস্পষ্টভাবে থাকা উচিত।

স্ট্রিম: বাংলাদেশের ইপিজেড মডেলটি বেশ সফল বলে ধরা হয়। বিদেশি বিনিয়োগ টানতে এই মডেলের আরও সম্প্রসারণ করা উচিত কি না?

এ কে এনামুল হক: ইপিজেড বা ইকোনমিক জোন সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা আসলে মূল মডেল থেকে সরে গিয়ে ‘জমির ব্যবসায়’ নেমে গেছি। একটি প্রকৃত ইপিজেডের কাজ হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও রাস্তার গ্যারান্টি দেওয়া। কিন্তু এখন ইকোনমিক জোনগুলোতে এসবের কোনো গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে না। শুধু প্লট বিক্রি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া রয়েছে চরম সমন্বয়হীনতা। বাণিজ্য, অর্থ, পরিকল্পনা ও শিল্প মন্ত্রণালয়—সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। যেমন, পায়রাতে সমুদ্রবন্দর করা হলো, কিন্তু ইকোনমিক জোন করা হলো সেখান থেকে অনেক দূরে। এর ফলে পণ্য পরিবহনে ট্রাকের ব্যবহার বাড়ছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

ইপিজেড হতে হবে বন্দর ও রেললাইনের কাছাকাছি। সড়কপথে পণ্য পরিবহন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও পরিবেশদূষণকারী। রপ্তানিমুখী ভারী শিল্পের জন্য নৌপথ বা রেলপথে পণ্য পরিবহন করা সবচেয়ে সাশ্রয়ী। চট্টগ্রাম ইপিজেড সফল হওয়ার মূল কারণ এর সাথে বন্দর ও রেললাইনের চমৎকার সংযোগ রয়েছে। এই লজিস্টিকস ও কানেক্টিভিটির বিষয়টি মাথায় না রেখে শুধু জমি বরাদ্দ দিলে কখনোই কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসবে না।

স্ট্রিম: আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আমাদের সংকটে ফেলছে। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সাফল্যের প্রেক্ষাপটে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের জন্য কতটা সম্ভাবনাময়?

এ কে এনামুল হক: এ বিষয়ে আমাদের একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলো যাদের কাছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আছে, তারাও পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে শিফট করতে পারেনি। বাসা-বাড়ির জন্য সোলার প্যানেল খুব ভালো বিকল্প। কিন্তু শিল্পের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। একটি কারখানায় ৮ ঘণ্টার শিফট চলে। হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেলে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে বায়ুবিদ্যুৎ খুব একটা কার্যকর হয়নি। কারণ, মে মাসের মতো ঋতু পরিবর্তনের সময় বাতাসে গতির তারতম্য ঘটে বা অনেক সময় বাতাস একদমই থাকে না। কুতুবদিয়ায় স্থাপিত উইন্ড মিল থেকে আমরা খুব একটা বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। তবে আমাদের দেশে এর বাইরেও সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন—সমুদ্রের জোয়ার-ভাটাকে (যা প্রতিদিন ৬ ফুট ওঠানামা করে) কাজে লাগিয়ে বা প্রবহমান নদীতে টারবাইন বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে।

তবে রাত ৭টার ‘পিক আওয়ার’ সামাল দিতে সোলারের ওপর নির্ভর করতে হলে প্রচুর ব্যাটারির প্রয়োজন হবে। লিথিয়াম বা লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির ডিসপোজাল বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তা ছাড়া, শিল্পকারখানাগুলোকে যদি একই সাথে সোলার এবং ফসিল ফুয়েল—দুটি ব্যবস্থাতেই বিনিয়োগ করতে হয়, তবে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ভারত, চীন এবং আসিয়ান—এই তিনটি বৃহৎ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। ঢাকা থেকে এই তিন অঞ্চলের যেকোনো বড় বিমানবন্দরে যেতে মাত্র দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাংলাদেশকে একটি গ্লোবাল এভিয়েশন বা কানেক্টিভিটি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।

অবশ্যই কিছু ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জায়গা করে নেবে। যেমন, কোনো সরকারি প্রণোদনা ছাড়াই রিকশাগুলো এখন বিদ্যুতে চলে গেছে। তবে শিল্প খাতের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য রাতারাতি পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য এখনও বাস্তবসম্মত নয়। যেখানে যতটুকু সম্ভব, সেখানেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো উচিত।

স্ট্রিম: আসন্ন বাজেট বড় আকারের ঘাটতি বাজেট হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘাটতি অর্থায়নের যে মডেলে আমরা চলছি, তাতে কি আমরা ঋণের ফাঁদে যাচ্ছি?

এ কে এনামুল হক: আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে ঋণের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মূল প্রশ্ন হলো, আমরা ঋণ নিয়ে কী করছি? যদি ঋণ নিয়ে মূলধন বা ক্যাপিটাল তৈরি করা হয়—যেমন রাস্তাঘাট, সেতু বা অবকাঠামো, যা আগামী ২০ থেকে ১০০ বছর মানুষ ভোগ করবে—তবে সেই ঋণ নেওয়া যৌক্তিক। কারণ, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর সুফল ভোগ করবে এবং তারা কর দেওয়ার মাধ্যমে তা পরিশোধ করবে। কিন্তু ঋণ যদি অনুৎপাদনশীল খাতে বা দৈনন্দিন খরচের জন্য নেওয়া হয়, তবে তা অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশই তাদের শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রচুর ঋণ নিয়েছে, এমনকি দুবাইয়ের মতো জায়গাও বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমেই অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। তাই আমি ঢালাওভাবে ঋণের বিপক্ষে নই। তবে শর্ত হলো, ঋণের ব্যবহার হতে হবে স্বচ্ছ; এখানে অহেতুক খরচ বা দুর্নীতি থাকা চলবে না।

ধরা যাক, একজন দরিদ্র কৃষক ঋণ নিয়ে মেয়ের বিয়ে দিলে সেটি ক্ষতিকর। কিন্তু সে যদি ঋণ নিয়ে একটি গরু কিনে দুধ বিক্রি করলে সেই ঋণ তার জন্য লাভজনক। আমাদের অর্থনীতির বর্তমান পর্যায়ে চার লেনের রাস্তা বা উন্নত অবকাঠামো প্রয়োজন। নইলে যানজটেই কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে। সুতরাং, সঠিক খাতে ঋণ করলে তা ক্ষতির কারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের ঋণ তাদের জিডিপির চেয়েও বেশি। অর্থাৎ, ঋণের কোনো নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা নেই; মূল বিষয় হলো ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি দিয়ে সেই ঋণ শোধ করার সক্ষমতা আমাদের তৈরি হচ্ছে কি না। ইউরোপ এখন বেশি ঋণ করতে চায় না কারণ তাদের অবকাঠামো আগেই তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের তো এখনো মূলধন তৈরি করতে হচ্ছে, যার মধ্যে গবেষণাও অন্তর্ভুক্ত। গবেষণা ছাড়া আমরা নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করতে পারব না এবং শুধু বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে বিশ্ববাজারে টিকতে পারব না।

স্ট্রিম: রাজস্য ব্যবস্থাপনা বা এনবিআরের হয়রানি নিয়ে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। দশ বছর আগের হিসাব নিয়ে জরিমানা করা বা ঘুষ দাবির মতো ব্যবস্থাগুলো সংস্কার না হলে ব্যবসাবাণিজ্য কীভাবে এগোবে?

এ কে এনামুল হক: এখানে বড় ধরনের সংস্কার অপরিহার্য। প্রথমত, এনবিআরের হাতে থাকা অপরিসীম স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা কমাতে হবে। বিশ্বে কর আদায়ের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, যেমন তিন বছর। তিন বছর আগের কোনো হিসাব বা বিল নিয়ে কাউকে হয়রানি করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। যদি কর কর্তৃপক্ষ এই সময়ের মধ্যে ফাঁকি ধরতে ব্যর্থ হয়, তবে তার দায় কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তানো উচিত, ব্যবসায়ীদের ওপর নয়।

বর্তমানে এমনও হয় যে এনবিআর কাউকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করল আর ওই ব্যবসায়ী ৫ বছর পর আদালতে গিয়ে প্রমাণ করলেন যে এনবিআরের দাবি ভুল ছিল। এই ৫ বছরে ব্যবসায়ীর যে ক্ষতি হলো, তার জন্য এনবিআরের কোনো কর্মকর্তার শাস্তির বিধান নেই। এই জবাবদিহিহীনতা দূর করতে হবে। তবে এনবিআর নিজে থেকে এই ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না, কারণ এটি দুর্নীতির একটি বড় উৎস। তাই অর্থ মন্ত্রণালয়কে বাইরে থেকে এই সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।

স্ট্রিম: বর্তমান সরকার ডি-রেগুলেশন বা বিধি-নিষেধ কমানোর কথা বলেছে। অর্থমন্ত্রীও বারবার এটা বলছেন। বাজেটে কি এর কোনো প্রতিফলন আমরা দেখতে পাব?

এ কে এনামুল হক: এটি মূলত বাজেটের বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতির অংশ। তবে বাজেটে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা বা ঘোষণা আসতে পারে।

এনবিআরকে ভেঙে দুই টুকরো করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, কারণ আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা একই থেকে যাবে। আমেরিকার মতো উন্নত দেশের নিয়মে, আপনি যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর ফাঁকি ধরতে না পারেন, তবে আর সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা প্রায় অসীম। টেলিফোন বা বিদ্যুৎ বিভাগও চাইলে দশ বছর আগের বিল দাবি করতে পারে। এই সীমাহীন ক্ষমতাই মানুষের মনে ভয়ের সঞ্চার করে এবং বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর পুরনো দাবি তামাদি হওয়ার আইন থাকা উচিত।

স্ট্রিম: আমাদের ট্রেড লাইসেন্স প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। ওয়ান স্টপ সার্ভিস ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার বদলে এখন নিজেই একটি হয়রানির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা অনেকেই চাইছেন এটা বন্ধ হোক…

এ কে এনামুল হক: এসব জটিলতা এড়ানোর সহজ উপায় আছে। ভিয়েতনামে মাত্র দুটি লাইসেন্স নিলেই কাজ হয়ে যায়। আমাদের দেশে বর্তমানে ২৬ লাখের মতো মানুষ আয়কর রিটার্ন জমা দেয়, অথচ সরকারের লক্ষ্য এটি এক কোটিতে নেওয়া। কিন্তু এক কোটি মানুষকে যদি রিটার্ন জমার জটিল প্রক্রিয়ায় ফেলা হয়, তবে তাদের অনেকেই তা পারবেন না।

আমাদের পশ্চিমা মডেল অন্ধভাবে অনুসরণের দরকার নেই। আমরা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে অগ্রিম আয়কর কেটে নিতে পারি। গার্মেন্টস শিল্পের মতো নির্দিষ্ট খাতে আড়াই শতাংশ কর নির্ধারণ করে দিয়ে বলতে পারি—এর বাইরে আর কোনো কর বা রিটার্ন লাগবে না। রিটার্ন জমা দেওয়াটা সবার জন্য বাধ্যতামূলক না করে, শুধু তাদের জন্যই রাখা উচিত যারা সরকারের কাছ থেকে কর ফেরত পেতে চান।

আরেকটি ভালো নীতি হতে পারে—গত বছরের তুলনায় যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ বছর বেশি কর দেবে, তাকে কোনো অডিটের মুখে বা হয়রানিতে ফেলা হবে না। এর ফলে করদাতারা উৎসাহিত হবেন। তা না করে আমরা মানুষকে হয়রানির ফাঁদে ফেলছি।

স্ট্রিম: বর্তমান অর্থমন্ত্রী নিজে সমস্যাগুলো জানেন। কিন্তু আমলাতন্ত্রের জটিলতার কারণে কি তিনি এসব সমাধান করতে পারবেন?

এ কে এনামুল হক: অর্থমন্ত্রী নিজে ব্যবসায়ী। কোথায় কোথায় সমস্যা বা হয়রানি আছে, তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। এটি অর্থনীতিতে গতি আনার জন্য একটি বড় সুযোগ।

তবে কেউ একা সবকিছু পরিবর্তন করতে পারে না। আমাদের দেশে মন্ত্রণালয়গুলো অতিরিক্ত আমলানির্ভর হয়ে গেছে। ভারতের দিকে তাকালে দেখবেন, সেখানে আমলাদের পাশাপাশি মন্ত্রীদের টেকনিক্যাল উপদেষ্টা থাকে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে যদি এমন একটি পেশাদার ও কারিগরি দল থাকে, তবে মন্ত্রীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস পান এবং শুধু আমলাদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয় না।

আমলারা যে সবসময় শুধু বাধাই দেন, তা নয়। সঠিক আলোচনার মাধ্যমে নীতির উদ্দেশ্য পরিষ্কার করলে তারাও সহযোগিতা করেন। অর্থনীতি মূলত ভুল থেকে শেখার মাধ্যমে এগোয়। তবে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে, অন্তত যেসব বড় ভুলের কথা আমরা আগে থেকেই জানি, সেগুলো যেন দ্রুত সংশোধন করা হয়।

স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

এ কে এনামুল হক: ধন্যবাদ আপনাদেরকেও।

শ্রুতিলিখন: মুজাহিদুল ইসলাম

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত