leadT1ad

৫৬ বছরে পা দিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সংগৃহীত ছবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। দেশের অন্যতম স্বায়ত্তশাসিত এবং একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টি গৌরব, ঐতিহ্য ও অগ্রযাত্রার ৫৫ বছর পার করে আজ ১২ জানুয়ারি ৫৬ বছরে পা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার পূর্ব নাম ‘জাহাঙ্গীরনগরের’ সঙ্গে মিল রেখে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ নামকরণ করে তৎকালীন সরকার। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম আহসান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

এরপর ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট পাস হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’ রাখা হয়। ১৯৭০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে নিযুক্ত হন বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিন আহমদ।

প্রতিষ্ঠালগ্নে, ১৯৭০-৭১ শিক্ষাবর্ষে অর্থনীতি, ভূগোল, গণিত ও পরিসংখ্যান, এই চার বিভাগে ১৫০ জন শিক্ষার্থী ও ২১ জন শিক্ষক নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে জাবিতে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউটে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার। সংগৃহীত ছবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার। সংগৃহীত ছবি

বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষে অধ্যয়নরত রয়েছেন মোট ১২ হাজার ৩৭৯ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য রয়েছে ছেলেদের ১১টি ও মেয়েদের ১০টি, মোট ২১টি আবাসিক হল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ৭১২ জন। শিক্ষাছুটিসহ বিভিন্ন ছুটিতে রয়েছেন ১০৬ জন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করতে ৩৫৩ জন কর্মকর্তা নিযুক্ত আছেন। এছাড়া রয়েছেন ৯৪০ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী এবং ৫৪৮ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।

৬৯৭ দশমিক ৫৬ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে কিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনা।এর মধ্যে রয়েছে- দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিপূর্ণমূলক ভাস্কর্য ‘অমর একুশ’, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের নামে প্রাচীন গ্রিসের নাট্যমঞ্চের আদলে তৈরি ‘সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চ’, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ ‘অদম্য ২৪’।

প্রাণ-প্রকৃতিতে অনন্য এক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য আলাদা সুনাম রয়েছে জাবির। বিভিন্ন জলাশয় আর সবুজ বনানীতে ঘিরে আছে পুরো ক্যাম্পাসটি। অতিথি পাখির অভয়ারণ্যও বলা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে। প্রতি বছর শীত মৌসুমে সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলোতে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখি। স্ট্রিম ছবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি পাখি। স্ট্রিম ছবি

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরাও এই প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় তৎপর। প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ইতিমধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র (ডাব্লিউআরসি) ও প্রজাপতি পার্ক স্থাপন করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে।

‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ জাহাঙ্গীরনগর

মুক্ত বুদ্ধি ও মুক্ত সংস্কৃতি চর্চা করেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানাবিধ কার্যক্রম ও সাফল্য জাবিকে এনে দিয়েছে সংস্কৃতিক রাজধানীর খেতাব। সংস্কৃতি চর্চার জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন। নাটক, সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্য পরিবেশনা, বির্তক, সেমিনার ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকে এসব সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলো।

সংস্কৃতিক ও অসংখ্য জ্ঞানী মানুষের সংস্পর্শ পেয়েছে জাবি। প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, লেখক হায়াত মামুদ, হুমায়ুন আজাদ, নাট্যকার সেলিম আল দীন, কবি মোহাম্মদ রফিক, মুস্তফা নূরুল ইসলাম, আবু রুশদ মতিনউদ্দিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, ইতিহাসবিদ বজলুর রহমান খান, তারেক শামসুর রহমান প্রমুখ।

বিভিন্ন সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান, লোকসাহিত্যবিদ মজহারুল ইসলাম, লেখক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আ ফ ম কামালউদ্দিন, আমিরুল ইসলাম চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ আব্দুল বায়েস, আলাউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান প্রমুখ। এছাড়াও রসায়নবিদ অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির ও ভাষাবিদ অধ্যাপক ড. দানিউল হক এখানকার শিক্ষক ছিলেন।

বিগত বছরে যত পাওয়া

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিল ছাত্রসংসদ নির্বাচন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হয় শিক্ষার্থীদের বহুল প্রতীক্ষিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন।

২০২৫ সালে বিশ্বসেরা দুই শতাংশ গবেষকের তালিকায় স্থান পান জাবির সাত শিক্ষক ও এক শিক্ষার্থী। এছাড়াও প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করতে পেরেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শ্রেণি কার্যক্রম শুরুর আগেই তাদের স্ব স্ব সিট বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে প্রশাসন।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান রয়েছে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প। এর অন্তর্ভুক্ত নতুন ছয়টি আবাসিক হলের কাজ শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে চলমান রয়েছে লেকচার থিয়েটার, পরীক্ষার হল, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, নতুন লাইব্রেরি ভবন ও ছাত্রীদের জন্য খেলার মাঠসহ বিভিন্ন স্থাপনার নির্মাণ কাজ।

সাফল্য, অর্জনের পাশাপাশি অপূর্ণতা, সীমাবদ্ধতা

বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সফলতা রয়েছে, রয়েছে অর্জন। এসবের পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা। গতবছর বিশ্বসেরা দুই শতাংশ গবেষকের তালিকায় স্থান পান জাবির সাত শিক্ষক। তবে সকল বিভাগে মানসম্মত গবেষণা হয় না। শিক্ষার্থীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত গবেষণা ফান্ড।

কিছু বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে রয়েছে ক্লাসরুম সংকট। অভিযোগ আছে, এক শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা হলে, অন্য শিক্ষার্থীরা ক্লাস করার সুযোগ পান না। এর পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষক সংকট।

ডিজিটাল যুগে এসেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজ হয় সনাতন পদ্ধতিতে। নেই অটোমেশন। পরীক্ষার ফরম পূরণ ও রেজাল্ট উত্তোলনের জন্য প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন বিভাগে ঘুরতে হয় শিক্ষার্থীদের। এতে করে হয়রানির শিকার হন তারা। এ বিষয়ে একাধিকবার প্রশাসনকে অবগত করা, আন্দোলন করা হলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই। চিকিৎসা কেন্দ্রের কোন উন্নয়ন বা বাজেট বৃদ্ধিতেও প্রশাসনের উদাসীনতা লক্ষণীয়।

চলমান অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সকল সমস্যার সমাধান হবে বলে স্ট্রিমকে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এসব সংকট ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে আমরা সোচ্চার।’

শেষ হয়নি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার মদদ দেওয়া অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচারকাজ। তদন্তেও মন্থরগতি। এই হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ জন শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ৯ জনকে সাময়িক বরখাস্ত ও বাকিদের সংশ্লিষ্টতা ও অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য স্ট্রাকচার্ড কমিটি গঠন করা হয়। দ্রুতসময়ে অভিযুক্ত ২৮৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৮৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হলেও শিক্ষকদের বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরে চলছে। কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুর রব বলেন, ‘সুষ্ঠুভাবে বিচার করতে সময় লাগবে। শিক্ষার্থীদের বিচার হয়েছে, শিক্ষকদেরও হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি

প্রতিবছরের ন্যায় এবারও নানাবিধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সকাল সাড়ে ৯টায় পুরাতন কলা ভবনের সামনে ‘মৃৎমঞ্চে’ জমায়েত হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এরপর সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলন এবং বিশ্ববিদ্যালয় দিবস-২০২৬ উদ্বোধন করা হয়েছে।

এরপর সারা দিনব্যাপী প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচি, যেমন- শোভাযাত্রা, রাগিণী সংগীত, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ফুটবল ও হ্যান্ডবল ম্যাচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি। সবশেষে, রাত সাড়ে ৮টায় জাকসু আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচি শেষ হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত