বিএনপি আমলে পুঁজিবাজারে সংকট হয়নি: অর্থমন্ত্রী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সংসদে বাজেট উপস্থাপন করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপি সরকারের সময় ব্যাংক ও আর্থিক খাতসহ পুঁজিবাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের বক্তৃতায় তিনি এ দাবি করেন।

অধিবেশনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের অর্থনীতির সঙ্গে বিএনপি সরকারের সময়কার অর্থনীতির তুলনা করতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ের সঙ্গে বিএনপির পূর্ববর্তী সরকারের সময়ের সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকসমূহের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তীতে পতিত সরকারের সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা মাত্র ৪ দশমিক ২২ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৫-০৬ সময়ে সামান্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্পদের অসম বণ্টন ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব ও দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়-ভিত্তিক জিনি কোফিশিয়েন্ট ছিল ০ দশমিক ৪৬৭, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী ০ দশমিক ৪৯৯-এ পৌঁছেছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত নিম্ন পর্যায়ে রয়ে গেছে; এখনও তা ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৫ সালে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের শেষে ঋণাত্মক অর্থাৎ মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে অনেক কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, স্ক্যাম ও ভুল নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং এর ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করা হয়েছে। বিএনপি সরকার যতবার এ দেশে সরকার পরিচালনা করেছে, কখনই ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ পুঁজিবাজারে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি।’

ঋণের তুলনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে প্রায় ৬ দশমিক ৫ গুণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। আমাদের রেখে যাওয়া অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি থেকে প্রায় ১৬ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায়, যা সত্যিই উদ্বেগের। সুদ ব্যয় ২০০৫-০৬ সালে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে ১৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৩-২৪ সালে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণমান আমাদের রেখে যাওয়া নিম্ন ঝুঁকি ক্যাটাগরি হতে মধ্যম ঝুঁকির দেশে অবনমন হয়েছে। ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬ ও ১২ দশমিক ২ শতাংশ। পক্ষান্তরে, ২০২৩-২৪ সালে সূচক দুটির প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। ২০০৫-০৬ সালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার প্রায় ৬৮ টাকা থেকে ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে, যা বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব ফেলছে।’

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমাদের সরকার গঠনের ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরু হয়, যা অর্থনীতিকে আকস্মিক ঝুঁকিতে ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে, ফলে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাচাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রবাসী জনশক্তির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। তাই ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার কারণে কর্মসংস্থান ও প্রবাস আয়প্রবাহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আজকের বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা একটি স্থায়ী প্রেক্ষাপট। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সুদহারের ঊর্ধ্বগতি, বাণিজ্যে শুল্কের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন—এসবের যেকোনো একটি ঘটনাই অল্প সময়ের মধ্যে দেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কাজেই আমাদের লক্ষ্য হলো বাইরের ধাক্কা এলেও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর অভিঘাতের মাত্রা মোকাবিলা করে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা।’

সম্পর্কিত