ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান/কল রেকর্ড, লোকেশন, এনআইডি– সবকিছুই মিলছে হাজার টাকায়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যে
ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যে

আপনি কখন, কার সঙ্গে, কতক্ষণ কথা বলেছেন, এমনকি কোন টাওয়ারের অধীনে— এগুলো নাগরিকের একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য। আইনেও সুরক্ষিত। কিন্তু দাম মাত্র এক হাজার টাকা! কেউ চাইলেই সামান্য টাকায় নাগরিকের সব তথ্য কব্জায় নিতে পারছেন।

ফেসবুক, ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে অবাধে মিলছে। আর নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ঘিরে অনলাইনে গড়ে উঠেছে বড় পরিসরের বাজার। তথ্য যাচাই প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব অনুসন্ধানে এমন ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছে। এ ছাড়া এক মাসে শুধু ফেসবুকেই এ-সংক্রান্ত ছয় শতাধিক বিজ্ঞাপন পেয়েছে তারা।

পৃথক তিন বিক্রেতার কাছ থেকে এনআইডি কপি, তিন মাসের কল রেকর্ডের ডিটেইল (সিডিআর) এবং রিয়েল-টাইম টাওয়ার লোকেশন কিনে যাচাই করে ডিসমিসল্যাব। এতে তারা পেয়েছে, মাত্র ১৭ মিনিটে এনআইডি, ১৬ মিনিটে গুগল ম্যাপসহ লাইভ লোকেশন এবং আড়াই ঘণ্টার মধ্যে কল রেকর্ড সরবরাহ করেছে চক্রের সদস্যরা। এমনকি দুই মাস আগে এক ব্যক্তির এনআইডির সংশোধিত হুবহু তথ্যও কেনা সম্ভব হয়েছে।

মূল্যতালিকা

তথ্য কেনাবেচার এই বাজারে বিভিন্ন সেবার নির্দিষ্ট মূল্যতালিকা রয়েছে। ১০টি ওয়েবসাইটের মূল্যতালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভোটার নম্বর বা মোবাইল নম্বর থেকে এনআইডি সার্ভার কপি পেতে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা, বিস্তারিত তথ্যসংবলিত সাইন কপি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ৩ মাস থেকে ১ বছরের কল ডিটেইল রেকর্ড ৯০০ থেকে ২,০০০ টাকায় মিলছে।

ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যে
ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যে

মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর ১,১০০ থেকে ১,৫০০ টাকা, লাইভ লোকেশন ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা এবং বিকাশ বা নগদের পূর্ণাঙ্গ অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট ৩,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমের অনেক বিক্রেতা সরাসরি তথ্যের উৎস নন। তাঁরা অন্য ওয়েবসাইট বা গ্রুপ থেকে তথ্য কিনে বেশি দামে বিক্রি করেন। এমন একটি ওয়েবসাইটের মালিক ডিসমিসল্যাবকে জানান, তিনি ৮০০ টাকায় মোবাইল গ্রাহকের কল তালিকা কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন।

ওই বিক্রেতা দাবি করেছেন, তিনি যে গ্রুপ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, তারা এপিআই (দুটি ভিন্ন সফটওয়্যারের মধ্যে তথ্য আদান–প্রদানের ব্যবস্থা) ব্যবহার করে সরকারি সার্ভারের নিরাপত্তা ভেঙে তথ্য সংগ্রহ করে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।

তথ্য ফাঁসের নেপথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা

আইন অনুযায়ী কল রেকর্ড ও ব্যবহারকারীর অবস্থান মোবাইল অপারেটরদের কাছে সংরক্ষিত থাকে এবং তা কেবল জাতীয় নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে সরকারি সংস্থাকে দেওয়া হয়।

গ্রামীণফোন ও রবি তাদের লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা আইন ও নিয়মের বাইরে কোনো তথ্য তৃতীয় পক্ষকে দেয় না।

তবে একটি মোবাইল অপারেটরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিসমিসল্যাবকে জানান, বিটিআরসি, এনটিএমসি এবং পুলিশ সদর দপ্তরসহ অন্তত ১০টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে অপারেটরদের গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমের সরাসরি অ্যাক্সেস রয়েছে। অপারেটরটির নিজস্ব তদন্তে ধরা পড়ে যে একটি সরকারি সংস্থার এপিআই ব্যবহার করে তথ্য ফাঁস করা হচ্ছিল এবং এ বিষয়ে বিটিআরসিকে একাধিকবার জানানো হয়েছিল।

বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক কর্নেল মো. কামরুল হাসান মামুন জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং তদন্তাধীন বিষয়গুলো নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে এনটিএমসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এক চিঠিতে জানিয়েছিল যে অ্যান্টি-টেররিজম ইউনিটের এক পুলিশ সুপার ও র্যাব-৬-এর এক এএসপির লগইন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে তথ্য পাচার করা হয়েছিল এবং সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কনস্টেবল অর্থের বিনিময়ে কল রেকর্ড বিক্রির কথা স্বীকার করেছিলেন।

ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও আইনি দায়বদ্ধতার সংকট

নাগরিকদের পরিচয়পত্র ও অবস্থানের তথ্য এভাবে পাওয়া যাওয়ায় পরিচয় জালিয়াতি, ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, আর্থিক প্রতারণা ও অনৈতিক নজরদারির মতো ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফাইবার অ্যাট হোমের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ সাবির ডিসমিসল্যাবকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরের লোক অথবা সিস্টেমের দুর্বলতা ছাড়া রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়ার সুযোগ নেই। এনআইডি তথ্য দিয়ে যে কেউ অন্যের নামে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে বড় আর্থিক অপরাধ করতে পারে।’ তিনি ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির (এনসিএসএ) নজরদারি ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যে
ডিসমিসল্যাবের সৌজন্যে

যদিও ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তথ্য প্রকাশের দায়ে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে, তবে ‘টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশে ঘটা ৬৮টি বড় তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির নজির নেই বললেই চলে।

ডিসমিসল্যাব এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল মোমিন সরকারের কাছে জানতে চাইলে, তিনি লিখিত আবেদন করতে বলেন। প্রতিষ্ঠানটি এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক এএইচএম আনোয়ার পাশা, এনটিএমসি এবং এনসিএসএর মহাপরিচালক মো. তাইবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করেননি।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত