প্রাণহানি ৩০০ ছুঁই ছুঁই, হাম নিয়ে বিপর্যয়ের দায় কার

হামের টিকা নিয়ে যে যা-ই যুক্তি দিক না কেন, প্রায় ৩০০ প্রাণহানি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। স্ট্রিম গ্রাফিক

হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নতুন করে একদিনে হাম ও রোগটির উপসর্গে চারজনের মৃত্যু এবং আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৯৬ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে, এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে শনিবার (২ মে) পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে ২৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশ শিশু। আক্রান্ত দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজারের বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘সায়েন্স’ এক প্রতিবেদনে হাম নিয়ে বিপর্যয়ে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তনকে দায়ী করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইউনিসেফ হাম নিয়ে এমন বিপর্যয়ের বিষয়ে সতর্ক করলেও সরকার গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) মাধ্যমে হাম-রুবেলার টিকা কেনা স্থগিত করে কিনতে চেয়েছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। যদিও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়।

নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়াও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারকে হাম নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, হাম-রুবেলার টিকা কেনা নিয়ে যে যা-ই যুক্তি দিক না কেন, প্রায় ৩০০ প্রাণহানি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। ইউনিসেফের সতর্কতা সত্ত্বেও কেন বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি, তার তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ স্ট্রিমকে বলেছেন, হাম নিয়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দায় অবশ্যই সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের। ইপিআই আমাদের দেশের অত্যন্ত সফল কর্মসূচি। বিগত সরকারের সময়ে এটি নিয়ে সমন্বয়হীনতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারা টিকা জোগাড় করতে পারেনি, কাভারেজও নিশ্চিত করেনি। বিপর্যয়ের দায় তাদেরই নিতে হবে।

তিনি এও বলেন, এই সংকটের শুরু হয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে, যখন অপারেশন প্ল্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। তবে দায়িত্ব নিয়ে অবশ্যই অন্তর্বর্তী সরকারের একটি ‘এক্সিট প্ল্যান’ তৈরি করার দরকার ছিল, যাতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

ডা. বে-নজির দাবি করেন, ‘আমি নিজে বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান (অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার তৎকালীন স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী) সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই নেতিবাচক। এই কারণে নানা জায়গায় টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’

সায়েন্সের প্রতিবেদনের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। ১ মে ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিটিএম) বজায় রেখেই ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত টিকা কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। উন্মুক্ত দরপত্রের কোনো প্রক্রিয়া আসলে শুরুই হয়নি। ডা. সায়েদুর রহমান বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। শিশুদের সুরক্ষায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিকা খাতে আগের চেয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে টিকা কেনা বন্ধের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সঠিক নয় বলেও দাবি তাঁর।

বিপর্যয়ের মুখে বিএনপি সরকার গত ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দীন হায়দার জানিয়েছেন, এপ্রিল থেকে ইউনিসেফের মাধ্যমে পুনরায় জরুরি ভিত্তিতে টিকা কেনা শুরু করেছেন তারা। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে চলছে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভির সঙ্গে সমন্বয় করে টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

অবশ্য বিএনপি সরকারের বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন ডা. বে-নজির আহমেদের, ‘বর্তমান সরকারও পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুব একটা সফল হতে পারছে না। এত বড় বিপর্যয় সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। কোনো বিশেষ বরাদ্দ কিংবা আপৎকালীন জাতীয় গাইডলাইন পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মজুতেও ঘাটতি স্পষ্ট।’

দেশের জনস্বাস্থ্যের অবস্থা বেহাল। হাম এই চরম অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবিমাত্র। এই বিপর্যয় সামাল দিতে বর্তমান সরকারকে আরও কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত