জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনী জোটে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শুধু জামায়াতে ইসলামীই না, ওই জোটে রয়েছে ১১টি রাজনৈতিক দল। যার অধিকাংশই ইসলামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গত ২৮ ডিসেম্বর এনসিপি দল হিসেবে ওই জোটে যুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন।
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যাওয়ার আগের দিন ২৭ ডিসেম্বর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। দলটির অনলাইন গ্রুপে নিজের পদত্যাগের কথা জানান তাসনিম জারা। তিনি দলের অনলাইন গ্রুপে লেখেন, ‘প্রিয় সহযোদ্ধাগণ, আমি দল থেকে পদত্যাগ করেছি। গত দেড় বছরে আপনাদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি। সে জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আপনাদের জন্য শুভ কামনা রইল।’এরপরই ওইদিন রাতে নিজের ফেসবুক পেইজে নিজে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের কথা জানান।
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোটের দিন ২৮ ডিসেম্বর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন। ওইদিন দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তাজনূভা তাঁর পদত্যাগের কথা জানান। পোস্টে তিনি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতার প্রসঙ্গ টেনে লেখেন, ‘আজ এনসিপি থেকে পদত্যাগ করছি, আসন্ন নির্বাচনে আমি অংশ নিচ্ছি না। এই জিনিস (জোট) হজম করে মরতেও পারব না আমি।’
একইদিন (২৮ ডিসেম্বর) দলটির আরেক যুগ্ম সদস্যসচিব আজাদ খান ভাসানী ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ওইদিন রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে পদত্যাগের কথা জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্টে আজাদ খান ভাসানী বলেন, ‘অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের হাত ধরে গঠিত এনসিপিতে আমি যুক্ত হয়েছিলাম। শুরু থেকেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত লড়াইয়ের এক ধারাবাহিক অধ্যায় হিসাবে আত্মস্থ করেছি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শের পক্ষাবলম্বনই আমার কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই দায় ও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকতেই আজ এনসিপির সঙ্গে আমার আনুষ্ঠানিক সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি।’
এদিকে গত ২৯ ডিসেম্বর রাতে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আসিফ মোস্তফা জামাল (নেহাল)। দলের সদস্যসচিবের কাছে তিনি আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন। এছাড়া ওইদিন রাতে নিজের ফেসবুক পেজেও তিনি এই ঘোষণা দেন।
ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণায় তিনি উল্লেখ করেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এনসিপির প্রতি জনসাধারণের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই আমিও এই রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। প্রায় ১৪০০ শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের যে প্রতিশ্রুতি এনসিপি দিয়েছিল দুঃখজনকভাবে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দলটি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সম্মান মাথায় রেখে এই সংগঠনের সব ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে এক মুহূর্তও থাকতে চাই না।’
৩০ ডিসেম্বর পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘আপসরফা’র অভিযোগ তুলে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিওবার্তায় অভিযোগ করেন, এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নতুন ‘রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশে ব্যর্থ হয়েছে। আর এই ব্যর্থতার কারণেই তিনি পদত্যাগ করেন।
এ দিকে গতকাল (৩১ ডিসেম্বর) রাতে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি এনসিপির সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারার স্বামী। সদ্য পদত্যাগ করা এনসিপির মিডিয়া সেল সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন স্ট্রিমকে খালেদ সাইফুল্লাহর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মুশফিক বলেন, ‘বুধবার রাতে তিনি (খালেদ সাইফুল্লাহ) দলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। সেখানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির সব পদ থেকে পদত্যাগ করার কথা জানান। পদত্যাগের অনুলিপি এনসিপির সদস্যসচিব, দপ্তর সেল ও সব কেন্দ্রীয় সদস্যের কাছে পাঠানো হয়েছে।’ খালেদ সাইফুল্লাহ যুগ্ম আহ্বায়কের পাশাপাশি ছিলেন দলের পলিসি ও রিসার্স উইংয়ের প্রধানের দায়িত্বে।
এদিকে বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পদত্যাগ করেছেন মিডিয়া সেলের সদস্য খান মুহাম্মদ মুরসালীন। ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় তিনি পদত্যাগের কথা উল্লেখ করেন। খান মুহাম্মদ মুরসালীন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি পার্টির মিডিয়া সেল এবং প্রচার ও প্রকাশনা সেলেও কাজ করেছেন। এছাড়া দলটির নির্বাচনকালীন মিডিয়া উপকমিটির সেক্রেটারি হিসেবেও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা ওই ভিডিও বার্তায় মুরসালীন তাঁর পদত্যাগের বিস্তারিত কারণ তুলে ধরেন। তবে দলীয় পদ ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি আজ থেকে এনসিপির সকল দায়িত্ব ও পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেও রাজনীতি থেকে পদত্যাগ করছি না। দেখা হবে রাজপথে।’
সবশেষ আজ (১ জানুয়ারি) রাতে এনসিপির মিডিয়া সেল সম্পাদক ও দলটিরি যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন। দলের আহ্বায়ক বরাবর তিনি পদত্যাগপত্র দেন। তার পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, এনসিপির ১১ দলীয় জোটে যোগদান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক রাষ্ট্র নির্মাণের রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে জন্যই তিনি দল থেকে পদত্যাগ করছেন।