জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

পঞ্চম পর্ব

চর্যাপদ থেকে চব্বিশ: বাংলার ওপর ভাষা বিপন্নতার প্রভাব

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ১৮
চর্যাপদ থেকে চব্বিশ: বাংলার ওপর ভাষা বিপন্নতার প্রভাব। এআই জেনারেটেড ছবি

বাংলা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা, যা প্রধানত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামের কিছু অংশ ও ত্রিপুরায় প্রচলিত। ২৫-৩০ কোটিরও বেশি ভাষাভাষী নিয়ে বাংলা পৃথিবীর পঞ্চম থেকে সপ্তম সর্বাধিক কথিত ভাষা। বাংলা তার নিজস্ব লিপি ব্যবহার করে, যা ব্রাহ্মী লিপির একটি রূপভেদ। এটি একটি ‘অবুগিদা’ ধরনের লিপি—অর্থাৎ প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত স্বরধ্বনি থাকে, যা বিভিন্ন মাত্রা বা চিহ্ন যোগের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়। যেমন ‘ক’ ব্যঞ্জনধ্বনিকে বিভিন্ন মাত্রা যোগ করে ‘কি’, ‘কু’, ‘কে’ ইত্যাদিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

বাংলা ভাষায় স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সমৃদ্ধ ভাণ্ডার রয়েছে, এবং আঞ্চলিক উপভাষার প্রভাবে ধ্বনিগত বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। যদিও বাংলায় স্বরাঘাতভিত্তিক ধ্বনি-ব্যবস্থা কিছুটা বিদ্যমান, তা অন্যান্য ভাষার মতো ততটা প্রকট নয়। পুরান ঢাকা, সিলেটি, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, বরিশাল, চট্টগ্রাম প্রভৃতি উপভাষায় স্বরনিয়ন্ত্রণ ও জোরপ্রয়োগের ধরনে পার্থক্য দেখা যায়।

বাংলা বাক্যগঠন সাধারণত Subject–Object–Verb (SOV) কাঠামো অনুসরণ করে। এতে রূপান্তরমূলক রূপতত্ত্ব বিদ্যমান—অর্থাৎ ক্রিয়াপদ কাল, দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাব অনুসারে রূপান্তরিত হয়, এবং বিশেষ্য পদ বিভক্তি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। সম্মানসূচক সম্বোধনের ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষা বিশেষভাবে সমৃদ্ধ, বিশেষত বয়োজ্যেষ্ঠ বা কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সম্বোধনের সময়।

এই পর্বে বাংলা ভাষার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি অন্যমাত্রায় পুনরুল্লেখ এবং এর সম্ভাব্য অবক্ষয়, বিকৃতি বা বিলুপ্তির ঝুঁকি নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলোঃ

ইতিহাস ও বিবর্তন

বাংলা ভাষার ইতিহাস অন্যান্য ইন্দো-আর্য ভাষার মতোই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার থেকে উৎসারিত। এই ভাষাগোষ্ঠী আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে ইন্দো-ইরানীয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তার লাভ করে। সংক্ষেপে বাংলার বিবর্তনধারা এভাবে উপস্থাপন করা যায়ঃ

ইন্দো-ইউরোপীয় → ইন্দো-ইরানীয় → সংস্কৃত প্রভাব → প্রাকৃত → অপভ্রংশ → প্রাচীন বাংলা (১২–১৩শ শতক) → মধ্যযুগীয় বাংলা (১৪–১৬শ শতক) → আধুনিক বাংলা (১৯শ শতক–বর্তমান)।

বাংলা ভাষার বিকাশ বঙ্গ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার বিকাশকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশেষত বাংলায় মুসলিম শাসনামলে ফারসি ও আরবি ভাষার প্রভাব এ ভাষার শব্দভাণ্ডার, রচনাশৈলী ও ভাবপ্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বঙ্গীয় নবজাগরণের সময় বাংলা ভাষা ব্যাপক আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে, বিশেষত সাহিত্যক্ষেত্রে অগ্রসর হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলা ভাষা একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গভীর প্রভাব ফেলে। এই আন্দোলন বাংলা ভাষাকে ‘মাতৃভাষা’, ‘জাতীয় ভাষা’ এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গোটা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করে।

সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব

বাংলা ভাষার সাহিত্য ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং ১৯১৩ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কবি ও সাহিত্যিকের অসামান্য রচনা বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। এছাড়া আগের পর্বগুলোতে আলোচিত চর্যাপদ, লোকসংগীত, মরমি পদাবলি, কাব্য ও নাট্যধারা—সব মিলিয়ে বাংলা একটি সুপ্রাচীন ও বহুমাত্রিক সাহিত্য ঐতিহ্যের ধারক।

মহাকবি আলাওলের পদ্মাবতী, বিদ্রোহী কবি নজরুলের অগ্নিবীণা, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি, রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের আমার কথা, রুপশী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন—এসব রচনা বাংলা ভাষাকে সাহিত্য ও শিল্পকলার ভাষা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলা এখনও কবিতা, সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্রে সাংস্কৃতিক প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বিশেষ করে রমজান, ঈদ এবং সাম্প্রতিক সামাজিক আন্দোলন সমূহে নজরুলের বিপ্লবী কবিতা, হামদ ও নাতে রাসুলের পরিবেশন বাংলা ভাষার গভীর সাংস্কৃতিক ও আত্মিক ভূমিকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা

বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা এবং জাতীয় পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। পাকিস্তান সরকার যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। ছাত্রদের আত্মোৎসর্গ এই আন্দোলনকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব দেয় এবং বাংলা ভাষাকে শিক্ষা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকারকে দৃঢ় করে।

এই আন্দোলন বাংলা ভাষাকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ‘মাতৃভাষা’, ‘জাতীয় ভাষা’ এবং স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এর প্রভাব বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি

বাংলা ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ যে ভাষাগুলিকে বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করে, বাংলা তার অন্যতম। এই দিবসটি ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে ধারণ করে। এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি কেবল বাংলা ভাষার গুরুত্বকেই প্রতিষ্ঠিত করে না, বরং বাংলা ভাষাভাষীদের একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে।

আধুনিক ব্যবহার ও প্রভাব

বর্তমান উত্তরাধুনিক বিশ্বে বাংলা ভাষা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং অনলাইন শিক্ষায় সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারনেটে এর উপস্থিতি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে বাংলা এখনও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

প্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজন

ঐতিহাসিকভাবে ডিজিটাল পরিসরে বাংলা ভাষার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে বাংলা ভাষাকে একীভূত করার প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছে। বাংলা ফন্ট সহজলভ্য হচ্ছে, স্থানীয়করণভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে এবং বাংলা ওয়েবসাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্মার্টফোন ও বাংলা-ভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তার তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে বিপরীতভাবে মনে রাখতে হবে, ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা; এটি যেমন বিকশিত হয়, তেমনি অস্তিত্বগত সংকটের মুখেও পড়তে পারে। কোনো ভাষা হুমকির সম্মুখীন হলে সাধারণত তার ভাষাভাষী সম্প্রদায় বিপন্ন হয় অথবা ভাষাটি ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হয়। বিভিন্ন কারণ ভাষার অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, এবং বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই এই হুমকিগুলো চিহ্নিত করে ভাষা সংরক্ষণের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

ভাষা স্থানান্তর

ভাষা স্থানান্তর ঘটে যখন একটি ভাষার বক্তারা সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক চাপের কারণে ধীরে ধীরে অন্য একটি ভাষা গ্রহণ করতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে এ প্রক্রিয়ায় মূল ভাষাটি পরিত্যক্ত হয়ে প্রভাবশালী ভাষাটি মূল ভাষার জায়গাকে প্রতিস্থাপন করে নেয়। সাধারণত যখন নতুন প্রজন্ম তাদের ঐতিহ্যগত ভাষার মূল্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তখন এ প্রবণতা দেখা যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কোনো সম্প্রদায় তাদের স্থানীয় বা আঞ্চলিক ভাষা ত্যাগ করে একটি বৈশ্বিকভাবে প্রভাবশালী ভাষা, যেমন উন্নত শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা বা অর্থনৈতিক উন্নতির আশায়, আরবি, ইংরেজি, ফরাসি, মান্দারিন বা স্প্যানিশ ভাষা গ্রহণ করতে পারে। বিশ্বের বহু আদিবাসী ভাষার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুন প্রজন্ম ক্রমশ জাতীয় বা বৈশ্বিক ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যার ফলে ধীরে ধীরে মূল ভাষার ক্ষয় সাধিত হচ্ছে।

ঔপনিবেশিকতা ও রাজনৈতিক দমন

ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো উপনিবেশ-এর জনগণের ওপর নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষাকে নিরুৎসাহিত, বিকৃত বা নিষিদ্ধও করেছে। প্রশাসন, শিক্ষা ও বাণিজ্যের ভাষা হিসেবে ঔপনিবেশিক ভাষা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দেশীয় ভাষাগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ঔপনিবেশিক শাসক তাদের প্রণীত নীতিমালা উৎসাহিত করত, যেখানে জনগণকে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ভাষা শেখা ও ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো, আর স্থানীয় ভাষাগুলোকে উপেক্ষা বা নিষিদ্ধ করা হতো। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরও ভাষাগত বৈচিত্র্যের ক্ষয় ত্বরান্বিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়ে আদিবাসী ভাষাগুলো কঠোর দমনের মুখে পড়ে; ফলে বহু ভাষা বিলুপ্ত বা চরম বিপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে।

বিশ্বায়ন ও প্রভাবশালী ভাষার আধিপত্য

বিশ্বায়নের তীব্রতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিক্ষা, বিজ্ঞান, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তিতে কয়েকটি ভাষা প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। মানুষ ক্রমশ এসব বৈশ্বিক ভাষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় কম ব্যবহৃত ভাষাগুলো প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে। উত্তরাধুনিক বিশ্বে আরবি, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ ও মান্দারিন ভাষাকে বৈশ্বিক বাজার, বাণিজ্যিক সুযোগ ও গণমাধ্যমে প্রবেশের জন্য অপরিহার্য মনে করা হয়; ফলে অনেকেই নিজস্ব মাতৃভাষা ত্যাগ করে এসব ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ে। আলাস্কার ‘ইনুপিয়াত’ জনগোষ্ঠীর ভাষা ইংরেজির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের কারণে হুমকির মুখে, যদিও ভাষাটি তাদের গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ।

প্রজন্মান্তরে ভাষা সংক্রমণের ক্ষয়

যখন একটি ভাষা এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে আর সঞ্চারিত হয় না, তখন সেই ভাষা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। এটি ঘটে যখন তরুণ প্রজন্ম ভাষাটি শেখে না বা ব্যবহার করতে চায় না, এবং প্রবীণ ভাষাভাষীরা মৃত্যুবরণ করলে দক্ষ বক্তার সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে, যেমন অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের সন্তানরা প্রায়শই ইংরেজি ভাষায় বেড়ে ওঠে এবং তাদের পূর্বপুরুষের ভাষা বাংলা শেখে না। ফলে ভাষাগত ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আমাদের দেশীয় পরিবারগুলোর সন্তানরা যদি তাদের পূর্বপুরুষের মাতৃভাষা বাংলা না শেখে, তবে ভাষাগত ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, অভিবাসন বা অর্থনৈতিক চাপও শিশুদের ভাষাগত শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, স্পেন ও ফ্রান্সের বাস্ক অঞ্চলে ভাষা পুনরুজ্জীবনের নানা উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও, তরুণ প্রজন্ম ঐতিহাসিকভাবে বাস্ক ভাষার চেয়ে স্প্যানিশ ভাষা ব্যবহারে বেশি আগ্রহী; ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভাষাটি শিখবে কি না এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সামাজিক কলঙ্ক ও ভাষার মর্যাদা

কিছু ভাষাকে প্রভাবশালী ভাষার তুলনায় কম মর্যাদাসম্পন্ন বা ‘নিম্নস্তর’ হিসেবে দেখা হয়। এই সামাজিক কলঙ্ক ভাষা ব্যবহারে আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং বক্তাদের ভাষাটি পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চার বা জনজীবনে ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করে। অনেকেই মনে করে স্থানীয় বা আদিবাসী ভাষা উন্নতির পথে বাধা। তাই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, কর্মসংস্থান বা অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য তারা প্রভাবশালী ভাষা বেছে নেয়।

উদাহরণস্বরূপ মেক্সিকোয় একসময় ‘নাহুয়াতল’ (আজটেকদের ভাষা) আদিবাসী ভাষা হিসেবে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয়েছিল। ফলে বহু নাহুয়াতল ভাষাভাষী স্প্যানিশ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

সাংস্কৃতিক ক্ষয়

ভাষা সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সংস্কৃতি ক্ষয়প্রাপ্ত হলে তার সঙ্গে যুক্ত ভাষাও দুর্বল হয়ে পড়ে। ঐতিহ্যবাহী আচার, রীতিনীতি বা জীবনযাত্রা হারিয়ে গেলে ভাষাটির আধুনিক সমাজে প্রাসঙ্গিকতা কমে যায়। নগরায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং ঐতিহ্যভিত্তিক জীবনধারা থেকে সরে আসা ভাষার সাংস্কৃতিক তাৎপর্যকে ক্ষীণ করে, বিশেষত যখন ভাষাটি আর দৈনন্দিন জীবন, আচার-অনুষ্ঠান বা গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। উত্তর আমেরিকার বহু আদিবাসী ভাষা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে, কারণ সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক চর্চাগুলো আর ব্যাপকভাবে চর্চিত হচ্ছে না।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও ডিজিটাল বৈষম্য

ডিজিটাল জগৎ যোগাযোগের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠছে; ফলে যে ভাষাগুলোর অনলাইন বা প্রযুক্তিগত উপস্থিতি নেই, তারা পিছিয়ে পড়ছে। ডিজিটাল উপস্থিতি ছাড়া ভাষা আধুনিক বিশ্বে অদৃশ্য ও কম প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। বহু ছোট বা কম ব্যবহৃত ভাষার নিজস্ব ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপস্থিতি বা সফ্‌টওয়্যার সহায়তা নেই। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম অনলাইনে বেশি প্রচলিত ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বহু আফ্রিকান ও এশীয় ভাষার মতো বাংলাও বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পেতে সংগ্রাম করছে। এর ফলে ডিজিটাল পরিসরে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও দৃশ্যমানতা তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি

যুদ্ধ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠী ধ্বংস করে দিতে পারে। পারে, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে এবং ভাষাকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিতে। মানুষ যখন নিজ ভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়, তখন অনেক সময় তাদের পক্ষে নিজস্ব ভাষা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। বৃহৎ আকারের অভিবাসন, শরণার্থী সংকট ও গৃহযুদ্ধ সামাজিক সংহতি ভেঙে দেয়; নতুন সমাজে টিকে থাকতে গিয়ে মানুষ প্রভাবশালী ভাষা গ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে নিজ ভাষা ত্যাগ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের গৃহ সংঘাত থেকে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকট বা সিরিয়ার শরণার্থী সংকটে বহু মানুষ আশ্রয়দানকারী দেশের ভাষা বা উপভাষা গ্রহণ করেছে, যার ফলে তাদের নিজস্ব ভাষাগত পরিচয় ক্ষীণ বা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব

ভাষা টিকে থাকার জন্য শিক্ষা, গণমাধ্যমে ব্যবহার এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ে পাঠদান, সরকারি দাপ্তরিক নথিপত্র এবং গণমাধ্যমে যদি কোনো ভাষার ব্যবহার না থাকে, তবে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অনেক সময় সরকার বা প্রতিষ্ঠান সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাষাগত অধিকার স্বীকৃতি দেয় না, অথবা জাতীয় ভাষার পক্ষে অন্য ভাষার ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে। ফলে বহু আদিবাসী ভাষা জনজীবনে ব্যবহার ও প্রসারের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না পাওয়ায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

পরিশেষে, সবকিছু মিলিয়ে বাংলা একটি জীবন্ত, গতিশীল এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ভাষা, যার রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক গুরুত্ব, বিশেষত আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে। ইংরেজির মতো বৈশ্বিক ভাষার চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, বাংলা আমাদের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রধান বাহন হিসেবে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। ডিজিটাল জগৎ ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ এবং এর সমৃদ্ধ সাহিত্যধারা আজও এর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে সুদৃঢ় করে চলেছে।

ভাষার অস্তিত্বসংকট সাধারণত একাধিক আন্তঃসংযুক্ত কারণ দ্বারা প্রভাবিত, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত। একটি ভাষার টিকে থাকা কেবল বক্তার সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাষাটির মর্যাদা ও মূল্যায়নের ওপরও নির্ভরশীল। বিপন্ন ভাষা পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টা সাধারণত শিক্ষা, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ, নীতিগত সহায়তা এবং ডিজিটাল পরিসরে ভাষার উপস্থিতি নিশ্চিত করার সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ভাষা মহান আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের একটিঃ তিনি মানুষকে বাকশক্তি দান করেছেন, যার মাধ্যমে মানুষ অন্যান্য সৃষ্টির ওপর অনন্য মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে।

লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সম্পর্কিত