ইতালিতে ৩ বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন যুবক পূর্বপরিচিত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নোয়াখালী

ইতালিতে ছুরিকাঘাতে নিহত নোয়াখালীর একই পরিবারের তিনজন। সংগৃহীত ছবি

ইতালির রাজধানী রোমে বাংলাদেশি দম্পতিসহ শিশু হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে এক যুবককে চিহ্নিত করে ছবি প্রকাশ করেছে রোম প্রসিকিউটর কার্যালয়। ছবিটি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. শাহাদাত হোসেন হিসেবে শনাক্ত করেছেন নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা।

এদিকে, ওই ট্রিপল মার্ডারের পর ফেসবুকে শাহাদাত হোসেনের দেওয়া একটা স্ট্যাটাস নিয়ে ঘিরে হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শাহাদাত হোসেন কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল আহাদের ছেলে। তিনি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্যসচিব বলে দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। নিহতদের স্বজনেরা জানান, কামাল উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেনের মধ্যে একসময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে কামালের বাড়িতে যাতায়াত ছিল শাহাদাতের।

ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলের অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগ্লিও সড়কের একটি পার্কসংলগ্ন ফ্ল্যাট থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তারা হলেন কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরকাঁকড়া বিজয়নগর এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে আরিশা। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত তাদের ছেলে অয়ন (১৮) বর্তমানে সেখানে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ইতালির আইনশৃঙ্খলাবাহিনী প্রকাশিত সন্দেহভাজন যুবকের ছবি। ফেসবুক থেকে নেওয়া
ইতালির আইনশৃঙ্খলাবাহিনী প্রকাশিত সন্দেহভাজন যুবকের ছবি। ফেসবুক থেকে নেওয়া

চরকাঁকড়া এলাকার বাসিন্দারা বলেন, কামাল উদ্দিন বাবুল প্রথমে একাই ইতালি যান। তখন তাঁর পরিবার কোম্পানীগঞ্জে ছিল। এ সময় শাহাদাতের সঙ্গে কামালের স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ নিয়ে এলাকায় সালিশ-বৈঠকও হয়েছিল। প্রায় দুই বছর আগে স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান কামাল।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদের সময় পরিবারসহ দেশে এসেছিলেন কামাল। সে সময় তাদের বাড়িতে একটি উড়ো চিঠি আসে। এতে স্বর্ণালংকার ও অর্থ দাবি করা হয়। তা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যাসহ নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়। বিষয়টি তখন থানায় জানানো হয়েছিল। পরে নির্ধারিত সময়ের আগেই ইতালিতে ফিরে যান কামাল উদ্দিন।

এদিকে প্রায় চার বছর আগে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান শাহাদাত হোসেন। সেখানে পারিবারিক বিচ্ছেদের পর প্রায় এক বছর আগে তিনি ইতালিতে যান। স্বজনদের দাবি, ইতালিতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও শাহাদাতকে সহায়তা করেছিলেন কামালের নিহত স্ত্রী আরজু।

এদিকে ঘটনার পর শাহাদাত হোসেন নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।’

কামালের চাচাতো ভাই আইনজীবী মো. ইউনুস সুমন বলেন, ‘দেশে থাকাকালে শাহাদাতের সঙ্গে কামালের স্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়েছিল। এ কারণেই পরিবারকে ইতালিতে নিয়ে যান কামাল। কিন্তু ইতালিতেও শাহাদাতের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি বলে আমরা জানতে পেরেছি। হত্যাকাণ্ডের পর শাহাদাতের ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্ট সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে।’

নিহত কামাল উদ্দিনের বাবা সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, ওই হত্যাকাণ্ডে কামালের পরিচিত ও একই গ্রামের প্রবাসী শাহাদাত হোসেন জড়িত।

এদিকে শনিবার কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া বিজয়নগর এলাকায় শাহাদাতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তার মা ও ছোট ভাইয়ের পরিবার বসবাস করছেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত চার বছর ধরে শাহাদাতের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই।

শাহাদাতের বড় প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, ‘চার বছর আগে শাহাদাত সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। আমি দুই মাস আগে দেশে এসেছি, এর মধ্যেও তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।’

শাহাদাতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সামছুদ্দিন হায়দার বলেন, প্রায় চার বছর আগে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে শাহাদাত লন্ডনে চলে যান। এরপরই তাকে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। এই তথ্য নিশ্চিত করে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেউ নয়।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত