মাহজাবিন নাফিসা

গত কয়েকদিনে ফেসবুকের আলোচিত একটি বিষয় হলো ‘ডন লুকা ও নোরা’। কোনো গল্প-উপন্যাস নয়, এরা হলো বর্তমানে ভাইরাল হওয়া ‘এআই ড্রামা’র প্রধান চরিত্র। ফেসবুকে এইরকম শর্ট ড্রামা বেশ কয়েক মাস ধরে চললেও ইদানীং স্ক্রল করলেই ফেসবুকের বিজ্ঞাপনেও চলে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এসব নাটক। স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই নাটকগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, দর্শক একটি পর্ব দেখলে পরের পর্ব দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের এসব ভিডিওতে পরিচিত নাটকীয় গল্প, দ্রুত সংলাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতিশোধ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, নাটকীয় অভিব্যক্তি থাকে। প্রধান চরিত্ররা কেউ বড় কোম্পানির সিইও বা মাফিয়া অথবা ফ্যান্টাসির কোনো চরিত্র (ওয়ারউলফ)। সব মিলিয়ে এগুলো প্রচলিত নাটকের মতোই দর্শককে গল্পের ভেতর টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে একটু খেয়াল করলে অস্বাভাবিকতাটা বোঝা যায়। মুখের নড়াচড়া একটু বেশি নিখুঁত, হাতের ভঙ্গি খানিকটা অদ্ভুত, আর চরিত্রগুলোর চেহারায় মানুষের স্বাভাবিক অসম্পূর্ণতাটা যেন নেই।
বাংলাদেশের ফেসবুক ফিড থেকে অনেক দূরে, চীনের মাইক্রো-ড্রামা শিল্প থেকে এসব নাটকের শুরু হলেও এখন তা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
এআই নাটককে খুব সহজ করে বললে, এটি এমন এক ধরনের অডিও-ভিজ্যুয়াল গল্প যেখানে গল্পের চরিত্র, দৃশ্য, কণ্ঠ, অ্যানিমেশন বা ভিডিওর বড় অংশ জেনারেটিভ এআই দিয়ে তৈরি করা যায়।
একটি এআই নাটকের পেছনে থাকে গল্পের ধারণা, চিত্রনাট্য, চরিত্র তৈরি, চরিত্রের চেহারা নির্ধারণ, দৃশ্য তৈরি, ভিডিও জেনারেশন, কণ্ঠ তৈরি, ঠোঁটের সঙ্গে সংলাপ মেলানো, সংগীত ও শব্দ যোগ করা এবং সবশেষে সম্পাদনা। এখানে এআই বেশিরভাগ কাজ করে দিলেও কীভাবে কোন কাজটি করতে হবে— তা মানুষই ঠিক করে দেয়। মানুষের দেওয়া প্রম্পট ছাড়া নাটক তৈরি করা এআইয়ের পক্ষে সম্ভব না। ফলে নাটকগুলোতে যা কিছু দেখা যাচ্ছে—সবই যিনি নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর রুচিমতো। তবে এটা সত্যি, যে কাজ করতে আগে একটা ছোট প্রযোজনা ইউনিট লাগত, তার কিছু অংশ এখন কম্পিউটারের পর্দায় করা সম্ভব।
এআই নাটকের গল্পের ধরনও আলাদা করে দেখার মতো। এখানে গল্প ধীরে ধীরে এগোয় না বা চরিত্র পরিচয় করিয়ে দিতে বাড়তি সময় নেওয়া হয় না। প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই একটা সমস্যা, সম্পর্কের সংকট বা রহস্য হাজির হয়। তারপর দ্রুত আরেকটি ঘটনা। শেষে এমন একটা জায়গায় ভিডিও থেমে যায়, যেখানে দর্শকের মনে হয়—‘এরপর কী হলো?’
এটা আসলে মাইক্রো-ড্রামার পুরোনো কৌশল। চীনে এই ধরনের নাটকের জনপ্রিয়তা অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। স্মার্টফোনের লম্বা পর্দার জন্য বানানো এক-দুই মিনিটের পর্ব, দ্রুত গল্প এবং পর্বের শেষে ঝুলিয়ে রাখা উত্তেজনা—এই ফরম্যাট এখন এআইয়ের সঙ্গে মিশে আরও দ্রুত উৎপাদনযোগ্য হয়ে উঠছে।

চীনের মাইক্রো-ড্রামার লেখকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য, শেয়ার ও দর্শকের প্রতিক্রিয়া গল্প তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। এখানে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী গল্পের পরের অংশ তৈরি করা হয়। এ কারণেই এআই নাটকের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পর্কটা এত গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক কতক্ষণ দেখল, কোথায় ভিডিও বন্ধ করল, কোন দৃশ্যে মন্তব্য করল—এসব তথ্য পরের কনটেন্ট তৈরির ধারণা দিতে পারে। ফলে গল্প তৈরি হয় দর্শক, অ্যালগরিদম এবং নির্মাতার মধ্যে এক ধরনের চলমান পরীক্ষার মাধ্যমে।
ভিডিওটা ভালো নাকি মন্দ, তা বিচার করার আগেই যদি দর্শক স্ক্রিনে আটকে যায়, তবেই বাজিমাত! এআই নাটকগুলো ঠিক এই জাদুটাই দেখাচ্ছে। এই গল্পগুলোতে খুব দ্রুত ইমোশন, উত্তেজনা আর সমস্যার সমাধান দেখানো হয়।
গল্পের প্লটগুলোও বেশ টানটান। কেউ হয়তো প্রেমে প্রতারণার শিকার, কেউ জেনে গেছে কোনো ভয়ংকর গোপন সত্য, আবার কেউ নিচ্ছে অপমানের প্রতিশোধ। কেউ হয়তো এমন এক সম্পর্কে আটকে যায়, যার শেষটা দেখতে দর্শককে বাধ্য হয়ে পরের ভিডিওতে ক্লিক করতে হয়।
বাংলাদেশে এআই নাটক নতুন মনে হলেও চীনে ‘মাইক্রো-ড্রামা’ বা ছোট নাটকের বাজার অনেক বড় একটি বিনোদন শিল্প। ২০২৬ সালে এসে এআই প্রযুক্তি চীনের এই নাটক তৈরির পদ্ধতি একেবারে বদলে দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ক্যাক্সিন ও সিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই চীনে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার নতুন মাইক্রো-ড্রামা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি নাটকই এআই দিয়ে বানানো! অথচ মাত্র এক বছর আগেও এআই দিয়ে বানানো নাটক তেমন ছিল না বললেই চলে। উন্নত ভিডিও জেনারেশন মডেল বা সফটওয়্যারগুলো বাজারে আসার পরই এই অভাবনীয় পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের ‘হেংদিয়ান’ শহরটি বহুদিন ধরেই সিনেমা ও নাটক তৈরির বড় কেন্দ্র। মাইক্রো-ড্রামার শুরুর দিকে সেখানে প্রচুর শুটিং হতো এবং অভিনেতাদের ব্যাপক চাহিদাও ছিল। ক্যাক্সিন জানিয়েছে, সেসময় অভিনেতারা দিনে ৮০০ থেকে ১,৫০০ ইউয়ান এবং মাসে ১০ হাজার ইউয়ানের বেশি আয় করতেন। চীনের মাইক্রো-ড্রামা খাতে মোট প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার মানুষ কাজ করতেন।
কিন্তু এআই আসার পর এই কাজের বাজারে বড় ধস নেমেছে। এখন অনেক অভিনেতা কাজ হারিয়েছেন অথবা অনেক কম পারিশ্রমিকে কাজ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন। এআই মূলত নাটক তৈরির পুরো অর্থনীতিটাই বদলে দিয়েছে।
এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি নাটক তৈরির খরচ অনেক কমিয়ে দিয়েছে। চায়না ডেইলির মতে, যেখানে বাস্তবে শুট করা একটি আধুনিক নাটকে ৩ থেকে ৪ লাখ ইউয়ান খরচ হয়, সেখানে এআই দিয়ে একটি কস্টিউম (পোশাকভিত্তিক) মাইক্রো-ড্রামা বানাতে খরচ পড়ে মাত্র ২ থেকে ৩ লাখ ইউয়ান। ক্যাক্সিন জানিয়েছে, কিছু এআই মাইক্রো-ড্রামা বানাতে এখন ২০ হাজার ইউয়ানেরও কম খরচ হচ্ছে!
আগে নাটক বানাতে অনেক মানুষের দরকার হতো, কিন্তু এখন শুরুতে কিছু সফটওয়্যার হলেই কাজ শুরু করা যায়। ফলে যাদের বড় বাজেট নেই, তারাও নিজেদের গল্পগুলো পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে নতুন নির্মাতাদের জন্য দারুণ একটি দরজা খুলে গেছে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। সবাই যদি এত সহজে নাটক বানাতে শুরু করে, তাহলে এত এত ভিডিওর ভিড়ে দর্শকের জন্য সত্যিই ভালো মানের নাটক খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।
চীনে এআই প্রযুক্তি আসার আগে মাইক্রো-ড্রামা বা ছোট নাটকের খাতটি ছিল কর্মসংস্থানের এক বিশাল জায়গা। অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট, সেটকর্মী ও পরিচালকসহ বিশাল কর্মীবাহিনী এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। চীনা সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, চীনের এই খাতে অন্তত ৬ লাখ ৯০ হাজার মানুষ কাজ করতেন। কিন্তু এআই ভিডিও প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার পর নাটক বানানোর সময় ও খরচ—দুটোই অবিশ্বাস্যভাবে কমে যায়। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই চীনে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার মাইক্রো-ড্রামা মুক্তি পায়, যার ৯৫ শতাংশই এআই দিয়ে তৈরি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, আগে যে কাজ করতে ৫ জন মানুষের ৩ মাস লাগত, এআইয়ের সাহায্যে এখন ১ জন মানুষ মাত্র এক-দুই দিনেই তা করতে পারছেন।
বাংলাদেশেও যদি এমন পরিবর্তন আসে, তবে সবার আগে এর প্রভাব পড়বে ছোট বাজেটের নাটক, ফেসবুক রিলস ও মাইক্রো-ড্রামার বাজারে। যেসব নির্মাতার অভিনেতা, শুটিং লোকেশন বা ইউনিট ভাড়ার মতো পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না, তারা এখন এআই ব্যবহার করে অনেক বেশি কনটেন্ট বানাতে পারবেন। এতে নতুন নির্মাতাদের জন্য পথ সহজ হবে এবং নাটকের সংখ্যাও হু হু করে বাড়বে।
তবে চীনের মতোই বাংলাদেশেও অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, এডিটর ও অন্যান্য কারিগরি কর্মীদের কাজের সুযোগ কমার বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশের টিভি নাটক শিল্প এমনিতেই স্থানীয় প্রযোজনা কমে যাওয়ায় কিছুটা চাপে আছে। তাই এআই শুরুতে ‘নাটক বানানোর খরচ’ কমালেও ভবিষ্যতে ‘নাটক বানাতে আদৌ মানুষের প্রয়োজন কতটা’—সেই কঠিন প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে আসবে।
বর্তমানে আমাদের ফেসবুক ফিডে যেসব বাংলাদেশি এআই নাটক দেখা যাচ্ছে, সেগুলোকে চীনের ওই বিশাল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে এখনই তুলনা করার মতো কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। ঠিক কত মানুষ এসব নাটক দেখছেন বা এর বাজার কত বড়, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও এখনো পাওয়া যায়নি।
চীনের বিশেষজ্ঞরা এখন যে সমস্যার কথা বলছেন, সেটিও মাথায় রাখা জরুরি। তাঁরা বলছেন, প্রচুর কনটেন্ট তৈরি হলেও এর মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই ধরনের গল্প, চরিত্র আর দৃশ্যের বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এআইয়ের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একাধিক দৃশ্যে একই চরিত্রকে হুবহু এক রাখা, মানুষের মতো স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি, আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ বা গল্পের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এখনো এআইয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দশটি ভিন্ন নাটকে দশজন রক্তমাংসের মানুষ দশ রকমভাবে অভিনয় করতে পারেন, কিন্তু এআইয়ের তৈরি চরিত্রগুলোর অভিনয় প্রায় একই রকম মনে হয়। এতে দর্শকের মাঝে দ্রুতই একঘেয়েমি চলে আসতে পারে।
তবে সবকিছুর পরও একটি কথা থেকেই যায়—সত্যিকারের কোনো অভিনেতা ছাড়া তৈরি করা চরিত্র দেখে যদি দর্শকের চোখে জল আসে, কিংবা কোনো লেখক ছাড়া বানানো গল্প যদি দর্শককে পরের পর্ব দেখার জন্য স্ক্রিনে আটকে রাখে, তবে আগামীতে ‘বিনোদনের’ আসল সংজ্ঞাটাই হয়তো পুরোপুরি বদলে যাবে।

গত কয়েকদিনে ফেসবুকের আলোচিত একটি বিষয় হলো ‘ডন লুকা ও নোরা’। কোনো গল্প-উপন্যাস নয়, এরা হলো বর্তমানে ভাইরাল হওয়া ‘এআই ড্রামা’র প্রধান চরিত্র। ফেসবুকে এইরকম শর্ট ড্রামা বেশ কয়েক মাস ধরে চললেও ইদানীং স্ক্রল করলেই ফেসবুকের বিজ্ঞাপনেও চলে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি এসব নাটক। স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই নাটকগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, দর্শক একটি পর্ব দেখলে পরের পর্ব দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের এসব ভিডিওতে পরিচিত নাটকীয় গল্প, দ্রুত সংলাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতিশোধ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, নাটকীয় অভিব্যক্তি থাকে। প্রধান চরিত্ররা কেউ বড় কোম্পানির সিইও বা মাফিয়া অথবা ফ্যান্টাসির কোনো চরিত্র (ওয়ারউলফ)। সব মিলিয়ে এগুলো প্রচলিত নাটকের মতোই দর্শককে গল্পের ভেতর টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে একটু খেয়াল করলে অস্বাভাবিকতাটা বোঝা যায়। মুখের নড়াচড়া একটু বেশি নিখুঁত, হাতের ভঙ্গি খানিকটা অদ্ভুত, আর চরিত্রগুলোর চেহারায় মানুষের স্বাভাবিক অসম্পূর্ণতাটা যেন নেই।
বাংলাদেশের ফেসবুক ফিড থেকে অনেক দূরে, চীনের মাইক্রো-ড্রামা শিল্প থেকে এসব নাটকের শুরু হলেও এখন তা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
এআই নাটককে খুব সহজ করে বললে, এটি এমন এক ধরনের অডিও-ভিজ্যুয়াল গল্প যেখানে গল্পের চরিত্র, দৃশ্য, কণ্ঠ, অ্যানিমেশন বা ভিডিওর বড় অংশ জেনারেটিভ এআই দিয়ে তৈরি করা যায়।
একটি এআই নাটকের পেছনে থাকে গল্পের ধারণা, চিত্রনাট্য, চরিত্র তৈরি, চরিত্রের চেহারা নির্ধারণ, দৃশ্য তৈরি, ভিডিও জেনারেশন, কণ্ঠ তৈরি, ঠোঁটের সঙ্গে সংলাপ মেলানো, সংগীত ও শব্দ যোগ করা এবং সবশেষে সম্পাদনা। এখানে এআই বেশিরভাগ কাজ করে দিলেও কীভাবে কোন কাজটি করতে হবে— তা মানুষই ঠিক করে দেয়। মানুষের দেওয়া প্রম্পট ছাড়া নাটক তৈরি করা এআইয়ের পক্ষে সম্ভব না। ফলে নাটকগুলোতে যা কিছু দেখা যাচ্ছে—সবই যিনি নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর রুচিমতো। তবে এটা সত্যি, যে কাজ করতে আগে একটা ছোট প্রযোজনা ইউনিট লাগত, তার কিছু অংশ এখন কম্পিউটারের পর্দায় করা সম্ভব।
এআই নাটকের গল্পের ধরনও আলাদা করে দেখার মতো। এখানে গল্প ধীরে ধীরে এগোয় না বা চরিত্র পরিচয় করিয়ে দিতে বাড়তি সময় নেওয়া হয় না। প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই একটা সমস্যা, সম্পর্কের সংকট বা রহস্য হাজির হয়। তারপর দ্রুত আরেকটি ঘটনা। শেষে এমন একটা জায়গায় ভিডিও থেমে যায়, যেখানে দর্শকের মনে হয়—‘এরপর কী হলো?’
এটা আসলে মাইক্রো-ড্রামার পুরোনো কৌশল। চীনে এই ধরনের নাটকের জনপ্রিয়তা অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। স্মার্টফোনের লম্বা পর্দার জন্য বানানো এক-দুই মিনিটের পর্ব, দ্রুত গল্প এবং পর্বের শেষে ঝুলিয়ে রাখা উত্তেজনা—এই ফরম্যাট এখন এআইয়ের সঙ্গে মিশে আরও দ্রুত উৎপাদনযোগ্য হয়ে উঠছে।

চীনের মাইক্রো-ড্রামার লেখকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্য, শেয়ার ও দর্শকের প্রতিক্রিয়া গল্প তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। এখানে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী গল্পের পরের অংশ তৈরি করা হয়। এ কারণেই এআই নাটকের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পর্কটা এত গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক কতক্ষণ দেখল, কোথায় ভিডিও বন্ধ করল, কোন দৃশ্যে মন্তব্য করল—এসব তথ্য পরের কনটেন্ট তৈরির ধারণা দিতে পারে। ফলে গল্প তৈরি হয় দর্শক, অ্যালগরিদম এবং নির্মাতার মধ্যে এক ধরনের চলমান পরীক্ষার মাধ্যমে।
ভিডিওটা ভালো নাকি মন্দ, তা বিচার করার আগেই যদি দর্শক স্ক্রিনে আটকে যায়, তবেই বাজিমাত! এআই নাটকগুলো ঠিক এই জাদুটাই দেখাচ্ছে। এই গল্পগুলোতে খুব দ্রুত ইমোশন, উত্তেজনা আর সমস্যার সমাধান দেখানো হয়।
গল্পের প্লটগুলোও বেশ টানটান। কেউ হয়তো প্রেমে প্রতারণার শিকার, কেউ জেনে গেছে কোনো ভয়ংকর গোপন সত্য, আবার কেউ নিচ্ছে অপমানের প্রতিশোধ। কেউ হয়তো এমন এক সম্পর্কে আটকে যায়, যার শেষটা দেখতে দর্শককে বাধ্য হয়ে পরের ভিডিওতে ক্লিক করতে হয়।
বাংলাদেশে এআই নাটক নতুন মনে হলেও চীনে ‘মাইক্রো-ড্রামা’ বা ছোট নাটকের বাজার অনেক বড় একটি বিনোদন শিল্প। ২০২৬ সালে এসে এআই প্রযুক্তি চীনের এই নাটক তৈরির পদ্ধতি একেবারে বদলে দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম ক্যাক্সিন ও সিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই চীনে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার নতুন মাইক্রো-ড্রামা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি নাটকই এআই দিয়ে বানানো! অথচ মাত্র এক বছর আগেও এআই দিয়ে বানানো নাটক তেমন ছিল না বললেই চলে। উন্নত ভিডিও জেনারেশন মডেল বা সফটওয়্যারগুলো বাজারে আসার পরই এই অভাবনীয় পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের ‘হেংদিয়ান’ শহরটি বহুদিন ধরেই সিনেমা ও নাটক তৈরির বড় কেন্দ্র। মাইক্রো-ড্রামার শুরুর দিকে সেখানে প্রচুর শুটিং হতো এবং অভিনেতাদের ব্যাপক চাহিদাও ছিল। ক্যাক্সিন জানিয়েছে, সেসময় অভিনেতারা দিনে ৮০০ থেকে ১,৫০০ ইউয়ান এবং মাসে ১০ হাজার ইউয়ানের বেশি আয় করতেন। চীনের মাইক্রো-ড্রামা খাতে মোট প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার মানুষ কাজ করতেন।
কিন্তু এআই আসার পর এই কাজের বাজারে বড় ধস নেমেছে। এখন অনেক অভিনেতা কাজ হারিয়েছেন অথবা অনেক কম পারিশ্রমিকে কাজ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন। এআই মূলত নাটক তৈরির পুরো অর্থনীতিটাই বদলে দিয়েছে।
এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি নাটক তৈরির খরচ অনেক কমিয়ে দিয়েছে। চায়না ডেইলির মতে, যেখানে বাস্তবে শুট করা একটি আধুনিক নাটকে ৩ থেকে ৪ লাখ ইউয়ান খরচ হয়, সেখানে এআই দিয়ে একটি কস্টিউম (পোশাকভিত্তিক) মাইক্রো-ড্রামা বানাতে খরচ পড়ে মাত্র ২ থেকে ৩ লাখ ইউয়ান। ক্যাক্সিন জানিয়েছে, কিছু এআই মাইক্রো-ড্রামা বানাতে এখন ২০ হাজার ইউয়ানেরও কম খরচ হচ্ছে!
আগে নাটক বানাতে অনেক মানুষের দরকার হতো, কিন্তু এখন শুরুতে কিছু সফটওয়্যার হলেই কাজ শুরু করা যায়। ফলে যাদের বড় বাজেট নেই, তারাও নিজেদের গল্পগুলো পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে নতুন নির্মাতাদের জন্য দারুণ একটি দরজা খুলে গেছে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। সবাই যদি এত সহজে নাটক বানাতে শুরু করে, তাহলে এত এত ভিডিওর ভিড়ে দর্শকের জন্য সত্যিই ভালো মানের নাটক খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।
চীনে এআই প্রযুক্তি আসার আগে মাইক্রো-ড্রামা বা ছোট নাটকের খাতটি ছিল কর্মসংস্থানের এক বিশাল জায়গা। অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, মেকআপ আর্টিস্ট, সেটকর্মী ও পরিচালকসহ বিশাল কর্মীবাহিনী এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। চীনা সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, চীনের এই খাতে অন্তত ৬ লাখ ৯০ হাজার মানুষ কাজ করতেন। কিন্তু এআই ভিডিও প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার পর নাটক বানানোর সময় ও খরচ—দুটোই অবিশ্বাস্যভাবে কমে যায়। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই চীনে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার মাইক্রো-ড্রামা মুক্তি পায়, যার ৯৫ শতাংশই এআই দিয়ে তৈরি। অবাক করার মতো বিষয় হলো, আগে যে কাজ করতে ৫ জন মানুষের ৩ মাস লাগত, এআইয়ের সাহায্যে এখন ১ জন মানুষ মাত্র এক-দুই দিনেই তা করতে পারছেন।
বাংলাদেশেও যদি এমন পরিবর্তন আসে, তবে সবার আগে এর প্রভাব পড়বে ছোট বাজেটের নাটক, ফেসবুক রিলস ও মাইক্রো-ড্রামার বাজারে। যেসব নির্মাতার অভিনেতা, শুটিং লোকেশন বা ইউনিট ভাড়ার মতো পর্যাপ্ত বাজেট থাকে না, তারা এখন এআই ব্যবহার করে অনেক বেশি কনটেন্ট বানাতে পারবেন। এতে নতুন নির্মাতাদের জন্য পথ সহজ হবে এবং নাটকের সংখ্যাও হু হু করে বাড়বে।
তবে চীনের মতোই বাংলাদেশেও অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, এডিটর ও অন্যান্য কারিগরি কর্মীদের কাজের সুযোগ কমার বড় ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশের টিভি নাটক শিল্প এমনিতেই স্থানীয় প্রযোজনা কমে যাওয়ায় কিছুটা চাপে আছে। তাই এআই শুরুতে ‘নাটক বানানোর খরচ’ কমালেও ভবিষ্যতে ‘নাটক বানাতে আদৌ মানুষের প্রয়োজন কতটা’—সেই কঠিন প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে আসবে।
বর্তমানে আমাদের ফেসবুক ফিডে যেসব বাংলাদেশি এআই নাটক দেখা যাচ্ছে, সেগুলোকে চীনের ওই বিশাল ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে এখনই তুলনা করার মতো কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। ঠিক কত মানুষ এসব নাটক দেখছেন বা এর বাজার কত বড়, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও এখনো পাওয়া যায়নি।
চীনের বিশেষজ্ঞরা এখন যে সমস্যার কথা বলছেন, সেটিও মাথায় রাখা জরুরি। তাঁরা বলছেন, প্রচুর কনটেন্ট তৈরি হলেও এর মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই ধরনের গল্প, চরিত্র আর দৃশ্যের বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
এআইয়ের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একাধিক দৃশ্যে একই চরিত্রকে হুবহু এক রাখা, মানুষের মতো স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি, আবেগের সূক্ষ্ম প্রকাশ বা গল্পের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এখনো এআইয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দশটি ভিন্ন নাটকে দশজন রক্তমাংসের মানুষ দশ রকমভাবে অভিনয় করতে পারেন, কিন্তু এআইয়ের তৈরি চরিত্রগুলোর অভিনয় প্রায় একই রকম মনে হয়। এতে দর্শকের মাঝে দ্রুতই একঘেয়েমি চলে আসতে পারে।
তবে সবকিছুর পরও একটি কথা থেকেই যায়—সত্যিকারের কোনো অভিনেতা ছাড়া তৈরি করা চরিত্র দেখে যদি দর্শকের চোখে জল আসে, কিংবা কোনো লেখক ছাড়া বানানো গল্প যদি দর্শককে পরের পর্ব দেখার জন্য স্ক্রিনে আটকে রাখে, তবে আগামীতে ‘বিনোদনের’ আসল সংজ্ঞাটাই হয়তো পুরোপুরি বদলে যাবে।
.png)

ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে কিল-লাথি মারা হয়েছে। একই ভিডিও আরেকটি ক্যাপশনে ছড়িয়ে বলা হচ্ছে, ‘ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ দেওয়ায় একজন নারীকে এভাবেই পুলিশের সামনে মারধর এবং হেনস্থা করছে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা।’
৩০ আগস্ট ২০২৬
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। দায়িত্বে প্রথম ছয় মাসে সরকারকে ঘিরে অনলাইনে ছড়ানো অপতথ্যের চিত্র তুলে ধরেছে রিউমর স্ক্যানার। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সময়ে সরকার, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৪৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
২৬ আগস্ট ২০২৬
রাজধানীর বসুন্ধরার একটি কওমি মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিসের শিক্ষার্থী অকপটে জানান, বছর পাঁচেক আগে লক্ষ্মীপুরে মাদ্রাসায় পড়ার সময় তিনি প্রথম ছেলেশিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করেন। এরপর একাধিক শিশুর সঙ্গে মিশেছেন। স্কুল-মাদ্রাসার ছেলেরা পছন্দ তাঁর।
১৪ আগস্ট ২০২৬
সাদিয়া রশ্নি সূচনাকে নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। সামাজিক মাধ্যম আলোচনা-সমালোচনায় সয়লাব তাঁর উপস্থাপনা। গত ৪ জুলাই রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ উপস্থাপনার পর সূচনাকে নিয়ে একাধিক পোস্ট ছড়ায়।
০৭ জুলাই ২০২৬