ad

আজ বিশ্ব চিঠি দিবস/‘পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র’, প্রেমপত্র, তারপর মেসেজ

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬: ৪১
বিশ্ব চিঠি দিবস। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
বিশ্ব চিঠি দিবস। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

‘পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র লেখার সময় হইয়াছে’—মাঝেমধ্যে মাসের শুরুর দিকে পোস্টটা আমাদের নিউজফিডে ঘুরতে থাকে। দেখে হাসি পায়। মনে হয়, পরীক্ষার খাতার সেই বিখ্যাত চিঠি আবার ফিরে এসেছে! শুধু পার্থক্য হলো, তখন বাবার কাছে টাকা চাইতাম পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য, আর এখন মাসের শেষে পকেট ফাঁকা হলে সত্যিই ইচ্ছা করে, পিতার কাছে টাকা চেয়ে চিঠি লিখি। কিন্তু লেখা হয় না।

স্কুলজীবনে আমরা সবাই কমবেশি এই চিঠি লিখেছি—‘প্রিয় আব্বা, সালাম নেবেন। আশা করি আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন…’ তারপর বই কেনা, পরীক্ষার ফি দেওয়া কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনের কথা বলে কিছু টাকা চেয়ে লম্বা একখানা পত্র। চিঠির সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের পরিচয়ও বোধহয় এখান থেকেই শুরু।

আমার বাবা পাশের ঘরেই থাকতেন, তাই টাকা চাইতে এত ঝামেলা করতে হয়নি। যাঁদের বাবা কাছে থাকতেন না, তাঁরাও চিঠি লিখে টাকা চাইতেন না; কারণ তখন হাতে ছিল মোবাইল ফোন। এরই মধ্যে পৃথিবীও ঢুকে পড়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে।

তবে কৈশোরের পড়তি বেলায় চিঠি শব্দটার মানে পালটে যায়। তখন চিঠি মানেই লুকোচুরি, লাল-নীল স্বপ্নের হাতছানি। আকাশের ঠিকানায় কতশত চিঠি লিখেছি আমরা কতজন। বান্ধবীর হাতে কোনো ছেলে সহপাঠী হয়তো চিঠি গুঁজে দিত কিংবা টিফিনের সময় স্কুলের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে চুপিচুপি চিঠি চালাচালি হতো। আমাদের সময়কার চিঠি হয়ে গেছে ‘লাভ লেটার’। কারণ চিঠি লেখার দিন ফুরিয়ে গেছে বহুদিন হলো।

এখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করি, যখন কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা মানুষকে মেসেজ পাঠানো যায়। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ‘সিন’ শব্দটি দেখলেই বোঝা যায় চিঠি প্রাপকের কাছে পৌঁছেছে।

তবে চিঠিকে তখন শুধু রোমান্টিক ব্যাপার হিসেবে মনে হলেও একসময় চিঠি ছিল যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ আর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চিঠির মাধ্যমে যেমন খবর আদান-প্রদান হতো, তেমনি মানুষ মনের কথাও জানাত।

ইতিহাসের প্রথম চিঠি!

প্রথম কবে চিঠি লেখা হয়েছিল, এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ চিঠি লেখার আগে মানুষকে প্রথমে লিখতে শিখতে হয়েছে। আর লেখার ইতিহাসই কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। মেসোপটেমিয়া ও মিসরে প্রায় একই সময়ে প্রাচীন লিখনপদ্ধতির বিকাশ ঘটে। মিসরে লিখনের প্রাচীন নিদর্শন প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৫০ সালের। লেখার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল মুখের কথাকে এমন একটি রূপ দেওয়া, যা মানুষ দূরে পাঠাতে এবং বহুদিন সংরক্ষণ করতে পারে।

চিঠির প্রথম লেখক হিসেবে অবশ্য পারস্যের রানি আতসোসার নাম পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক হেলানিকাসের একটি বিবরণের কথা উল্লেখ করে পরবর্তী লেখক ক্লেমেন্ট অব আলেকজান্দ্রিয়া বলেছেন, আতসোসাই ছিলেন প্রথম চিঠি রচয়িতা। তবে আতসোসার নিজের কোনো চিঠি আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই তাঁকে ইতিহাসের প্রথম চিঠি লেখক হিসেবে বলা নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য নয়; এটি প্রাচীন একটি ঐতিহাসিক দাবি।

তবে প্রাচীন চিঠির নিদর্শন অবশ্য আরও অনেক পুরোনো। মিসরের আমার্না পত্রসম্ভারের চিঠিগুলো খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের। এগুলোর অনেকগুলো মাটির ফলকে কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা হয়েছিল। যেমন, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত একটি চিঠি আলাশিয়ার রাজা মিসরের ফারাওয়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

প্রাচীন পারস্যে রাজকীয় যোগাযোগের জন্য চিঠি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। রাজকীয় রাস্তা ধরে ঘোড়সওয়ার বার্তাবাহকেরা চিঠি নিয়ে ছুটত। দারিয়ুসের সময় এই বার্তা পরিবহনের ব্যবস্থা এতটাই সংগঠিত হয়েছিল যে এর ফলে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হতো। দারিয়ুসের সাম্রাজ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর ঘোড়সওয়ার বার্তাবাহক বদল করে বার্তা পৌঁছে দিতেন।

ডাক ব্যবস্থার ইতিহাসও অনেক পুরোনো। ইউরোপে নিয়মিত ডাকব্যবস্থা গড়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই মিসর, পারস্য ও চীনে চিঠি ও খবর আদান-প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। চীনেও সময়ের সঙ্গে ডাকব্যবস্থা আরও সংগঠিত হয়। তাং রাজবংশের সময় চীনে প্রায় ১,৬৩৯টি পোস্ট অফিস ও ২০ হাজারের বেশি ডাককর্মী ছিল বলে জানা যায়। কুবলাই খানের সময় এই ব্যবস্থা চীনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের ২৩0-এর দশকের প্রাচীন প্যাপিরাসের চিঠি। ছবি: বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের ২৩0-এর দশকের প্রাচীন প্যাপিরাসের চিঠি। ছবি: বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়

রোমানরাও চিঠিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছিল। ব্যক্তিগত চিঠি বন্ধু, আত্মীয়, ব্যবসায়ী কিংবা পরিচিত মানুষের মাধ্যমে পাঠানো হতো। পরে সম্রাট অগাস্টাসের সময়ে রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের জন্য ‘কার্সাস পাবলিকাস’ নামে সংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। অর্থাৎ চিঠি তখন আর শুধু ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়; সাম্রাজ্য চালানোরও অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। তবে ‘কার্সাস পাবলিকাস’ ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় ও সরকারি যোগাযোগের ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত চিঠির ডাকব্যবস্থা নয়।

চিঠি যেভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গেল

হাজার হাজার বছর ধরে চিঠি ছিল মূলত ক্ষমতাবান, শিক্ষিত বা দূরে থাকা মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কাগজের সহজলভ্যতা, শিক্ষা বিস্তার এবং ডাকব্যবস্থার উন্নতির কারণে চিঠি সাধারণ মানুষের জীবনেও ঢুকে পড়ে। এখানে উনিশ শতকের একটি ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—‘পেনি পোস্ট’। ১৮৪০ সালে ব্রিটেনে চালু হওয়া এই ডাকব্যবস্থার মাধ্যমে চিঠি পাঠানো সাধারণ মানুষের জন্য অনেক সহজ ও সস্তা হয়ে যায়। আগে চিঠি পাঠানোর খরচ অনেকের জন্য বেশি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে আবার প্রাপককে টাকাও দিতে হতো। পেনি পোস্ট চালু হওয়ার পর চিঠি পাঠানো সস্তা ও সহজ হয়ে যায়।

এর সঙ্গে এক পেনির একক ডাকমাশুল চালু হয়। একই সংস্কারের অংশ হিসেবে আসে ‘পেনি ব্ল্যাক’, বিশ্বের প্রথম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত আঠালো ডাকটিকিট। এর ফল ছিল অবিশ্বাস্য। ব্রিটেনে চিঠি পাঠানোর সংখ্যা ১৮৩৯ সালের প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১৮৪০ সালে বেড়ে প্রায় ১৬ কোটি ৯০ লাখে পৌঁছায়, যা এক বছরেই দ্বিগুণের বেশি। চিঠি তখন আর রাজা-বাদশার বিষয় থাকল না; সাধারণ মানুষও চিঠি লিখতে শুরু করল। এই সময় থেকেই চিঠি হয়ে উঠতে থাকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দূরে থাকা মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু, স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা সবাই চিঠির মাধ্যমে নিজেদের খবর জানাতে শুরু করল। চিঠির পাতায় শুধু তথ্য থাকল না, জমতে থাকল মানুষের আবেগও। সম্ভবত এখান থেকেই জন্ম নিল ‘প্রেমপত্র’।

‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলেও বোলো, ভালবাসি!’

চিঠি নিয়ে বহু কবিতা-গান আছে। মহাদেব সাহা লিখেছেন, ‘ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও, এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও’, আবার কবি হেলাল হাফিজ লিখেছেন, ‘এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিও’।

ভালোবাসা প্রকাশের জন্য চিঠি ব্যবহারের ইতিহাস নতুন কিছু নয়, বরং বহু পুরোনো। যুগে যুগে মানুষ প্রিয়জনকে মনের কথা বলতে চিঠি লিখেছেন। ভারতীয় সাহিত্যের ভাগবত পুরাণে রুক্মিণীর কৃষ্ণকে লেখা চিঠির কাহিনি আছে। সেখানে রুক্মিণী কৃষ্ণের গুণের কথা শুনে তাঁকে নিজের পছন্দের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার কথা জানান এবং তাঁকে বিয়ের আগে এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

আমাদের সময়কার চিঠি হয়ে গেছে ‘লাভ লেটার’। কারণ চিঠি লেখার দিন ফুরিয়ে গেছে বহুদিন হলো।

এই কাহিনির চিত্রিত পাণ্ডুলিপি বর্তমানে স্মিথসোনিয়ান ও মেটের সংগ্রহেও দেখা যায়। তবে প্রেমপত্রের ইতিহাস কোনো দেশ বা সংস্কৃতির একক ইতিহাস নয়। পৃথিবীর নানা সমাজে মানুষ দূরে থাকা প্রিয়জনকে চিঠির মাধ্যমে নিজের অনুভূতি জানিয়েছে। কারণ মুখে বলা কঠিন এমন কথাও কাগজে লেখা যায়।

এই কারণেই পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত মানুষদের প্রেমপত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে। নেপোলিয়ন জোসেফিনকে চিঠি লিখেছেন, বিটোফেন তাঁর রহস্যময় ‘অমর প্রিয়তমা’র উদ্দেশে চিঠি রেখে গেছেন। ব্রিটিশ ইতিহাসেও অ্যান বোলিন ও হেনরি অষ্টমের লেখা নোট, নেলসনের এমা হ্যামিলটনকে লেখা শেষ চিঠি কিংবা শার্লট ব্রন্টের আবেগময় চিঠি—এসব ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি ইতিহাসেরও অংশ হয়ে গেছে। ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও ন্যাশনাল আর্কাইভের সংগ্রহে থাকা প্রেমপত্রগুলোতে দেখা যায়, ব্যক্তিগত চিঠি কখনও কখনও পুরো একটি সময়কে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

চিঠি হারিয়ে গেল…

এখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করি, যখন কয়েক সেকেন্ডে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা মানুষকে মেসেজ পাঠানো যায়। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ‘সিন’ শব্দটি দেখলেই বোঝা যায় চিঠি প্রাপকের কাছে পৌঁছেছে। উত্তর না এলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার মেসেজ পাঠানো যায়। চিঠির জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করার যুগ শেষ।

তবু আমাদের মন থেকে চিঠি প্রাপ্তির আশা কি কখনও ফুরিয়েছে? আপনি যদি আমার মতোই ‘হোপলেস রোমান্টিক’ হয়ে থাকেন, তবে নিশ্চয়ই কখনও না কখনও প্রিয়জনের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার আশা করেছেন। সেই চিঠি আবার জমিয়ে রেখেছেন কোনো গোপন কুঠুরিতে, পরম যত্নে। কারণ ফোনের মেসেজ আর চিঠি এক জিনিস নয়। মেসেজ লেখা হয় দ্রুত; চিঠি লিখতে হয় সময় নিয়ে। কী লিখব, কীভাবে লিখব, কোথায় থামব—এসব ভাবতে হয়। ভুল হলে কেটে আবার লিখতে হয়। হাতের লেখায় মানুষের অনুভূতিও যেন থেকে যায়। কাগজে ভাঁজ পড়ে, কালির দাগ থাকে, কখনও অক্ষর কাঁপে। অর্থাৎ চিঠির মধ্যে থাকে লেখকের উপস্থিতি।

চিঠি বহু বছর পরেও বাক্স খুলে বের করা যায়। বাবা-মায়ের পুরোনো চিঠি, প্রিয় বন্ধুর লেখা কয়েকটি লাইন কিংবা কোনো প্রিয় মানুষের হাতে লেখা চিঠি, এসবের সঙ্গে মিশে থাকে হারানো সময়ের স্মৃতি। হয়তো এ কারণেই পৃথিবী যত দ্রুত বদলেছে, মানুষের অনুভূতি তত দ্রুত বদলায়নি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত