সুন্দরবনে বনজীবীদের প্রবেশে অনুমতি

বুকে বাঘ-দস্যুর ভয়, মাথায় ঋণের পাহাড়

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সুন্দরবনে বনজীবীদের প্রবেশে অনুমতি। ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবনে বনজীবীদের প্রবেশে অনুমতি। ছবি: সংগৃহীত

টানা তিন মাসের বেকারত্ব। সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে মাথায় চেপেছে মহাজন আর এনজিওর ঋণের পাহাড়। সেই ঋণ শোধের তাগিদেই মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে আবারও সুন্দরবনের পথে পা বাড়িয়েছেন সাতক্ষীরা উপকূলের হাজারো বনজীবী।

তবে বনের পথে নামলেও তাঁদের মনে স্বস্তি নেই। জলে দস্যুর চাঁদার খাঁড়া, ডাঙায় বন বিভাগের ‘বাড়তি টাকা’ গোনার আক্ষেপ আর গহীন বনে বাঘের আতঙ্ক; সব মিলিয়ে একরাশ শঙ্কা নিয়েই জীবিকার সন্ধানে নেমেছেন তাঁরা।

সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা ছিল। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিসে আনুষ্ঠানিকভাবে বনজীবীদের বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া শুরু হয়। তবে সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে প্রথম দিনে ভিড় কিছুটা কম ছিল। এদিন ১৫৫টি পাসের বিপরীতে চার শতাধিক বনজীবী এবং ২০ জন পর্যটক সুন্দরবনে প্রবেশ করেছেন।

বেঁচে থাকার তাগিদ

নিষেধাজ্ঞার তিন মাস বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় উপকূলের জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা কার্যত বেকার সময় কাটিয়েছেন। শ্যামনগরের গাবুরার জেলে আবুল কালাম বা দাতিনাখালীর আব্দুস সাত্তারদের গল্পটা একই। তাঁরা জানান, আয় বন্ধ থাকলেও সংসারের খরচ আর এনজিওর কিস্তি থেমে থাকেনি। বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে হাত পাততে হয়েছে।

হরিনগরের আয়ুব আলী বলেন, ‘বাঘের ভয় আর নদীর বিপদ জেনেই পেটের দায়ে বনে যেতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।’

দস্যুদের টোকেন, ৫ টাকার নোট

বনজীবীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সুন্দরবনে অন্তত পাঁচটি জলদস্যু বাহিনী নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে আলিফ ওরফে দয়াল, দুলাভাই, ডন, বড় জাহাঙ্গীর ও কাজলমুন্না বাহিনীর নাম জেলেদের মুখে মুখে।

জেলেদের দাবি, বনে যাওয়ার আগেই মহাজনের মাধ্যমে দস্যুদের চাঁদা বুঝিয়ে দিতে হয়। চাঁদা দেওয়ার পর দস্যুরা ৫ টাকা মূল্যমানের একটি নোট দেয়। সুন্দরবনের নদীপথে এই নোটের সিরিয়াল নম্বরই হলো ‘পাসপোর্ট’ বা টোকেন। নম্বর না মিললে নৌকা থামিয়ে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত কয়েক বছরে দস্যুদের হাতে ৬০-৮০ জন বনজীবী অপহৃত হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন ৫ থেকে ৮ জন।

সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম ও বুড়িগোয়ালিনী নৌ থানার এসআই মো. হাফিজউদ্দিন জানান, দস্যু দমনে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। তবে অপহৃতদের পরিবার পুলিশকে না জানিয়ে গোপনে মুক্তিপণ দিয়ে স্বজনদের ছাড়িয়ে আনায় আইনি ব্যবস্থা নিতে বেগ পেতে হয়। কোস্ট গার্ডও নদীতে টহল ও নজরদারি বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে।

বিএলসি নবায়নে ‘হরিলুট’

সরকারি নিয়মে বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নবায়নের ফি মাত্র ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু বনজীবীদের অভিযোগ, বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী ও কোবাতক স্টেশনের কর্মকর্তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন। হয়রানির ভয়ে জেলেরা প্রকাশ্যে নাম বলতে নারাজ।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মশিউর রহমান অবশ্য দাবি করেছেন, নৌকার ধরন ও আকার অনুযায়ী ফি ভিন্ন হয়। তবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, জুলাই মাসে সাতক্ষীরা রেঞ্জের চারটি স্টেশনে মোট ২ হাজার ৬৬৯টি বিএলসি নবায়ন করা হয়েছে।

রক্তাক্ত বন, বাঘের থাবায় মৃত্যু ও নিখোঁজ

বন বিভাগের তথ্যমতে, গত এক দশকে সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘের আক্রমণে অন্তত ১৫ জন নিহত ও ৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে নোটাবেকী বনাঞ্চলে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের থাবায় প্রাণ হারান গাবুরার মৌয়াল ময়নুদ্দিন গাজী। এর আগে নিখোঁজ হয়েছেন রাশেদুল ইসলাম, আব্দুর রহিম, নজরুল ইসলাম ও ফারুক হোসেনের মতো অনেক বনজীবী।

পাস-পারমিট ছাড়া বা নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বাঘের শিকার হলে আইনি জটিলতার ভয়ে অনেক পরিবার মৃত্যুর খবরটি গোপন রাখে। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে স্থানীয়দের ধারণা।

এসিএফ মশিউর রহমান জানান, জেলেরা অনেক সময় নিয়ম ভেঙে নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে প্রবেশ করলেই বাঘের মুখোমুখি হন। নিয়ম মেনে চলা বনজীবীদের মৃত্যুতে ৩ লাখ এবং আহতদের ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।

পর্যটনেও ধাক্কা

শুধু বনজীবীরা নন, তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরাও। মুন্সীগঞ্জ এলাকার ট্রলার মালিক নূর ইসলাম জানান, দীর্ঘসময় ট্রলার বসে থাকায় যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছে। মেরামতের জন্য ঋণ করতে হয়েছে। এখন পর্যটক এলেও আগে ঋণের কিস্তি শোধ করবেন নাকি সংসারের খরচ মেটাবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

অন্যদিকে, জীবিকার তাগিদে বনজীবীরা সুন্দরবনের অন্তত ৬০ শতাংশ এলাকা উন্মুক্ত করার দাবি জানালেও পরিবেশকর্মী পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু মনে করেন, জীবিকার পাশাপাশি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। সব মিলিয়ে, শঙ্কা আর বেঁচে থাকার নিরন্তর এক লড়াই নিয়ে আজ থেকে ফের শুরু হলো সুন্দরবনের নতুন মৌসুম।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত