মতামত/বেতন বাড়লেই কি কমবে দুর্নীতি, নাকি বাড়বে অর্থনীতির চাপ

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

বেতন বাড়ল। সরকারি চাকরিচীবীদের জন্য আনন্দের সংবাদ। কিন্তু রাজস্ব ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, শিল্পের মন্দা ও উন্নয়ন ব্যয়ের সংকোচনের সময়ে বেতনের এই বিপুল বৃদ্ধি কি অর্থনৈতিক প্রয়োজন? নাকি ভবিষ্যতের ওপর চেপে বসল নতুন আর্থিক দায়?

বেতন বাড়ানো নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের বেতন-ভাতা পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা কঠিন। দক্ষ ও সৎ জনবল ধরে রাখতে রাষ্ট্রকে অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ পারিশ্রমিক দিতে হবে।

কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনীতির বাস্তবতা উপেক্ষা করে বেতন বাড়ানো যায় না। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে, উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন নিম্নস্তরে, শিল্প উৎপাদন দুর্বল, জ্বালানি সংকটে কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে, তখন প্রস্তাবিত বিশাল বেতনস্কেল নিয়ে প্রশ্ন তোলা দায়িত্বশীলতারই অংশ।

প্রস্তাবিত সংশোধিত জাতীয় বেতনস্কেলে সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেডের অধিকাংশে মূল বেতন প্রায় ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যমান ২০১৫ সালের স্কেলের সঙ্গে তুলনায় এটি নিছক বেতন সমন্বয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ব্যয়ের কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন।

এখানে প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো, এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থ আসবে কোথা থেকে?

২০২৫ অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩,৭০,৮৭৫ কোটি টাকা, যেখানে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪,৬৩,৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ২০ শতাংশ ঘাটতি। ২০২৬ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ৩,২৬,৯২৮ কোটি টাকা, বিপরীতে সঞ্চিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪,৩১,৪৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতা সাময়িক নয়, তা চলমান।

রাষ্ট্রের অর্থনীতির বাস্তবতা উপেক্ষা করে বেতন বাড়ানো যায় না। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে, উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন নিম্নস্তরে, শিল্প উৎপাদন দুর্বল, জ্বালানি সংকটে কারখানা বন্ধ হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে, তখন প্রস্তাবিত বিশাল বেতনস্কেল নিয়ে প্রশ্ন তোলা দায়িত্বশীলতারই অংশ।

অন্যদিকে, সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের প্রধান বাহন এডিপি বাস্তবায়নের হার ২০২৬ অর্থবছরে নেমে এসেছে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশে, যা পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলেই সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যায়। একদিকে রাষ্ট্র তার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব তুলতে পারছে না, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাও কমছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী বেতন-ব্যয় একবার বাড়িয়ে দিলে তা প্রতিবছর বহন করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের মতো এটি ইচ্ছা করলেই পরের বছর কমিয়ে দেওয়া যায় না। ফলে আজকের সিদ্ধান্ত আগামী বহু বছরের বাজেটের ওপর দায় তৈরি করবে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ক্রাউডিং-আউট। রাজস্ব ঘাটতির সময়ে সরকারকে অনিবার্য ব্যয়—বেতন, পেনশন ও ঋণ পরিশোধ—আগে মেটাতে হয়। তখন সংকোচনের সহজ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে উন্নয়ন ব্যয়। আর উন্নয়ন ব্যয় কমলে অবকাঠামো, উৎপাদন সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিই দুর্বল হয়।

আর যদি উন্নয়ন ব্যয় না কমিয়ে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে আরও অভ্যন্তরীণ ঋণ নিতে হয়, তবে তারও মূল্য দিতে হবে অর্থনীতিকে। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধির বর্তমান সুবিধার বিপরীতে ভবিষ্যতে বাড়তে পারে সুদের বোঝা, কমতে পারে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ এবং সংকুচিত হতে পারে বিনিয়োগের পরিসর।

এমনিতেই উৎপাদনশীল অর্থনীতি স্বস্তিতে নেই। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বহু কারখানা সক্ষমতার নিচে চলছে। জ্বালানি সংকটের কারণে ১০০টিরও বেশি কারখানা উৎপাদন বন্ধ করেছে এবং শিল্প সংগঠনগুলো শত শত বস্ত্র ইউনিটে উৎপাদন বন্ধের কথা জানিয়েছে।

এই বাস্তবতায় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—যে বেসরকারি খাত অর্থনীতির রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের মূল ভিত্তি, সেই খাত যখন সংকটে, তখন রাষ্ট্রের স্থায়ী ব্যয় কি এত দ্রুত বাড়ানো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত?

সরকারি বেতন বাড়ানোর অর্থ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির ভেতর থেকেই আসে। করদাতা, ব্যবসা, শিল্প ও ভোক্তার ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই ব্যয়ের ভার পড়ে। উৎপাদন যদি কমে, ব্যবসার মুনাফা যদি সংকুচিত হয় এবং নতুন বিনিয়োগ যদি স্থবির হয়ে পড়ে, তাহলে রাজস্বের ভিত্তি আরও দুর্বল হয়। দুর্বল রাজস্বের ওপর আরও বড় স্থায়ী ব্যয় চাপানো তাই এক ধরনের আর্থিক অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি আনুমানিক ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। এই সময়ে সরকারি খাতে দ্রুত ও বড় মাত্রার বেতন বৃদ্ধি অতিরিক্ত ব্যয়ক্ষমতা তৈরি করে পণ্য ও সেবার ওপর চাহিদার চাপ বাড়াতে পারে।

এখানে সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মচারীরা যদি বড় ধরনের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পান, বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক একই সুবিধা পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং দুর্বল চাহিদা, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় ও সীমিত মুনাফার চাপে থাকা অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্মীদের সমপরিমাণ বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা হারাতে পারে।

তবে প্রস্তাবিত বেতনস্কেলের সবচেয়ে আলোচিত যুক্তি—‘দুর্নীতি কমানো’ নিয়েও বাস্তববাদী হওয়া জরুরি।

ভালো বেতন একজন কর্মচারীকে অনৈতিক আয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার আর্থিক প্রণোদনা কমাতে পারে। অর্থনীতির ‘দক্ষতা মজুরি’ তত্ত্বে এর ভিত্তিও রয়েছে। কিন্তু দুর্নীতি কেবল কম বেতনের ফল নয়। দুর্বল তদারকি, জবাবদিহির ঘাটতি, শাস্তির কম ঝুঁকি, প্রশাসনিক বিবেচনাধিকার এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মও দুর্নীতির বড় চালিকাশক্তি। তাই বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি কমবে—এমন সরল সমীকরণ অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক বাস্তবতায় টেকসই নয়।

বরং বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে যদি নিরীক্ষা, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি ও প্রয়োগ সক্ষমতা না বাড়ে, তাহলে রাষ্ট্র শুধু বড় অঙ্কের স্থায়ী ব্যয় গ্রহণ করবে; কিন্তু প্রত্যাশিত আচরণগত পরিবর্তন নাও আসতে পারে। অতীতের বেতনস্কেল সংশোধনের পর দুর্নীতির সূচকে পরিমাপযোগ্য ও টেকসই উন্নতির প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

এমনকি বিপরীত ঝুঁকিও রয়েছে। বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে। আর সেখানেই নতুন অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—যা বেতন বৃদ্ধির দুর্নীতিবিরোধী যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে দিতে পারে।

বেতন বৃদ্ধির অর্থ জোগাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ বাড়বে। আর সেখানেই নতুন অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—যা বেতন বৃদ্ধির দুর্নীতিবিরোধী যুক্তিকেই শেষ পর্যন্ত দুর্বল করে দিতে পারে।

তাহলে কি বেতনস্কেল সংস্কার করা উচিত নয়? অবশ্যই করা উচিত। প্রশ্নটি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি সংস্কারের সময়, গতি, পরিমাণ এবং অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে।

সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হতে পারে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন। দুই থেকে তিন অর্থবছরে বেতন বৃদ্ধি পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি করের আওতা সম্প্রসারণ, কর-সম্মতি বৃদ্ধি এবং আয়কর ও ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কারের মাধ্যমে নতুন রাজস্ব আহরণের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। একই সঙ্গে এডিপির গুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখতে হবে, যাতে বেতন ব্যয়ের কারণে উন্নয়ন ব্যয় বলি না হয়।

রাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ-ব্যয়ও বিবেচনা করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন দিতে হবে—কিন্তু সেই ন্যায্যতা যেন দেশের করদাতা, উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অন্যায্য বোঝায় পরিণত না হয়।

বেতনস্কেল সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু রাজস্ব সক্ষমতার বাইরে গিয়ে নয়। বেতন বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু উন্নয়ন থামিয়ে নয়। সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু মূল্যস্ফীতির আগুন আরও উসকে দিয়ে নয়। আর দুর্নীতি কমাতে বেতন বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু সুশাসনের সংস্কারের বিকল্প হিসেবে নয়।

এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো একটি বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করা। কত অতিরিক্ত ব্যয় হবে, সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, উন্নয়ন ব্যয় কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে কোন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একই সঙ্গে কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর জনগণের জানার অধিকার আছে।

কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন কত হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি সেই বেতন কতটা টেকসইভাবে বহন করতে পারবে।

  • মাহমুদ হোসেন: ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

বিষয়:

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত