দোহারে ঋণের কিস্তি আদায়ে চাপ, ৬ দিনের ব্যবধানে মা ও মেয়ের মৃত্যু

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা)

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৬, ২২: ২৫
দোহারে মারা যাওয়া শেখ রেহানার বাড়ি। স্ট্রিম ছবি

ঢাকার দোহারে এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ও কর্মকর্তাদের হুমকিতে অসুস্থ হয়ে মা ও মেয়ের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে এই দুই মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল সোমবার (২৯ জুন) উপজেলার নাগেরকান্দা এলাকায় ঋণগ্রহীতার মা শেখ রেহানা (৭৫) মারা যান। এর ছয় দিন আগে গত বুধবার (২৪ জুন) মারা যান তাঁর মেয়ে লাভলী আক্তার (৫৫)। লাভলী আক্তার উপজেলার খালপাড় এলাকার মৃত শেখ শহীদের স্ত্রী এবং এনজিওর ঋণগ্রহীতা ছিলেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।

মারা যাওয়া দুজনের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে ‘রুরাল কনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশন’ নামের একটি এনজিওর বটিয়া শাখা থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণ নেন লাভলী আক্তার। মাসিক ৩০ হাজার টাকা হিসেবে এক বছরের জন্য এই ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। ওই টাকা তিনি তাঁর ছেলে মো. লিয়াকতকে সৌদি আরবে পাঠাতে খরচ করেন। শুরুতে প্রবাস থেকে পাঠানো টাকায় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলেও গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে তাঁর ছেলে কাজ হারান। ফলে গত চার মাস ধরে তিনি কিস্তি দিতে পারছিলেন না। এই কারণে এনজিও কর্মকর্তারা তাঁকে নানাভাবে চাপ দিতে থাকেন। তাঁদের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে মেয়ের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন লাভলী।

এদিকে এনজিওর লোকজন লাভলী আক্তারকে না পেয়ে তাঁর বাবার বাড়ি নাগেরকান্দায় গিয়ে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এতে বাধ্য হয়ে স্বজনেরা দুই কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন। গত ১৮ মে এনজিও কার্যালয় থেকে ঋণগ্রহীতা ও জামিনদারদের ঠিকানায় নোটিশ দেওয়া হয়। লাভলী আক্তার ছাড়াও ঋণে জামিনদার হওয়া তাঁর মেজো ভাইয়ের স্ত্রী রীনা আক্তার ও পুত্রবধূ সুমা আক্তার এই চিঠি পান। পরে এনজিওর কর্মকর্তারা জানতে পারেন লাভলী আক্তার তাঁর মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছেন। গত ২৪ জুন পুলিশ নিয়ে ওই বাড়িতে গিয়ে লাভলী আক্তারকে ধরে আনা হবে—এমন ভয়ভীতির মধ্যে ওই দিনই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার দিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক লাভলী আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন।

লাভলী আক্তারের মৃত্যুর পরও বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য তাঁর বৃদ্ধা মা শেখ রেহানাকে চাপ দিতে থাকেন এনজিওর কর্মীরা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যার দিকে তাঁরা লাভলীর বাবার বাড়িতে যান। সেখানে লাভলীর টাকা পরিশোধ না করলে তাঁর মাকে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এতে আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়া রেহানা বেগমকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি দোহার থানা-পুলিশকে জানানো হলে লাশ থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। তবে ঝামেলা মনে করে লাশ থানায় না নিয়ে রাত ১০টার দিকেই দাফন করা হয়।

নাগেরকান্দা এলাকার রহিচ লস্কর জানান, ছয় দিনের ব্যবধানে মা ও মেয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এনজিও কর্মকর্তাদের আচরণ ও ভয়েই তাঁরা অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। লাভলী আক্তারের ভাই নুরুল ইসলাম জানান, তাঁর মা ঋণের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। গতকাল সন্ধ্যায় এনজিওর লোকজন বাড়িতে এসে তাঁর মায়ের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে। তিনি বলেন, ‘মাকে পুলিশের ভয় দেখালে তিনি সিঁড়িতে দাঁড়ানো অবস্থায় পড়ে গিয়ে মারা যান। এনজিওর চাপ সইতে না পেরে আমার মা ও বোন মারা গেছেন। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই।’

মা ও মেয়ের মৃত্যুর ঘটনা এলাকায় আলোচিত হওয়ার পর থেকে ‘বাবু’ নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি মীমাংসার জন্য তদবির করছেন বলে অভিযোগ করেছেন নুরুল ইসলাম। আজ মঙ্গলবার বিকেলে নুরুল ইসলামের ফোনে কল দেওয়া হলে বাবু সেটি রিসিভ করে বলেন, ‘মানুষ তো মরেই গেছে, এ নিয়ে ঝুটঝামেলা করে কী হবে। বাদ দেন।’

লাভলী আক্তারের ঋণের টাকা আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন ওই এনজিওর কর্মী উল্লাস বিশ্বাস। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির শাখা ব্যবস্থাপক আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘লাভলী আক্তার ৬ মাস আগেই ঋণখেলাপি হয়েছেন। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর ঋণ মওকুফের জন্য আমরা ডেথ সার্টিফিকেট আনতে ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম। সে সময় তাঁরা আমাদের কাছে মৃত ব্যক্তির জন্য টাকা দাবি করেন। পরে আমরা সেখান থেকে চলে আসি।’

এই মৃত্যুর বিষয়ে জানতে আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুবকর সিদ্দিককে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের লিখিতভাবে জানালে আমরা ওই এনজিওর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত