জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বৈঠক করে হত্যার সিদ্ধান্ত, আরসিইউতে পুলিশ-ছাত্রলীগের মহড়া: ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। স্ট্রিম ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বৈঠক করে ছাত্র-জনতাকে ‘শেষ করে দেওয়ার’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য এসেছে। মাঠপর্যায়ে র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দলীয় ক্যাডারদের যৌথ হামলা এবং মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র মহড়ার বর্ণনা দিয়েছেন আরেক সাক্ষী।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুজনের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

এদিন প্রসিকিউশনের চার নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শহীদ আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারীর বাবা আল আমিন পাটোয়ারী। আর ৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে ফেরা ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবু জুহামুল ইসলাম।

শীর্ষপর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও হাসপাতালের মেঝেতে লাশের স্তূপ

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ৬৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আল আমিন পাটোয়ারী বলেন, তার ছেলের হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ অন্যরা দায়ী বলে তিনি জানতে পেরেছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, তারা বৈঠক করে ও কারফিউ জারি করে আন্দোলন দমনের উদ্দেশে ছাত্র-জনতাকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ছেলের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে এজলাসে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই বাবা। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন তার ৩৫ বছর বয়সী ছেলে মো. আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী।

ওইদিন বিকেল ৫টায় ছেলের মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে তিনি খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে লোকমুখে জানতে পারেন, ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মিরপুর-১০ নম্বরের ডা. আজমল হাসপাতালে আছেন। খবর পেয়ে স্ত্রী ও ছোট ছেলে মো. আব্দুল্লাহকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান তিনি।

আল আমিন পাটোয়ারী বলেন, হাসপাতালের মেঝেতে তার ছেলেসহ ১৫-২০ জনের লাশ দেখতে পান, যারা সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। হাসপাতালে ছেলে ও অন্যান্যদের শরীরে রক্ত দেখে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এরপর ছেলের মৃত্যুসনদপত্র সংগ্রহ করে লাশ রূপনগর আবাসিক এলাকার বাসায় নিয়ে আসেন এবং রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে লক্ষ্মীপুরে গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করেন। আদালতের কাছে ন্যায়বিচারের চেয়ে তিনি বলেন, এমন শান্তি চান, যেন ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।

আরসিইউতে ঢুকে পুলিশ-ছাত্রলীগের হুমকি

এদিন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন জুলাই অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী আবু জুহামুল ইসলাম। তার জবানবন্দিতে উঠে আসে রাজপথ থেকে শুরু করে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও (আরসিইউ) আন্দোলনকারীদের ওপর নিপীড়নের চিত্র।

জুহামুল জানান, ১৮ জুলাই তিনি মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে আন্দোলনে অংশ নেন। সেদিন পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি বর্ষণ করে।

১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর বিজিবি ও পুলিশ আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলি করে এবং র‍্যাব হেলিকপ্টারযোগে ওপর থেকে গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগও ছিল এবং সেদিন তিনি নিজের চোখের সামনে অনেককে আহত ও নিহত হতে দেখেন।

২০ জুলাই কারফিউ শিথিলের সময় দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত মিরপুর ১০ নম্বরে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‍্যাব এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ অবস্থান গ্রহণ করে। দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে প্রচণ্ড শব্দে একটি গুলি তার বুকের ওপরের অংশে বাম দিকে বিদ্ধ হয়ে হাড় ভেঙে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়।

গুলিবিদ্ধ হয়ে কিছুটা দৌড়ে পড়ে যাওয়ার পর রক্তক্ষরণ দেখে দুজন রিকশাচালক তাকে কাজীপাড়ায় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। পরে একজন বিআরটিসি বাসের চালক ও এক স্কুলছাত্র তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যায়।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অনেক আহত ও নিহত মানুষের দৃশ্য দেখার কথা জানান জুহামুল। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং সন্ধ্যায় তার অস্ত্রোপচার হয়। অপারেশনের পর তাকে আরসিইউতে নেওয়া হয় বলেও তিনি জবানবন্দিতে জানান।

গণঅভ্যুত্থানকালীন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, ২১ জুলাই সকাল ৯টার দিকে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সদস্যরা অস্ত্র ও বাঁশের লাঠিসহ বক্ষব্যাধি হাসপাতালের আরসিইউতে প্রবেশ করে মুমূর্ষু রোগীদের গালাগালি করতে থাকে। তারা চিকিৎসাধীনদের ছবি তুলে নেয় এবং তাদের নামে মামলা দেয়। ৭ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এই ঘটনার জন্য তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ অন্যদের দায়ী করে ট্রাইব্যুনালে বিচার চেয়েছেন।

জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর সাক্ষীদের জেরা করেন আসামিপক্ষ সালমান ও আনিসুলের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন।

আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্য প্রসিকিউটররা।

সম্পর্কিত