মানবতাবিরোধী অপরাধ: ইনুর মামলা পুনর্তদন্ত ও সাক্ষী তলবের আবেদন খারিজ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৫: ৫৩
হাসানুল হক ইনু। সংগৃহীত ছবি

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর পুনর্তদন্ত (রি-ইনভেস্টিগেশন) ও সাক্ষী তলবের (রিকল) আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। আবেদন দুটিকে ফ্রিভোলাস (অসার) এবং বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার কৌশল (ডিজাইন) হিসেবে মন্তব্য করে ট্রাইবুনাল যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) শুরুর আদেশ দেন।

অন্যদিকে, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসামিপক্ষ দাবি করেছে, প্রসিকিউটরদের নিজেদের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং স্বার্থের সংঘাতের কারণে ন্যায়বিচারের স্বার্থেই পুনঃতদন্ত ও সাক্ষীদের পুনরায় জেরা করা প্রয়োজন ছিল।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই আদেশ দেন । বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

এদিন যুক্তিতর্ক শুরুর আগে আসামিপক্ষ পুনঃতদন্ত ও সাক্ষীদের পুনরায় তলব করার দুটি পৃথক আবেদন দাখিল করে। এর বিরোধিতা করেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ‘ক্রিমিনাল কেসে রি-ইনভেস্টিগেশন তো হয় না। আসামিপক্ষ এই মামলাকে নিউজ আইটেম (সংবাদের খোরাক) করার জন্য এই আবেদন করেছে।’ মামলাটি নিয়ে আসামিপক্ষ যেন এমন ‘নিউজ আইটেম’ করতে না পারে, সেজন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে রুল প্রার্থনা করেন চিফ প্রসিকিউটর।

শুনানি শেষে ‘মোবাশ্বের আলী বনাম রাষ্ট্র’ মামলার আইনি রেফারেন্স টেনে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘রি-ইনভেস্টিগেশন বা পুনঃতদন্ত করা যায় না, তবে ফার্দার ইনভেস্টিগেশন বা অধিকতর তদন্ত হতে পারে।’ এরপর উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনাল আবেদন দুটি খারিজ করে দেন। আদালত মন্তব্য করেন, এটি ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার একটি ডিজাইন (কৌশল)।

আবেদন খারিজের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক ইনু এই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন। তবে এদিন আর্গুমেন্ট শেষ না হওয়ায় তিনি সময়ের আবেদন জানান। ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন মঞ্জুর করে আগামী সোমবার (৬ এপ্রিল) পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেন।

ট্রাইব্যুনালে আবেদন খারিজ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সাংবাদিকদের কাছে তাদের অভিযোগের বিস্তারিত কারণ তুলে ধরেন। তদন্ত প্রক্রিয়া, প্রসিকিউশনের ভূমিকা এবং সাক্ষীদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী সিফাত মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, গত ১০ মার্চ এই মামলার সর্বশেষ শুনানির পর গণমাধ্যমে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যা দেখে তারা বিস্মিত হয়েছেন।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও তার টিমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ দাবি করে তিনি বলেন, ‘পুরো জুলাই-আগস্টের মামলাগুলোর তদন্ত নিয়ে যে সংবাদ বের হয়েছে, তাতে আমরা মনে করি ট্রাইব্যুনালও কিছুটা বিব্রত হয়েছেন। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর এবং তার টিম যে মামলাগুলো তদন্ত করে ফরমাল চার্জ দাখিল করেছেন, পুরো প্রক্রিয়াটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জুলাই-আগস্টের মামলাগুলো করার ক্ষেত্রে তার বড় ধরনের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট (স্বার্থের সংঘাত) ছিল।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) একটি প্রসঙ্গের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘ফিলিপাইনের দুতার্তের মামলার ক্ষেত্রে ওখানকার প্রসিকিউটর করিম খানের কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের কারণে তাকে যেভাবে মামলা থেকে বারণ করা হয়েছিল, এটি সেটার সমতুল্য।’

আইনজীবীদের আইনি যুক্তিতর্কে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনে সিফাত মাহমুদ বলেন, ‘এই মামলায় যখন আমরা ডিসচার্জ পিটিশন ও পরে রিভিউ পিটিশন দিই, তখন আমাদের একটি শব্দ উল্লেখ করে তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর বলেছিলেন—আমাদের এই বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। আদালতের ভেতরে আইনজীবীর আইনি যুক্তিতর্ক করার কারণে রাষ্ট্রদ্রোহিতার হুমকি দেওয়া হলে, তা বিচারকাজ পরিচালনা ও আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।’

সাক্ষী হিসেবে পিডব্লিউ-২ (বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা) এবং পিডব্লিউ-১০ (আব্দুল্লাহ আল মামুন ) কে পুনরায় তলব করার কারণও ব্যাখ্যা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব নিয়ে দুই প্রসিকিউটরের মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি উল্লেখ করে আইনজীবী সিফাত মাহমুদ বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে তানভীর হাসান জোহার নাম ঘুরেফিরে শুনছি। গতকালের খবরেও দেখলাম, দুজন প্রসিকিউটর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন। একজন বলছেন ট্রাইব্যুনাল থেকে হার্ডড্রাইভ ও সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না, আরেকজন বলছেন এটা দেখার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়নি। এই ধরনের একটি প্রসিকিউশন টিম যখন গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনা করে, তখন পুরো বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ কারণেই আমরা তাদের এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জেরা করার সুযোগ চেয়েছিলাম।’

একই বিষয়ে আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী আবুল হাসান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি ট্রাইব্যুনালের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর জোহা প্রসিকিউটর তামিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন, আবার তামিম সেটা অনভিপ্রেত বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তানভীর জোহা আবার এই মামলার সাক্ষী। এখানে তো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের একটা ব্যাপার আছে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই আমরা সাক্ষী রিকল ও রি-ইনভেস্টিগেশনের আবেদন করেছিলাম।’

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় সাতজনকে হত্যাসহ মোট আটটি অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে।

মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর বিভিন্ন মামলায় হেফাজতে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত শেষে গত বছরের (২০২৫) ২ নভেম্বর এই মামলায় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ইনুর আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত ১১ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলায় ২ এপ্রিল যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেছিল। এর আগে গত ট্রাইব্যুনালে ৬৪ পৃষ্ঠার একটি লিখিত বক্তব্য জমা দিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন ইনু। ওই লিখিত বক্তব্যে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে ‘কাল্পনিক’ ও ‘পুরোপুরি বানোয়াট’ বলে দাবি করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার মামলাটির যুক্তিতর্ক শুরু হলো।

সম্পর্কিত