ফিরল ৯ প্রবাসীর মরদেহ/ছেলের ভালো আয়ের স্বপ্ন এখন বাবার ঋণের বোঝা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

ভালো আয়ের স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালে সৌদি আরব পাড়ি জমান নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার মহিষডাঙা গ্রামের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম। এ সময় জমি-বাড়ি বন্ধক দিয়ে ও কিস্তিতে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলের পাশে দাঁড়ান বাবা মো. আশরাফুল ইসলাম। সেই ঋণ শোধ হওয়ার আগেই লাশ হয়ে দেশে ফিরলেন রবিউল ইসলাম। এর ফলে ছেলের ভালো আয়ের স্বপ্ন এখন বাবার ঋণের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশী কর্মীর মধ্যে ৯ জনের মরদেহ আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দেশে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে একজন রবিউল ইসলাম।

ছেলের লাশ গ্রহণ করে রবিউল ইসলামের বাবা আশরাফুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার অনেক ঋণ আছে। সরকার যদি একটা ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে হয়তো এই ঋণগুলো থেকে আমি রক্ষা পাব। অনেক ঋণ আছে, ঘরবাড়ি কিছু নাই, পরিস্থিতি খুব খারাপ। সরকার যদি একটু দেখত, তাহলে পরিবারটা একটু ভালো চলত। কোনো একটা চাকরি-বাকরি কোনো কিছু দিত তাহলে ভালোভাবে চলতে পারতাম।’

শুধু রবিউল ইসলামের বাবা আশরাফুল ইসলামই নন, একই কথা জানান মো. ফরিদ ও আব্দুল জলিল সরদারের স্বজনেরা। সবার কাছে ঋণ এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের বাসিন্দা মো. ফরিদের স্ত্রী সুখী স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার ফ্যামিলিতে বাইরে যাওয়ার মতো কোনো টাকাপয়সা ছিল না। প্রত্যেকটা টাকা ঋণ করে নেওয়া। কিস্তিতে আছে, এনজিওতে আছে, প্রবাসী ব্যাংকে আছে, এক কথায় সব জায়গা থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন তো আমার ফ্যামিলিতেও কেউ নাই। যে একজন ছিল, সে তো এখন হারাইয়া গেছে। আমাদের আর্থিক অবস্থাও খুব খারাপ। যদি কিছু সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে সরকার, তাহলে ভালো হয়।’

নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার পারকাসুন্দা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল সরদারের ছোট মেয়ের জামাই মো. শাওন বলেন, ‘এখন আমাদের পরিবারের খুব খারাপ অবস্থা। পরিবারের দিকে কেউ তো এখন নাই। এক ছোট ছেলে আছে, ও মাদ্রাসায় পড়ে। ও ছাড়া তো আর কেউ নাই। এখন যেভাবে হোক কষ্ট করে চলছে। আয় করার কেউ নাই।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে লাশগুলো দেশে পৌঁছানোর পর তাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে গেল ৯ অগাস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তারা প্রাণ হারান। এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত করে। এদের মধ্যে নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার ৭ জন, নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার ১ জন এবং রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার ১ জন রয়েছেন।

সৌদি দূতাবাসের তালিকায় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর আত্রাইয়ের ৭ জন হলেন—উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের গাফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দিনের ছেলে ফরিদ উদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা, মার্কাসুন্দা গ্রামের তমেজউদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল।

এ ছাড়া ওই বিমানে নাটোরের নলডাঙ্গা থানার মহিষডাঙা গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মরুগ্রাম গ্রামের কলিমুদ্দিন মাঝির ছেলে শ্যামল উদ্দিন মাঝির লাশ পাঠানো হয়েছে।

বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে নিহত কর্মীদের লাশ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

মরদেহ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সামনে মন্ত্রী বলেন, ‘ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাকি ৭ জন নিহত কর্মীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় সিআইডির তত্ত্বাবধানে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহত ৯ কর্মীর প্রতি পরিবারের জন্য লাশ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং এককালীন আর্থিক অনুদান বাবদ ৩ লাখ টাকা করে মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা বিদেশে যান, অনেক কষ্টের কাজ করে পরিবারের জন্য টাকা পাঠান। যারা মারা গেছেন, যাদের মৃতদেহ এখনো আনতে পারিনি দেশে, তাদের মৃতদেহ দেশে আনতে সৌদি দূতাবাসের সবাই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। যেহেতু আগুন লেগেছে, তাদের ডিএনএ টেস্ট হবে, পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে, দ্রুত দেশে ফেরত আনা হবে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত