leadT1ad

কলকাতা বইমেলায় নেই বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন: কূটনীতির ছায়ায় ভাঙল দুই বাংলার সাহিত্যসেতু

Multiple Authors
ইনস্ক্রিপ্ট প্রতিবেদক ও স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ৫১
কলকাতা বইমেলায় নেই বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। স্ট্রিম গ্রাফিক

শুরু হয়েছে ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) শুরু হওয়া কলকাতার বইমেলায় এবারও থাকবে না বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। বইমেলা চত্বরে পাঠকদের হাতে হাতে ঘুরবে না বাংলাদেশি প্রকাশনার বই।

‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’-এর সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমইএ) বা ভারত সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া বাংলাদেশের কোনো প্রকাশককে আসন্ন ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় স্টল দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে, মেলার নিরাপত্তা ও পবিত্রতা বজায় রাখতেই আমরা সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু সেই ছাড়পত্র না মেলায় আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে এ বছরও বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন থাকছে না।’

গিল্ডের এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই কার্যত সিলমোহর পড়ে গেল আশঙ্কায়। পর পর দুবার বাংলাদেশ ভারতে বইমেলায় জায়গা পেল না।

১৯৯৬ সাল থেকে কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিবছর রকমারি বই, লিটল ম্যাগাজিন আর বাংলাদেশের বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্ভার নিয়ে যে ‘বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন’ গড়ে উঠত, তা ছিল মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু ২০২৫ সালের পর ২০২৬, টানা দুই বছর কলকাতার বইপ্রেমী বঞ্চিত হতে চলেছেন সেই অভিজ্ঞতা থেকে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পালাবদল এবং অস্থিরতার কারণে দেখিয়ে শেষ মুহূর্তে তাদের অংশগ্রহণ বাতিল হয়েছিল। আর এবারও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো।

দুই দেশের সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে সাম্প্রতিককালে বা কূটনৈতিক যে টানাপোড়েন চলছে, সেটাই নেপথ্য কারণ। এই বিষয়ে দে’জ পাবলিশিংয়ের কর্ণধার শুভঙ্কর দে অপু ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, ‘দুই দেশের রাজনৈতিক অবস্থা যা, তাতে এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা চাই তারা অংশ নিক, কিন্তু আমাদের হাতে কিছু নেই। বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থা, যারা অংশ নিতে চেয়েছিলেন, তাদের বলা হয়েছিল, বিদেশ মন্ত্রকের (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) সঙ্গে যোগাযোগ করতে কিন্তু তারপর তাঁরা আর আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি।’

২০২৪-এর আগস্টে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কের সমীকরণ অনেকটাই বদলেছে। বিশেষ করে, বিগত কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক শীতলতা ও ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব এসে পড়েছে সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের এই আদান-প্রদানে।

দ্য হিন্দু এবং বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গিল্ড বারবারই নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় স্পষ্টই বলেছেন, ‘যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো ঝুঁকি নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কে দায়িত্ব নেবে, যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে?’

অর্থাৎ, বিষয়টি আর সাহিত্যের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই, তা পুরোদস্তুর ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার বিষয় হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের সংস্থাগুলোর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে স্টল পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন, অন্তত প্রকাশকদের উদ্যোগে সাহিত্যের এই ধারাটি বজায় থাকুক। গিল্ড কর্তৃপক্ষও জানিয়েছেন, তারা নীতিগতভাবে বাংলাদেশের বই বিক্রির বিরোধী নন, কিন্তু সরকারি ছাড়পত্র ছাড়া তারা অফিশিয়াল স্টল বরাদ্দ করতে অক্ষম। এমনকি, ভারতীয় স্টলগুলোতে বাংলাদেশের বই রাখার ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি নেই বলেও জানানো হয়েছে, কিন্তু তাতে কি আর সেই ‘বাংলাদেশ চত্বর’-এর আমেজ ফিরে পাওয়া সম্ভব?

সাহিত্যপ্রেমীরা যা বলছেন

সাহিত্যপ্রেমী এবং বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তার জেরে বইয়ের আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যাওয়াটা আসলে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপরই আঘাত। এ বছর বইমেলায় ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে থাকছে সুদূর আর্জেন্টিনা। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ে মাতামাতি হবে, কিন্তু একেবারে পাশের বাড়ির প্রতিবেশী, যাদের সঙ্গে ভাষা ও নাড়ির টান, তাদের অনুপস্থিতি অনেককেই ভাবাচ্ছে।

‘প্রতিক্ষণ’-এর প্রধান সম্পাদক শুদ্ধব্রত দেব ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, ‘এর পেছনে রয়েছে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ। আশা করছি, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে। দুই দেশের পাঠকই এতে খুশি হবে।’
বাংলাদেশের অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা সময়ের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘কলকাতা বইমেলা নিয়ে আমি কোনো কথাই বলতে চাই না।‘

সূচীপত্রের প্রকাশক সাঈদ বারী বলেন, ‘কলকাতা বইমেলায় আমাদের আমন্ত্রণ না জানানো তো নেতিবাচকই। তারা কোনো কারণও বলে নাই। শুধু রাজনৈতিক কারণে বিদ্বেষমূলক আচরণ করা হলো। দুই দেশের সম্পর্ক তো হবে জনগণ টু জনগণ। কলকাতার সঙ্গে আমাদের গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক নষ্ট হলে দুইদেশের জন্যই ক্ষতিকর।

তিনি আরও বলেন, ‘কলকাতা বইমেলায় আমাদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত। আর তারা যদি বলে আমাদের এখানে বইমেলা করবে, সে বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।’

গ্রন্থিকের স্বত্বাধিকারী রাজ্জাক রুবেল বলেন, দুই দেশের শাসকগোষ্ঠী ভাষা ও সংস্কৃতিকে মানুষের মিলনের জায়গা না বানিয়ে ক্ষমতার হাতিয়ার বানিয়েছে। তাদের সুবিধার রাজনীতিতে বই, সাহিত্য আর সংস্কৃতি পরিণত হয়েছে বিভাজনের অস্ত্রে।এই কৃত্রিম বিদ্বেষ জনগণের নয়, এটা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠীর পরিকল্পিত উৎপাদন। মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়িয়ে তারা নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চায়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত