leadT1ad

খুলনায় নদী খননের মাটিতে চাপা শতাধিক গৃহহীনের স্বপ্ন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
খুলনা

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ২০: ৫১
খুলনায় নদী খননের মাটি রাখা হয়েছে কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণের ঘরবাড়ির ওপর। স্ট্রিম ছবি

খুলনার ডুমুরিয়ায় বুড়িভদ্রা নদী খননের মাটি রাখা হয়েছে কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণের ঘরবাড়ির ওপর। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক ঘরের দেয়াল, টিনের চাল, দরজা-জানালা। অনেকে ঘরের আসবাব বাইরে এনে খোলা আকাশের নিচে রেখেছেন।

এদিকে, নদী খননের কারণে পাঁচ মাস আগে উপজেলার চুকনগর সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে আশ্রিত প্রায় দেড়শ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এতে পুরোনো টিন, পলিথিন আর কাপড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঝুপড়িতে রোদ-বৃষ্টি কাদার মধ্যেই জীবন কাটাচ্ছেন তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তা বলছেন, নদী খনন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পুনর্বাসনের বরাদ্দ, তবে দ্রুত মাটি সরিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করা হবে।

প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় তিনটি ধাপে ডুমুরিয়ার চুকনগর, বরাতিয়া এবং খর্নিয়া এলাকায় শতাধিক ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করে সরকার। বুড়িভদ্রা নদীর চরে চুকনগর অংশে ১৪৫টি এবং কাঁঠালতলার বরাতিয়া অংশে ১২৪টি ঘর নির্মাণ করা হয়। তবে পাঁচ মাস আগে বুড়িভদ্রা খনন শুরু হওয়ায় চুকনগর অংশে ১৪৩টি ঘর উচ্ছেদ করা হয়।

ওই উচ্ছেদের রেশ না কাটতেই নতুন সংকটে পড়েছেন কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। নদী খননের বিপুল পরিমাণ মাটি আশ্রয়ণের ঘরগুলোর পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ১০টি ঘর। বর্ষা শুরু হওয়ায় অনেক ঘর নদীতে ধসে পড়ার হুমকিতে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে বাসিন্দাদের চলাচলের পথ।

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ছোট দুই কক্ষ বিশিষ্ট আধাপাকা ঘর ও সেই জমির মালিকানা— এটুকুই সম্বল গৃহহীনদের জন্য তৈরি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের। বরাতিয়া এলাকায় নদী খননের মাটি একেবারেই পাড়ে ফেলার কারণে কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে বিশাল স্তূপ। এই মাটি বৃষ্টিতে ধুয়ে নামছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের ওপর। অনেক ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাদা ঢুকে গেছে। ফাটল ধরেছে ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে। বেশ কয়েকটি পরিবার তাদের ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ আসবাব বাইরে এনে খোলা আকাশের নিচে এনে রেখেছেন।

খুলনায় নদী খননের মাটিতে ঢাকা পড়েছে কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণের ঘরবাড়ি। স্ট্রিম ছবি
খুলনায় নদী খননের মাটিতে ঢাকা পড়েছে কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণের ঘরবাড়ি। স্ট্রিম ছবি

কাঁঠালতলা এলাকার বাসিন্দা রোজিনা বেগম জানালেন, নদী খননের মাটি পাহাড়ের মতো উঁচু করে রাখা হয়েছে। কয়েক দিন আগে বৃষ্টির সময় সেই মাটি ধসে তিন বছরের এক শিশু চাপা পড়ে। পরে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করায় বেঁচে যায়।

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সি রহিমা বেগম বলেন, ‘নদী ভাঙনে সব হারায়ে এইহানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছিলাম। সরকার ঘর দিছিল। এহন নদীর কাদা-মাটি এনে আমাদের ঘরের ওপর ফেলছে। ঘরের দেয়াল চড়চড় করে ফাটতেছে। রাইতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এই বুঝি মাটি চাপা পড়ে মরে গেলাম।’

বৃদ্ধা রহিমা বলেন, খননের সময় এক্সকাভেটর দিয়ে ঘরের গোড়া পর্যন্ত মাটি কাটা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। মাটির অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিজেরাই ঘরের ভেতর থেকে মাটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রকল্পের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সি ময়না বেগম বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে ঘরে থাহার উপায় নেই। ঘরে দরজার অংশ ভাঙে গেছে। কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। শিশুদের নিয়ে ঘরে নিরাপদে থাকতি পারতিছি নে। রান্না করার জায়গা নেই। বাথরুম, টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে গেছে। ঘরের জিনিসপত্রও সরিয়ে রাখতে হয়ছে।’

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা এবং যশোরের সদর উপজেলার আংশিক, অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশন শ্রী নদীতে নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে। কিন্তু পলি পড়ে এলাকার মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর বুক উঁচু হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে এলাকার বিলগুলো প্লাবিত হচ্ছে। ২০১৬ সাল থেকে ভবদহ এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে বোরো আবাদ হচ্ছে না।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা ও যশোর অঞ্চলের ৩টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন চলছে। ইতিমধ্যে নদী খননের ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে বলে জানিয়েছেন যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী।

নদী খননের মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে রাখায় ‘কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে জানিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেন, আশ্রয়ণের মানুষের একটু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পুনর্বাসনে কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। তবে মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করা হবে।

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে নদী খননের মাটি সরিয়ে নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার।

খুলনায় চুকনগর আশ্রয়ণের পরিবারগুলো থাকছে চুকনগর বাজারের পাশে। স্ট্রিম ছবি
খুলনায় চুকনগর আশ্রয়ণের পরিবারগুলো থাকছে চুকনগর বাজারের পাশে। স্ট্রিম ছবি

ঘরে ফিরতে পারেনি চুকনগরের বাসিন্দারা

বুড়িভদ্রা খননের শুরুতেই উচ্ছেদ হওয়া চুকনগর আশ্রয়ণের পরিবারগুলো চুকনগর বাজারের পাশে সাপ্তাহিক গরুর হাটে খোলা মাঠে বাস করছে। সরেজমিনে দেখা যায়, পুরোনো টিন, পলিথিন আর কাপড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঝুপড়িতে রোদ-বৃষ্টি ও কাদার মধ্যেই জীবন কাটাচ্ছেন তারা।

উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দীন বলেন, প্রায় এক হাজার মানুষ কয়েক মাস ধরে চুকনগর বাজারের পাশে খোলা একটি মাঠে বাস করছে। সেখানে বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, নিরাপত্তা নেই, খাবারের কষ্টও আছে।

বিষয়টি একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে হেলাল বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা; কিন্তু ডুমুরিয়ার চুকনগরে সেই প্রকল্পের বাসিন্দাদেরই এখন খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে হয়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান হেলাল বলেন, একদিকে নদী খনন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে আশ্রয়হীন মানুষের মানবিক সংকট- দুই বাস্তবতার মাঝখানে আটকে পড়েছে প্রায় এক হাজার মানুষের জীবন। পুনর্বাসনের আশ্বাস মিললেও কবে তারা আবার স্থায়ী ঠিকানায় ফিরতে পারবেন-সই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে বিষয়টি, কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

Ad 300x250

সম্পর্কিত